নতুন এপস্টেইন নথিতে ১০টি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়

সম্প্রতি কুখ্যাত নারী নিপীড়ক জেফরি এপস্টেইন সম্পর্কিত ৩০ লাখ নথি অবমুক্ত করেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ। এই নথিগুলোর মধ্যে বিশ্বের বাঘা ক্ষমতাধর ব্যক্তিদের ক্ষমতার অপব্যবহারের নানান তথ্য উঠে এসেছে।দ্য গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদনে এই নথিগুলোর ১০টি গুরুত্বপূর্ণ দিক উঠে এসেছে। 

যুক্তরাষ্ট্রের ন্যায্যতা বিভাগের মাধ্যমে প্রকাশিত জেফ্রি এপস্টিন ফাইলের মধ্যে থাকা নথিগুলি। ছবি: এপি

মৃত্যুর আগে এপস্টেইনের সম্ভাব্য সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা

২০১৯ সালে জেলে এপস্টেইনের মৃত্যুর দুই সপ্তাহেরও কম সময় আগে তার আইনজীবীরা ম্যানহাটনের ফেডারেল প্রসিকিউটরদের সঙ্গে বৈঠক করেছিলেন। নথিতে দেখা যায়, সেখানে এপস্টেইনের সম্ভাব্য সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা হয়।
এফবিআই-এর একটি ডকুমেন্টে উল্লেখ আছে: “২৯ জুলাই, ২০১৯ তারিখে এফবিআই ও প্রসিকিউটররা এপস্টেইনের আইনজীবীদের সঙ্গে বৈঠক করেন। খুব সাধারণভাবে মামলার সমাধান ও অভিযুক্তের সহযোগিতার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়।”
আরেকটি নথিতে বলা হয়েছে, প্রতিরক্ষা আইনজীবীরা কোনো নির্দিষ্ট প্রস্তাব দেননি এবং এপস্টেইন কী ধরনের সহযোগিতা করতে পারেন তা স্পষ্ট করেননি। সেখানে আরও উল্লেখ করা হয়, যদি এপস্টেইন নিজের দায় স্বীকার করতে প্রস্তুত থাকেন বা কোনো নির্দিষ্ট সমাধান প্রস্তাব থাকে, তবে তার আইনজীবীরা নিউইয়র্কের দক্ষিণ জেলা প্রসিকিউটরদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন।

ট্রাম্প সম্পর্কিত অভিযোগ
নতুন প্রকাশিত নথির মধ্যে একটি এফবিআই সারসংক্ষেপে দেখা যায়, সংস্থাটি ট্রাম্প ও এপস্টেইনকে ঘিরে এক ডজনেরও বেশি টিপস পেয়েছিল। তবে কেন এই সারসংক্ষেপ তৈরি করা হয়েছিল তা স্পষ্ট নয়, আর টিপসগুলো কখন পাওয়া গিয়েছিল তাও উল্লেখ নেই। নথিতে কোনো প্রমাণ বা যাচাইয়ের ইঙ্গিতও নেই।  
ট্রাম্প বারবার এপস্টেইনের সঙ্গে কোনো অন্যায় সম্পর্ক অস্বীকার করেছেন। নিউইয়র্ক টাইমসের প্রশ্নে হোয়াইট হাউস বিচার বিভাগের এক বিবৃতির দিকে ইঙ্গিত করে জানায়, নতুন প্রকাশিত নথিগুলোতে “ভুয়া বা মিথ্যা ছবি, নথি বা ভিডিও থাকতে পারে।”  
বিচার বিভাগ আরও বলেছে, “কিছু নথিতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বিরুদ্ধে অযাচাইকৃত ও চটকদার অভিযোগ রয়েছে, যা ২০২০ সালের নির্বাচনের ঠিক আগে এফবিআই-তে জমা দেওয়া হয়েছিল। স্পষ্ট করে বলতে গেলে, এসব দাবি ভিত্তিহীন ও মিথ্যা। যদি সামান্যও বিশ্বাসযোগ্যতা থাকত, তবে এগুলো ইতিমধ্যেই রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করা হতো।”  

ইলন মাস্ক ও এপস্টেইন

এপস্টেইন ফাইলের তথ্য অনুযায়ী ইলন মাস্ক ও এপস্টেইনের ইমেইল চালাচালির সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া গেছে। মাস্ক ২০১২-১৩ সালে এপস্টেইনের ব্যক্তিগত দ্বীপে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন। যদিও সেই সফরগুলো বাস্তবে ঘটেনি। ইলন মাস্কের বক্তব্য, এপস্টেইনের ব্যক্তিগত দ্বীপে যাওয়ার আমন্ত্রণ বারবার পেয়েও সেই আমন্ত্রণ প্রত্যাখান করেছেন তিনি। আর এপস্টেইনকেও তিনি স্পষ্টভাবে ক্রিপ (জেনজি পরিভাষায় সম্ভাব্য যৌন হেনস্থাকারীদের ক্রিপ বলা হয়) বলেছেন।

