ইসরায়েলের নির্বাচনে সবচেয়ে বেশি আসন পাওয়ার আভাস মিললেও সরকার গঠনের মতো সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাচ্ছে না প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টি। বুথফেরত জরিপ অনুযায়ী, তার নেতৃত্বাধীন জোট প্রায় ৫০টি আসন পেতে পারে। অথচ ১২০ আসনের পার্লামেন্ট নেসেটে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজন অন্তত ৬১ জন আইনপ্রণেতার সমর্থন। এমন পরিস্থিতিতে ক্ষমতা ধরে রাখতে ছোট দলগুলোর সমর্থন আদায়, নতুন রাজনৈতিক সমঝোতা কিংবা বিরোধীদের সঙ্গে জাতীয় ঐক্যের সরকার গঠনের মতো বিকল্প বিবেচনায় নিতে হতে পারে নেতানিয়াহুকে।
মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) অনুষ্ঠিত নির্বাচনের বুথফেরত জরিপে নেতানিয়াহুর জোট সংখ্যাগরিষ্ঠতা থেকে পিছিয়ে থাকলেও তার লিকুদ পার্টি একক দল হিসেবে সবচেয়ে বেশি আসন পেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। অন্যদিকে তাকে ক্ষমতা থেকে সরাতে চাওয়া বিরোধী শিবিরও সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় আসন নিশ্চিত করতে পারেনি। ফলে ইসরায়েলের পরবর্তী সরকার কারা গঠন করবে, তা নির্ভর করছে নির্বাচনের চূড়ান্ত ফল এবং পরবর্তী রাজনৈতিক দর-কষাকষির ওপর। খবর রয়টার্স ও ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যমের।
পুরোনো মিত্রদের নিয়েই কি ফের সরকার গড়বেন নেতানিয়াহু?
নেতানিয়াহুর জন্য প্রথম বিকল্প হতে পারে তার বর্তমান ডানপন্থী ও ধর্মীয় দলগুলোর জোট পুনর্গঠন। এই জোটে রয়েছে শাস পার্টি, ইউনাইটেড তোরাহ জুদাইজম, ইতামার বেন-গভিরের নেতৃত্বাধীন ওতজমা ইয়েহুদিত এবং বেজালেল স্মোট্রিচের রিলিজিয়াস জায়নিজম পার্টি।
তবে এসব দলের সমর্থন নিয়েও ৬১ আসনের সীমা অতিক্রম করা কঠিন হতে পারে। নির্বাচনে ওফের উইন্টারের নেতৃত্বাধীন পিপল অব ইসরায়েল পার্টি সংসদে প্রবেশের মতো ভোট পেলে দলটিকে জোটে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে। বিপরীতে দলটি প্রয়োজনীয় ভোট না পেলে নেতানিয়াহুর সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের হিসাব আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
ইসরায়েলের নির্বাচনী ব্যবস্থায় কোনও দল এককভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলে অন্য দলের সঙ্গে সমঝোতা করে সরকার গঠন করতে হয়। এ কারণে ছোট দলগুলোর কয়েকটি আসনও সরকার গঠনের চূড়ান্ত সমীকরণে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
বিরোধীদের সঙ্গে ঐক্যের সরকার গঠনের সম্ভাবনা
নেতানিয়াহুর সামনে আরেকটি বিকল্প হতে পারে বিরোধী নেতা গাদি আইজেনকোটের নেতৃত্বাধীন ইয়াশার পার্টির সঙ্গে সমঝোতা করে জাতীয় ঐক্যের সরকার গঠন। নির্বাচনের আগে ও পরে ইসরায়েলের রাজনৈতিক অঙ্গনে এমন সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে জানিয়েছে আনাদোলু এজেন্সি।
প্রস্তাবিত এই ব্যবস্থায় নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টি ও আইজেনকোটের ইয়াশার পার্টি একই সরকারে অংশ নিতে পারে। এমনকি মেয়াদের একপর্যায়ে দুই নেতার মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব ভাগাভাগির ধারণাও আলোচনায় এসেছে। তবে এ ধরনের সমঝোতার ক্ষেত্রে বড় বাধা হলো, বিরোধী নেতাদের অনেকে নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন সরকারে যোগ দিতে অনিচ্ছুক।
বিশেষ করে আইজেনকোটের শিবির নেতানিয়াহুকে সরিয়ে নতুন সরকার গঠনের কথা বলে আসছে। ফলে জাতীয় ঐক্যের সরকার গঠনের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা থাকলেও বাস্তবে দুই পক্ষের মধ্যে সমঝোতা হবে কি না, তা এখনও স্পষ্ট নয়।
লিকুদের ভেতর থেকে সমর্থন আদায়ের চেষ্টা
নির্বাচনের আগে বিরোধী দল ইয়াশারের নেতা মাতান কাহানা দাবি করেছিলেন, নেতানিয়াহুর দলের কয়েকজন আইনপ্রণেতার সঙ্গে তাঁদের যোগাযোগ রয়েছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিকুদের কিছু সদস্য নেতানিয়াহুর চেয়ে আইজেনকোটের সঙ্গে বেশি কথা বলছেন। তবে তিনি কারও নাম প্রকাশ করেননি।
কাহানা আরও জানিয়েছিলেন, নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন সরকারে যোগ দেওয়ার পরিকল্পনা তাদের নেই। বরং প্রথমে নেতানিয়াহুকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা গঠন এবং পরে সরকার সম্প্রসারণের বিষয়ে ভাবতে চান তারা।
এটি বিরোধী পক্ষের দাবি; লিকুদের আইনপ্রণেতারা দলত্যাগ করছেন বা নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে অবস্থান নিচ্ছেন—এমন কোনও নিশ্চিত তথ্য এতে প্রতিষ্ঠিত হয় না। তবে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের লড়াইয়ে দুই শিবিরের মধ্যে রাজনৈতিক যোগাযোগ ও সমর্থন আদায়ের প্রচেষ্টা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
আরব দলগুলোর সমর্থন কি হিসাব বদলে দেবে?
