ইসরায়েলের নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতির রেকর্ড

ইসরায়েলের জাতীয় নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি ঐতিহাসিক উচ্চতায় পৌঁছেছে। ভোটগ্রহণের দিন দুপুর ২টা পর্যন্ত ভোট দিয়েছেন ৪৪ দশমিক ৯ শতাংশ ভোটার, যা দেশটির নির্বাচনী ইতিহাসে ওই সময় পর্যন্ত সর্বোচ্চ উপস্থিতি। তবে ভোটারদের ব্যাপক অংশগ্রহণের মধ্যেই নির্বাচনে অনিয়মের অভিযোগ তুলেছেন বিভিন্ন দলের নেতারা। প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু দাবি করেছেন, তার কাছ থেকে নির্বাচন ‘ছিনিয়ে নেওয়ার’ চেষ্টা চলছে। অন্যদিকে বিরোধী নেতা গাদি আইজেনকোটের অভিযোগ, নির্বাচনের ফল চ্যালেঞ্জ করার ক্ষেত্র প্রস্তুত করছেন নেতানিয়াহু।

মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) ইসরায়েলের কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশনের বরাত দিয়ে এ তথ্য জানিয়েছে টাইমস অব ইসরায়েল। কমিশনের হিসাবে, দুপুর ২টা পর্যন্ত দেশজুড়ে অন্তত ৩০ লাখ ভোটার তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন। ২০২২ সালের নির্বাচনে একই সময় ভোট পড়েছিল ৩৮ দশমিক ৯ শতাংশ।

নির্বাচনে নিজের ক্ষমতা ধরে রাখার লড়াইয়ে থাকা নেতানিয়াহু ভোটারদের দ্রুত কেন্দ্রে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। বিশেষ করে আরব ও বামপন্থী সমর্থকদের মধ্যে বেশি ভোট পড়ছে বলে দাবি করে তিনি ডানপন্থী ভোটারদেরও ভোট দিতে তাগিদ দেন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া বার্তায় নেতানিয়াহু বলেন, ‘তারা আমাদের কাছ থেকে নির্বাচন ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে।’ তাঁর অভিযোগ, আরব নেতৃত্বাধীন রা’আম পার্টির কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতাকে ভোট কেনাবেচার সন্দেহে আটক করা হয়েছে। তবে তাঁর এই বক্তব্যের পক্ষে ব্যাপক নির্বাচনী কারচুপির কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে নির্বাচন কমিশন।

নেতানিয়াহু আরও বলেন, নির্বাচনের ফলাফলের ওপর ইসরায়েলের ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রীয় চরিত্র নির্ভর করছে। বিরোধী জোটের জয় হলে দেশটি বর্তমানে যে ধরনের ইহুদি রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিত, তার অবসান ঘটতে পারে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

পরিবহনমন্ত্রী মিরি রেগেভও নেতানিয়াহুর অভিযোগের সুরে কথা বলেছেন। অন্যদিকে জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভির আরব অধ্যুষিত শহর কাফর কাসেম থেকে দেওয়া ভিডিও বার্তায় তাঁর দলের সমর্থকদের ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার আহ্বান জানান।

নেতানিয়াহুর বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় আইজেনকোটের ইয়াশার পার্টি অভিযোগ করেছে, প্রধানমন্ত্রী নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে মানুষের মধ্যে অবিশ্বাস তৈরির চেষ্টা করছেন। দলটির দাবি, পরাজয়ের পরিস্থিতিতে ফল চ্যালেঞ্জ করার ভিত্তি তৈরির লক্ষ্যেই এ ধরনের বক্তব্য দেওয়া হচ্ছে।

দলটি এক বিবৃতিতে বলেছে, নেতানিয়াহু আতঙ্কিত হয়ে নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ তুলছেন। তাঁর বক্তব্যের জবাবে বিরোধী দলটি সমর্থকদের বিপুল ব্যবধানে জয় নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে, যাতে ফলাফল নিয়ে বিতর্ক তোলার সুযোগ কমে আসে।