হাওয়ার্ড লাটনিকের দ্বীপ সফরের পরিকল্পনা

একই ফাইল থেকে দেখা যায়, ট্রাম্প সরকারের বাণিজ্য সচিব হাওয়ার্ড লাটনিক ২০১২ সালে এপস্টেইনের দ্বীপে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন। তিনি পরবর্তীতে বলেছেন, ২০০৫-এর পর থেকে এপস্টেইনের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেছেন।

বাকিংহাম প্যালেসে এপস্টিনের আমন্ত্রণ

জেফরি এপস্টেইনের সাথে ব্রিটিশ রাজপরিবারের সদস্য অ্যান্ড্রু মাউন্টব্যাটেন উইন্ডসরের ইমেইল চালাচালির প্রমাণ পাওয়া গেছে। এই ইমেইলগুলো থেকে জানা যায়, অ্যান্ড্রু ২০১০ সালে এপস্টেইনকে বাকিংহাম প্যালেসে ডিনারে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। পরবর্তীতে এপস্টেইন অ্যান্ড্রুর সাথে ২৬ বছর বয়সী এক রাশিয়ান মহিলার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার প্রস্তাবও করেছিলেন। এপস্টেইনের সাথে সম্পৃক্ততার দায়ে অ্যান্ড্রুর রাজকীয় পদবী বাতিল করা হয়।

রিচার্ড ব্র্যানসনের সঙ্গে এপস্টিনের ইমেইল

২০১৩ সালের একটি ইমেইল বিনিময়ে দেখা যায়, ভার্জিন গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা ব্রিটিশ বিলিয়নিয়ার রিচার্ড ব্র্যানসন এপস্টেইনকে লিখেছিলেন: “গতকাল তোমাকে দেখে ভালো লাগলো… যেকোনো সময় এলাকায় এলে দেখা করতে চাই, তবে তোমার ‘হ্যারেম’ সঙ্গে আনতে হবে।” 

ভার্জিন গ্রুপের পক্ষ থেকে জানানো হয়, ব্র্যানসন ওই ইমেইল পাঠান ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ডসে তার ব্যক্তিগত দ্বীপে আয়োজিত একটি ব্যবসায়িক বৈঠকের পর। এপস্টেইন সেখানে তিনজন প্রাপ্তবয়স্ক নারী নিয়ে আসেন, যাদের তিনি “হ্যারেম” বলে উল্লেখ করেছিলেন, তবে তারা বৈঠকে অংশ নেননি। 

প্রতিনিধি আরও বলেন, ব্র্যানসন ও তার স্ত্রী জোয়ান এপস্টেইনের সঙ্গে খুব সীমিত কয়েকবারই দেখা করেছেন, সবই ব্যবসায়িক বা গ্রুপ পরিবেশে। ব্র্যানসন এপস্টেইনের কর্মকাণ্ডকে “ঘৃণ্য” বলে মনে করেন এবং ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচারের অধিকারের প্রতি সমর্থন জানান। 

লস এঞ্জেলেস অলিম্পিক কমিটির প্রধানের ইমেইল ফাইল

২০০৩ সালের ইমেইল বিনিময়ে দেখা যায়, লস অ্যাঞ্জেলেস অলিম্পিক আয়োজন কমিটির প্রধান কেসি ওয়াসারম্যান ও গিসলেইন ম্যাক্সওয়েলের মধ্যে ব্যক্তিগত বার্তা আদান-প্রদান হয়েছিল। ওয়াসারম্যান ম্যাক্সওয়েলকে লিখেছিলেন: “আমি সবসময় তোমার কথা ভাবি… তোমাকে টাইট লেদারের পোশাকে দেখতে হলে কী করতে হবে?” 

একই বছরের এপ্রিল মাসে ম্যাক্সওয়েল ওয়াসারম্যানকে ইমেইলে প্রস্তাব দেন যে তিনি এমন একটি ম্যাসাজ দিতে পারেন যা “একজন পুরুষকে পাগল করে দিতে পারে।” 

ওয়াসারম্যান পরে এক বিবৃতিতে বলেন, তিনি এই যোগাযোগের জন্য “গভীরভাবে অনুতপ্ত” এবং এটি হয়েছিল “তার ভয়াবহ অপরাধ প্রকাশের অনেক আগে।” তিনি আরও স্পষ্ট করেন যে তার এপস্টেইনের সঙ্গে কোনো ব্যক্তিগত বা ব্যবসায়িক সম্পর্ক ছিল না, যদিও ২০০২ সালে ক্লিনটন ফাউন্ডেশনের একটি মানবিক সফরে তিনি এপস্টেইনের বিমানে ভ্রমণ করেছিলেন। তিনি এপস্টেইন ও ম্যাক্সওয়েলের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক থাকার জন্য দুঃখ প্রকাশ করেছেন। 