বুথফেরত জরিপে আরব নেতৃত্বাধীন দলগুলোর সম্মিলিত আসনসংখ্যা ১৭ থেকে ১৮ হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ফলে সরকার গঠনের ক্ষেত্রে তাদের অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ। তবে নেতানিয়াহু ও আইজেনকোট—উভয় পক্ষই নির্বাচনের আগে আরব দলগুলোর ওপর নির্ভর করে সরকার গঠনের বিষয়ে আপত্তি জানিয়েছিলেন।
আনাদোলু এজেন্সির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিরোধী পক্ষের কেউ কেউ আরব দলগুলোকে সরকারে অন্তর্ভুক্ত না করেও সংসদে তাদের সমর্থন নিয়ে সংখ্যালঘু সরকার গঠনের সম্ভাবনা বিবেচনা করতে পারেন। এমন সরকার গঠিত হলে তা টিকিয়ে রাখার জন্যও সংসদে অন্য দলের সহযোগিতা প্রয়োজন হবে।
নেতানিয়াহুর জন্য এই পরিস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ বিরোধী পক্ষ বিকল্প সমর্থন জোগাড় করতে পারলে তার দীর্ঘদিনের ক্ষমতা ধরে রাখার পথ সংকুচিত হতে পারে। তবে আরব দলগুলোর সমর্থন নিয়ে বিরোধীদের মধ্যে ঐকমত্য তৈরি হবে কি না, তা এখনও অনিশ্চিত।
চূড়ান্ত ফলের পরই বোঝা যাবে নেতানিয়াহুর পরবর্তী পদক্ষেপ
নির্বাচনের বুথফেরত জরিপ চূড়ান্ত ফল নয়। ভোট গণনা ও আসন বণ্টন শেষ হওয়ার পরই কোন দল কতটি আসন পেয়েছে, তা নিশ্চিত হবে। রয়টার্স জানিয়েছে, চূড়ান্ত ফলের পর প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগ রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে সরকার গঠনের সবচেয়ে বেশি সম্ভাবনা রয়েছে—এমন একজন আইনপ্রণেতাকে দায়িত্ব দিতে পারেন। মনোনীত ব্যক্তি সরকার গঠনের জন্য সর্বোচ্চ ৪২ দিন সময় পাবেন।
নেতানিয়াহু যদি প্রয়োজনীয় সমর্থন জোগাড় করতে না পারেন, তবে অন্য কোনও নেতা সরকার গঠনের সুযোগ পেতে পারেন। আর কোনও পক্ষই সরকার গঠনে ব্যর্থ হলে নতুন নির্বাচন আয়োজনের পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। সে ক্ষেত্রে নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়া পর্যন্ত বর্তমান মন্ত্রিসভা তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে কাজ করবে।
সব মিলিয়ে, নেতানিয়াহুর সামনে এখন পুরোনো জোট ধরে রাখা, নতুন মিত্র খোঁজা কিংবা জাতীয় ঐক্যের সরকারের মতো বিকল্প রয়েছে। তবে নির্বাচনের পর তাঁর দল আনুষ্ঠানিকভাবে কাদের সঙ্গে সরকার গঠনের আলোচনা শুরু করেছে, সে বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য এখনো পাওয়া যায়নি। ফলে আপাতত তাঁর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে চূড়ান্ত আসনসংখ্যা এবং জোট গঠনের সমীকরণ।