‘নোংরা নথি’ ফাঁসে নতুন বিপাকে ফেসবুক

ফেসবুকের ফাঁস হয়ে যাওয়া একটি অভ্যন্তরীণ নথিতে প্রতিষ্ঠানটির একজন ভাইস প্রেসিডেন্ট মন্তব্য করেছেন, ফেসবুকের ব্যবহার বাড়াতে ‘অগ্রহণযোগ্য কাজ’ করা যেতে পারে। তাদের মূল কাজ হচ্ছে ফেসবুকের ব্যবহারকারী বাড়ানো এবং ফেসবুকের মাধ্যমে হওয়া যোগাযোগের পরিমাণ বৃদ্ধি করা। তার জন্য সব কৌশলই গ্রহণযোগ্য। যেকোনও মূল্যে ব্যবহারকারী বৃদ্ধির পক্ষে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করে অ্যান্ড্রু বোসওয়ার্থ নথিতে লিখেছিলেন, ফেসবুক ব্যবহার করে হেনস্তার শিকার কেউ আত্মহত্যা করলেও করতে পারে। ফেসবুকের মাধ্যমে যোগাযোগ রক্ষা করে সংগঠিত কোনও আত্মঘাতী বোমা হামলায় কেউ মারাও যেতে পারে। এরকম খারাপ ঘটনা ঘটতেই পারে, যদি ব্যবহারকারীরা এটা খারাপভাবে ব্যবহার করেন। কিন্তু আমাদের লক্ষ্য ব্যবহারকারীদের মধ্যে যোগাযোগ আরও বাড়িয়ে তোলা।’ অ্যান্ড্রু বলেছেন, তিনি বিতর্ক চালিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য লিখেছেন ওইসব কথা। তার মানে এই না যে, তিনি নথিতে লেখা বক্তব্য সমর্থন করেন। সাংগঠনিক নেতৃত্বের বিষয়ে জাকারবার্গ বোসওয়ার্থের প্রশংসা করলেও, ওই বক্তব্যের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করার কথা জানিয়েছেন।

Mark-Zuckerberg1

বাজফিড বৃহস্পতিবার ওই ফাঁস হয়ে যাওয়া অভ্যন্তরীণ নথি প্রকাশ করেছে। যাকে ‘দ্যা আগলি’ নামে ডাকা হচ্ছে। ওই ‘নোংরা নথিতে’ মূলত ফুটে উঠেছে নানামুখী সমালোচনার প্রেক্ষিতে ফেসবুকের ভাইস প্রেসিডেন্টদের একজন অ্যান্ড্রু বোসওয়ার্থের মন্তব্য। বাজফিড বোসওয়ার্থেকে উদ্ধৃত করেছে,—‘আমরা মানুষকে যুক্ত করি। দাঁড়ি। সেহেতু প্রবৃদ্ধির জন্য আমরা যা-ই করি না কেন তা যৌক্তিক; এমন কি কার সঙ্গে কার যোগাযোগ আছে তার তথ্য ফেসবুকে নিয়ে আসা থেকে শুরু করে সেসব সূক্ষ্ম ভাষাকে প্রশ্রয় দেওয়া যেগুলো মানুষকে খুঁজে পেতে সাহায্য করে, সবই সঠিক। আমারা যা করি তার উদ্দেশ্য হলো ফেসবুকে হওয়া ব্যবহারকারীদের যোগাযোগ আরও বৃদ্ধি করা। এই কাজ আমাদের চীনেও একসময় করতে হবে।’

বাজ ফিড লিখেছে, বোসওয়ার্থের লেখা নথি পড়লেই বোঝা যায় ফেসবুক ব্যবহারকারীদের শারীরিক ও মানসিক ক্ষতির বিষয়ে তারা কতটা স্পষ্ট ধারণা রাখে। জাকারবার্গের দীর্ঘদিনের সহযোগী বোসওয়ার্থ ২০০৬ সালে মাইক্রোসফট থেকে ফেসবুকে যোগ দিয়েছিলেন। সেই থেকে ফেসবুকের ভালোমন্দের সঙ্গে তিনি গভীরভাবে জড়িত। সেই বোসওয়ার্থই লিখেছিলেন, বিতর্কিত উপায়ে তথ্য সংগ্রহ করা থেকে শুরু করে ব্যবহারকারীদের সঙ্গে প্রতারনাপূর্ণ ভাষায় বার্তা দেওয়া সবই প্রবৃদ্ধির জন্য গ্রহণযোগ্য। নথিটির মূল বক্তব্য হলো, মানুষে মানুষে যোগাযোগ করিয়ে দেওয়াটা ফেসবুকের জন্য এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে তার জন্য যা-ই করা হোক না কেন তা-ই সঠিক। এমন কি যদি তা কাউকে চরম ভয়ঙ্কর কোনও কিছু ঘটিয়ে দেওয়ার সুযোগ করে দেয় তাহলেও।