নিউ ইয়র্ক জায়ান্টস কো-ওনারের ইমেইল

২০১৩ সালের ইমেইল বিনিময়ে দেখা যায়, নিউইয়র্ক জায়ান্টসের সহ-মালিক স্টিভ টিশ ও জেফ্রি এপস্টেইনের মধ্যে যোগাযোগ হয়েছিল। প্রকাশিত নথিতে টিশের নাম কয়েকশোবার এসেছে, এবং কিছু ইমেইলে দেখা যায় এপস্টেইন তাকে কয়েকজন নারীর সঙ্গে যুক্ত করেছিলেন। 

টিশ এক বিবৃতিতে বলেন, তাদের মধ্যে “সংক্ষিপ্ত যোগাযোগ” হয়েছিল যেখানে তারা প্রাপ্তবয়স্ক নারীদের নিয়ে ইমেইল বিনিময় করেছিলেন, পাশাপাশি সিনেমা, দাতব্য কাজ ও বিনিয়োগ নিয়েও আলোচনা করেছিলেন। তিনি আরও স্পষ্ট করেন যে তিনি এপস্টেইনের কোনো আমন্ত্রণ গ্রহণ করেননি এবং কখনো তার দ্বীপে যাননি। 

টিশ বলেন, “আমরা এখন সবাই জানি, সে ছিল ভয়ঙ্কর মানুষ এবং তার সঙ্গে সম্পর্ক রাখার জন্য আমি গভীরভাবে অনুতপ্ত।” 

পিটার ম্যান্ডেলসন ও এপস্টেইন

প্রকাশিত ব্যাংক রেকর্ডে দেখা যায়, জেফ্রি এপস্টেইনের জেপি মরগান অ্যাকাউন্ট থেকে ম্যান্ডেলসনের নামে তিনটি আলাদা ২৫,০০০ ডলারের পেমেন্ট হয়েছে। আরও কিছু নথিতে উল্লেখ আছে, ২০০৯ সালে কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়ার পর এপস্টেইন ম্যান্ডেলসনের স্বামীকে কয়েক হাজার পাউন্ড পাঠিয়েছিলেন। 

এ বিষয়ে যোগাযোগ করলে ম্যান্ডেলসন বলেন, তিনি এসব অর্থ পাওয়ার কোনো রেকর্ড বা স্মৃতি রাখেন না এবং নথিগুলো আসল কিনা জানেন না। ফাইলগুলোতে আরও একটি ছবি রয়েছে যেখানে ম্যান্ডেলসনকে অন্তর্বাসে এক নারীর পাশে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়, তবে নারীর মুখ গোপন করা হয়েছে। ম্যান্ডেলসন বলেছেন, তিনি ছবির স্থান বা পরিস্থিতি মনে করতে পারছেন না। 

এপস্টেইনের সঙ্গে সম্পর্কের কারণে ম্যান্ডেলসনকে সেপ্টেম্বর মাসে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয় এবং পরে তিনি লেবার পার্টি থেকে পদত্যাগ করেন। এক বিবৃতিতে তিনি স্বীকার করেন যে এপস্টেইনের প্রতি আস্থা রাখা এবং সম্পর্ক চালিয়ে যাওয়া ছিল ভুল সিদ্ধান্ত। তিনি বলেন, “আমি গভীরভাবে অনুতপ্ত এবং ভুক্তভোগী নারী ও মেয়েদের কাছে নিঃশর্তভাবে ক্ষমা চাইছি।” 

হলিউড নির্মাতা ব্রেট র‍্যাটনারের ছবি প্রকাশ

হলিউড চলচ্চিত্র নির্মাতা ব্রেট র‍্যাটনারকে নিয়ে নতুন প্রকাশিত একটি ছবিতে দেখা যায় তিনি সোফায় বসে এক নারীকে জড়িয়ে আছেন, আর তার পাশে এপস্টেইন বসে আছেন অন্য এক নারীর সঙ্গে। দুই নারীর মুখ গোপন করা হয়েছে। 

ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ছবিটি সম্ভবত এপস্টেইনের নিউইয়র্ক টাউনহাউসে তোলা হয়েছিল, তবে ছবির তারিখ উল্লেখ নেই। 

র‍্যাটনার ২০২৩ সালে জার্নালকে জানিয়েছিলেন যে তিনি এপস্টেইনকে চেনেন না এবং কখনো তার সঙ্গে দেখা হয়নি। শনিবার জার্নালের পক্ষ থেকে মন্তব্য চাইলে র‍্যাটনারের এক মুখপাত্র মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানান।