আন্তর্জাতিক জলদস্যুতা

তেলবাহী ট্যাংকার জব্দের পর যুক্তরাষ্ট্রের নিন্দা ভেনেজুয়েলার

ভেনেজুয়েলার উপকূলের কাছে একটি তেলবাহী ট্যাংকার জব্দের ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ‘আন্তর্জাতিক জলদস্যুতা’র অভিযোগ তুলেছে কারাকাস। ভেনেজুয়েলার সরকার বলেছে, আন্তর্জাতিক জলসীমায় এই অভিযান গুরুতর অপরাধ। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা এ খবর জানিয়েছে।

দেশটির ভাইস প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজ এক বিবৃতিতে বলেছেন, তেল পরিবহনকারী একটি বেসরকারি জাহাজ চুরি ও ছিনতাই করা হয়েছে এবং জাহাজটির নাবিকদের জোরপূর্বক গুম করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর সদস্যরা আন্তর্জাতিক জলসীমায় এই কাজ করেছে। এই কর্মকাণ্ড শাস্তিহীন থাকবে না।

এ বিষয়ে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদসহ বিভিন্ন বহুপক্ষীয় সংস্থা ও বিশ্বের বিভিন্ন সরকারের কাছে অভিযোগ জানানো হবে বলেও জানান তিনি।

এর আগে যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলার উপকূলের কাছে দ্বিতীয় একটি তেলবাহী ট্যাংকার জব্দ করে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্দেশে ঘোষিত ‘অবরোধ’ কার্যকর করতে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে ওয়াশিংটন। এতে কারাকাসে ক্ষোভ তৈরি হয় এবং ভেনেজুয়েলা কর্তৃপক্ষ একে ‘চুরি ও ছিনতাই’ হিসেবে বর্ণনা করছে।

যুক্তরাষ্ট্রের হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগের সচিব ক্রিস্টি নোম শনিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে এক পোস্টে জাহাজটি আটকানোর বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তিনি বলেন, পেন্টাগনের সহায়তায় কোস্টগার্ড এই অভিযান চালিয়েছে। ভোররাতে চালানো এই অভিযান সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ভেনেজুয়েলার কাছে কোনো ট্যাংকারের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিতীয় পদক্ষেপ। একই সময়ে ওই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের বড় ধরনের সামরিক উপস্থিতিও লক্ষ করা যাচ্ছে।

ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর ওপর চাপ বাড়াতে ট্রাম্প প্রশাসন পদক্ষেপ জোরদার করছে। মঙ্গলবার ট্রাম্প ভেনেজুয়েলায় প্রবেশ ও বের হওয়া সব নিষেধাজ্ঞাভুক্ত তেলবাহী ট্যাংকারের ওপর ‘সম্পূর্ণ ও সর্বাত্মক অবরোধ’ দেওয়ার নির্দেশ দেন।

ওয়াশিংটনের আইন সংস্থা হিউজেস হাবার্ডের অংশীদার জেরেমি প্যানার ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ওই জাহাজটিকে নিষেধাজ্ঞাভুক্ত করেনি। নিষেধাজ্ঞার আওতায় না থাকা কোনও জাহাজ জব্দ করা ভেনেজুয়েলার ওপর ট্রাম্পের চাপ আরও বাড়ানোর ইঙ্গিত। একই সঙ্গে এটি নিষেধাজ্ঞাভুক্ত ট্যাংকারের বিরুদ্ধে অবরোধের ঘোষণার সঙ্গেও সাংঘর্ষিক।

এই ধরনের হামলাকে যুক্তরাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক আইন উভয়ের দৃষ্টিতেই অবৈধ বলে মনে করা হচ্ছে। আইন বিশেষজ্ঞ ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো এগুলোকে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড হিসেবেও বর্ণনা করেছে। ট্রাম্প বলেছেন, ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের স্থল অভিযানও হতে পারে।

মাদুরো বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সমাবেশের লক্ষ্য তাকে ক্ষমতাচ্যুত করা এবং বিশ্বের সবচেয়ে বড় অপরিশোধিত তেলের মজুত থাকা ভেনেজুয়েলার তেলসম্পদের নিয়ন্ত্রণ নেওয়া। সাবেক মার্কিন কূটনীতিক ও পেন্টাগন কর্মকর্তা অ্যাডাম ক্লেমেন্টস আল জাজিরাকে বলেন, সাম্প্রতিক জব্দের ঘটনা মাদুরোর ওপর চাপ তৈরির একটি কৌশল মাত্র। তবে ভেনেজুয়েলা নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের নির্দিষ্ট পররাষ্ট্রনীতির লক্ষ্য কী, তা স্পষ্ট নয়। তিনি বলেন, সম্প্রতি প্রশাসনের কিছু অংশ উনিশ শতকের পররাষ্ট্রনীতি পুনরুজ্জীবিত করছে বলে ইঙ্গিত মিলছে।

আন্তর্জাতিক আইনের ‘প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর স্থায়ী সার্বভৌমত্ব’ নীতির আওতায় ভেনেজুয়েলার তেল দেশটিরই সম্পদ। ১৯৭৬ সালে ভেনেজুয়েলা তেল খাত জাতীয়করণ করে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান পিডিভিএসএর নিয়ন্ত্রণে আনে। পরে ২০০৭ সালে প্রয়াত বামপন্থি প্রেসিডেন্ট হুগো চাভেজ বাকি বিদেশি তেল প্রকল্পগুলোও জাতীয়করণ করেন, যার ফলে কনোকোফিলিপস ও এক্সন মবিলের মতো মার্কিন তেল কোম্পানিগুলো দেশটি ছাড়তে বাধ্য হয়েছিল।