২০১৬ সালের ওই নথি সামনে আসে যখন ফেসবুকের একজন কর্মকর্তা ফেসবুকের ‘জবাবদিহিহীনতায়’ অসন্তুষ্ট হয়ে সেটি ফেসবুকে কর্মরতদের জন্য পোস্ট করেন। আর বোসওয়ার্থ ওই নথিটি লিখেছিলেন শিকাগোতে একজনকে হত্যার দৃশ্য ফেসবুক লাইভে প্রচার হয়ে যাওয়ার পর। তখন ফেসবুকের বিরুদ্ধে সমালোচনা চলছিল। তাছাড়া ইসরায়েলি টিনেজারকে হত্যার পর হত্যাকারীর ফেসবুকে গর্ব করে দেওয়া বার্তা প্রচারিত হওয়ায়ও সমালোচনা হয়েছিল অনেক। সমালোচনার মুখে ফেসবুকের লক্ষ্য নিজের ভাষায় তুলে ধরেছিলেন তিনি। বাজফিড লিখেছে, ওই ধরণের আপত্তিকর ঘটনায় ফেসবুকের ব্যবহৃত হওয়াটাকে ‘নোংরা দিক’ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন বোসওয়ার্থ।

দ্যা আটলান্টিক তাদের এক প্রতিবেদনে তুলে ধরেছে আত্মপক্ষ সমর্থনে বলা বোসওয়ার্থের বক্তব্য, ‘আমি নিজেও ওই লেখার বক্তব্যে আস্থা রাখি না। আর যখন লিখেছিলাম তখনও বিশ্বাস করতাম না। ওসব কথা লেখার কারণ হচ্ছে শক্তিশালী বিতর্কের মাধ্যমে আসল সমস্যাগুলোকে চিহ্নিত করা।

ফেসবুকের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানিয়েছেন কিছু বিতর্ক হলেও বোসওয়ার্থের ওই মন্তব্য নাকি ফেসবুকের ভেতর ‘তুমুল জনপ্রিয়।’ নথি ফাঁস হয়ে যাওয়াতেই বরং ফেসবুকে কর্মরতদের কেউ কেউ অসন্তুষ্ট। ভ্যানিটি ফেয়ার জানিয়েছে একজনের বক্তব্য, ‘এটি খুব হতাশাজনক। আরও বেশি নিষ্ঠাবান কর্মী নিয়োগ করা যায় কি না ভেবে দেখা দরকার। আমরা এখানে বুদ্ধিবৃত্তির ওপর খুব জোর দেওয়ায় স্মার্ট কর্মী পাচ্ছি কিন্তু তাদের নৈতিকতা ও বিশ্বস্ততার ঘাটতি রয়েছে।’

 উল্লেখ্য। কেমব্রিজ অ্যানালাইটিকার মাধ্যমে ব্যবহারকারীদের তথ্য বেহাত হওয়ায় প্রচণ্ড সমালোচনার মুখে পড়েছে ফেসবুক এবং এর প্রতিষ্ঠাতা মার্ক জাকারবার্গ। বিজ্ঞাপনদাতাদের অনেকের বাতিল করে দিয়েছেন ফেসবুকের জন্য নির্ধারিত বিজ্ঞাপন।  অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটের সঙ্গে সঙ্গে যুক্তরাজ্যের সরকারি কর্মকর্তারাও তথ্য ফাঁসের বিষয়ে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে চান। এমন কি ভারতও প্রয়োজনে তাকে ডাকিয়ে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করার কথা ঘোষণা করেছে। এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে ফেসবুক ভুয়া খবর ছাড়ানোর মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ায় দুঃখ প্রকাশ করতে হয়েছিল জাকারবার্গকে। আর সর্বশেষ সামনে এলো যেকোনওভাবে ব্যবহারকারী বাড়াবার প্রত্যয় ঘোষণা করা এই ‘নোংরা নথি’। সূত্র: বাজফিড, দ্যা আটলান্টিক ও ভ্যানিটিফেয়ার।