আইজেনকোট নিজেও নির্বাচনে অংশ নিয়ে বলেছেন, ইসরায়েলকে নতুন পথে এগিয়ে নেওয়ার সময় এসেছে। তাঁর সমর্থকেরা ভোটকেন্দ্রে তাঁকে স্বাগত জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পক্ষে স্লোগান দেন।

নির্বাচনে বিভিন্ন দলের পক্ষ থেকে অনিয়মের অভিযোগ তোলা হলেও ইসরায়েলের কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, ব্যালট পেপারে পরিকল্পিত বা ব্যাপক কারচুপির কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। কমিশনের ভাষ্য, বিচ্ছিন্নভাবে পাওয়া অভিযোগগুলো তাৎক্ষণিকভাবে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

ভোটের দিন কয়েকটি দল ব্যালট পেপার না পাওয়া, সেগুলো নষ্ট করা এবং ভোটগ্রহণে বাধা দেওয়ার মতো অভিযোগ করেছে। ইয়াশার, নাফতালি বেনেটের বি’ইয়াহাদ, ওফের উইন্টারের পিপল অব ইসরায়েল, আভিগদর লিবারম্যানের ইসরায়েল বেইতেনু, রা’আম এবং ইয়োয়াজ হেন্ডেলের রিজার্ভিস্টস-ইকোনমিক পার্টি অনিয়মের অভিযোগ জানিয়েছে।

এদিকে ভোট কেনাবেচার সন্দেহে দক্ষিণাঞ্চলের বেদুইন সম্প্রদায়ের তিন ব্যক্তিকে আটক করার কথা জানিয়েছে পুলিশ। পুলিশের দাবি, তাঁদের বাড়িতে তল্লাশি চালিয়ে নগদ অর্থভর্তি খামসহ কিছু আলামত পাওয়া গেছে। তবে রা’আম পার্টি এ ঘটনাকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত পদক্ষেপ বলে দাবি করেছে।

আরব অধ্যুষিত কয়েকটি এলাকায় ভোটারদের দীর্ঘ লাইনে অপেক্ষা করতে হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। পরিচয় যাচাইয়ের প্রক্রিয়া ধীরগতিতে পরিচালনার কারণে ভোট দিতে দেরি হচ্ছে বলে স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন। মানবাধিকার সংগঠন আদালাহও গ্যালিলি ও দক্ষিণাঞ্চলের কয়েকটি এলাকায় ভোটগ্রহণে বিলম্বের অভিযোগ পেয়েছে বলে জানিয়েছে।

অন্যদিকে অতি-অর্থোডক্স সম্প্রদায়ের ভোটারদের প্রতিনিধিত্বকারী চ্যারেডি পাবলিক পার্টির নেতা মোতি লাইটনার দাবি করেছেন, তাঁর দলের নির্বাচনী প্রচারকর্মীরা বিভিন্ন কেন্দ্রে হুমকি ও হয়রানির শিকার হয়েছেন। পশ্চিম তীরের মোদিইন ইলিত এলাকায় দলটির একটি প্রচারকেন্দ্র ভাঙচুর এবং প্রচারসামগ্রীতে আগুন দেওয়ার ঘটনাও সামনে এসেছে।

লাইটনারের অভিযোগ, কয়েকটি ভোটকেন্দ্রে তাঁদের দলের ব্যালট পেপার সরিয়ে ফেলা হয়েছে এবং ভোটারদের ভয় দেখানো হয়েছে। এসব ঘটনার তদন্ত ও ভোটারদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

ইসরায়েলের এবারের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে যুদ্ধ, নিরাপত্তা পরিস্থিতি ও অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিভাজনের কয়েক বছর পর। ফলে সরকার গঠনের লড়াইয়ের পাশাপাশি ভোটের গ্রহণযোগ্যতা নিয়েও রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বিরোধ দেখা দিয়েছে।

তবে ভোটার উপস্থিতির রেকর্ড এবং বিভিন্ন দলের অভিযোগের মধ্যেও নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, ব্যাপক কারচুপির প্রমাণ নেই। অভিযোগগুলোর তদন্তের পাশাপাশি চূড়ান্ত ফলাফলের জন্য অপেক্ষা করতে হবে। নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর নেতানিয়াহু ও বিরোধী জোটের মধ্যে সরকার গঠনের সমীকরণ আরও স্পষ্ট হবে।