মানুষের ত্বকের অতি ক্ষুদ্র নমুনা থেকে কি ব্রেন টিস্যু বা মস্তিষ্কের কলা তৈরি করা সম্ভব? বিজ্ঞানীরা বহু বছর ধরেই এ কাজ করছেন। মানুষের প্রাপ্তবয়স্ক কোষকে রিপ্রোগ্রাম করে ইনডিউসড প্লুরিপোটেন্ট স্টেম সেল-এ রূপান্তর করা হয়, যা পরে নিউরনে পরিণত হতে পারে। সঠিক পরিবেশে এই কোষগুলো ত্রিমাত্রিক গঠনে বিন্যস্ত হয়ে ব্রেন অর্গানয়েড গঠন করে। যদিও এগুলো আসল মস্তিষ্কের মতো পূর্ণাঙ্গ বা জটিল নয়, তবে বিকাশমান মস্তিষ্কের নানা বৈশিষ্ট্য ফুটিয়ে তুলতে পারে।
এসব অর্গানয়েড কেবল মডেল নয়, এগুলো সচল নিউরন যুক্ত জীবন্ত টিস্যু, যা বৈদ্যুতিক সংকেত আদান-প্রদান করতে পারে। মস্তিষ্কের বিকাশ ও জটিল রোগ গবেষণার পাশাপাশি ওষুধের পরীক্ষামূলক প্রয়োগে প্রাণীদের ওপর নির্ভরতা কমানোর জন্য এগুলো ব্যবহার করা হচ্ছে। এই গবেষণায় গতি আনতে যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব হেলথ (এনআইএইচ) ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে অর্গানয়েড মডেলিং সেন্টারের জন্য ৮ কোটি ৭০ লাখ ডলার এবং ২০২৬ সালের মার্চে মানবভিত্তিক গবেষণার জন্য আরও ১৫ কোটি ডলারের বেশি অর্থ বরাদ্দ দিয়েছে।
তবে এই অর্গানয়েডগুলো শুধু চিকিৎসাবিজ্ঞানেই সীমাবদ্ধ নেই। ২০২২ সালে মেলবোর্নভিত্তিক কোর্টিকাল ল্যাবস-এর বিজ্ঞানীরা ‘ডিশব্রেন’ নামক সিস্টেমে ল্যাবে সংবর্ধিত মানুষ ও ইঁদুরের নিউরনকে ইলেকট্রোডের সঙ্গে যুক্ত করে ভিডিও গেম ‘পং’ খেলা শেখান। ইলেকট্রনিক সংকেতের প্রতিক্রিয়ায় নিউরনগুলো নিজেদের কর্মক্ষমতা উন্নত করে, যাকে গবেষকেরা সিন্থেটিক বায়োলজিক্যাল ইন্টেলিজেন্স বলছেন।
এরই ধারাবাহিকতায় শুরু হয়েছে অর্গানয়েড ইন্টেলিজেন্স নামে একটি ক্ষেত্র, যেখানে জীবন্ত নিউরাল টিস্যুকে কম্পিউটারের অংশ হিসেবে ব্যবহারের চেষ্টা চলছে। কোর্টিকাল ল্যাবস ‘সিএলওয়ান’ নামের বায়োলজিক্যাল কম্পিউটার তৈরি করেছে, যেখানে ‘ডুম’ গেমও চালিয়ে দেখানো হয়েছে। তবে বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত করেছেন যে, কোনও সচেতন কৃত্রিম মস্তিষ্ক বা অর্গানয়েড চালিত রোবট এখনও তৈরি হয়নি।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বড় ধরনের নৈতিক প্রশ্নও। ২০২৪ সালে ফ্রন্টিয়ার্স ইন আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স-এর এক পর্যালোচনায় অর্গানয়েডের চেতনা, আইনি সুরক্ষা ও নৈতিক মর্যাদা নিয়ে আলোচনা করা হয়। এছাড়া ২০২৬ সালের জুলাইয়ে নেচার সাময়িকীর এক নিবন্ধে সতর্ক করা হয় যে, গবেষণায় টিস্যু দানকারী ব্যক্তিরা হয়তো জানেনই না তাদের কোষ দিয়ে বায়োলজিক্যাল কম্পিউটিং সিস্টেম তৈরি হতে পারে।
প্রথাগত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যেখানে সিলিকন চিপের ওপর নির্ভর করে, সেখানে বিজ্ঞানীরা পাত্রের ভেতর বুদ্ধিমত্তার মৌলিক উপাদান চাষ করছেন। জীবন্ত কোষ থেকে যদি বুদ্ধিমত্তার বিকাশ ঘটতে পারে, তবে ভবিষ্যতের কম্পিউটার কেবল মস্তিষ্ককে অনুকরণই করবে না, বরং আংশিকভাবে এটি দিয়ে তৈরিও হতে পারে।
সূত্র: এনডিটিভি