যে বাড়ি পরিণত হয়েছিল মৃত্যুপুরিতে, ৮ মাসের অন্তঃসত্ত্বা অভিনেত্রীর রক্ত দিয়ে লেখা হয়েছিল বার্তা

১৯৬৯ সালের ৮ আগস্টের রাত। রাতের খাবার শেষে লস অ্যাঞ্জেলেসের ১০০৫০ সিয়েলো ড্রাইভের নির্জন বাড়িতে চার বন্ধুকে সঙ্গে নিয়ে ফেরেন ২৬ বছর বয়সী অভিনেত্রী শ্যারন টেট। তিনি তখন সাড়ে আট মাসের অন্তঃসত্ত্বা। তার স্বামী বিখ্যাত চলচ্চিত্র নির্মাতা রোমান পোলানস্কির ইউরোপ থেকে ফিরে আসার অপেক্ষায় ছিলেন তিনি। কিন্তু পরদিন সূর্য ওঠার আগেই শ্যারন টেট ও তার সঙ্গে থাকা চারজন নৃশংস হত্যাকাণ্ডের শিকার হন।

হলিউড গ্ল্যামারে ভরা ঐতিহ্যবাহী একটি প্রাসাদোপম বাড়ি এক রাতে পরিণত হয় আমেরিকার ইতিহাসের অন্যতম বীভৎস অপরাধের প্রেক্ষাপটে। তবে মূল হোতা চার্লস ম্যানসন বা তার ঘাতক দলের মূল লক্ষ্য শ্যারন টেট ছিলেন না। ম্যানসন যে কারণে ওই বাড়ির ঠিকানা জানতেন, তা অন্য এক ব্যক্তির কারণে—যাকে ম্যানসন নিজের সংগীত জীবনের স্বপ্নপূরণের চাবিকাঠি মনে করতেন এবং প্রভাবিত করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ততদিনে সেই ব্যক্তি বাড়িটি ছেড়ে চলে গেছেন, আর সেখানে বসবাস শুরু করেছেন শ্যারন টেট।

১৯৪৩ সালের ২৪ জানুয়ারি ডালাসে জন্ম নেওয়া শ্যারন টেটের বাবা ছিলেন সেনা কর্মকর্তা। বাবার চাকরির সুবাদে বহু শহর ঘুরে অবশেষে ইতালিতে বসবাসকালে মাত্র কিশোরী বয়সেই বিজ্ঞাপনী কাজ ও চলচ্চিত্রে ছোটখাটো চরিত্রে সুযোগ পান তিনি। এরপর ‘মিস্টার এড’, ‘দ্য বেভারলি হিলবিলি’র মতো টেলিভিশন শো পেরিয়ে ১৯৬৭ সালের ‘ভ্যালি অব দ্য ডলস’ সিনেমার মাধ্যমে বিপুল পরিচিতি লাভ করেন এবং গোল্ডেন গ্লোবের বর্ষসেরা নবীন তারকা বিভাগে মনোনয়ন পান।

চলচ্চিত্র নির্মাতা রোমান পোলানস্কির সঙ্গে কাজের সূত্রে পরিচয় ও পরে ১৯৬৮ সালের জানুয়ারিতে তাদের বিয়ে হয়। একই বছরের শেষভাগে অন্তঃসত্ত্বা হন শ্যারন। দম্পতিটি লস অ্যাঞ্জেলেসের বেনেডিক্ট ক্যানিয়নের ১০০৫০ সিয়েলো ড্রাইভের বাড়িটি ভাড়া নেন। অথচ এই বাড়িটিতে আগে থাকতেন সংগীত প্রযোজক টেরি মেলচার। পেশাদার সংগীতশিল্পী হিসেবে ক্যারিয়ার গড়ে তুলতে মরিয়া চার্লস ম্যানসন একাধিকবার টেরি মেলচারের শরণাপন্ন হলেও প্রত্যাখ্যাত হন। সেই থেকে ম্যানসনের মনে জন্ম নেয় চরম ক্ষোভ ও আক্রোশ। ১৯৬৯ সালের মধ্যে ম্যানসন তার ভক্তদের নিয়ে একটি নিজস্ব বলয় তৈরি করেন এবং ‘হেল্টার স্কেল্টার’ নামের এক বর্ণবাদের কাল্পনিক যুদ্ধের তত্ত্ব প্রচার করতে শুরু করেন। মেলচার বাড়ি ছেড়ে চলে গেলেও সেই ঠিকানার কথা ভুলেননি ম্যানসন।

১৯৬৯ সালের ৮ আগস্ট রাতে পোলানস্কি যখন ইউরোপে, তখন টেট তার তিন বন্ধু প্রখ্যাত হেয়ার স্টাইলিস্ট জে সেব্রিং, লেখক ওজসিক ফ্রাইকোভস্কি এবং কফি ব্র্যান্ডের উত্তরাধিকারী অ্যাবিগেইল ফলগারকে নিয়ে রাত সাড়ে ১০টায় বাড়ি ফেরেন। রাত ১২টার কিছুক্ষণ পর চার্লস টেক্স ওয়াটসন, সুসান অ্যাটকিন্স, প্যাট্রিসিয়া ক্রেনউইনকেল এবং লিন্ডা কাসাবিয়ান সেখানে উপস্থিত হন। টেলিফোনের তার কেটে বাইরের দুনিয়ার সঙ্গে বাড়িটির যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন ওয়াটসন।

প্রথম শিকার হন ১৮ বছর বয়সী তরুণ স্টিভেন প্যারেন্ট, যিনি কেয়ারটেকার উইলিয়াম গ্যারেটসনের সঙ্গে দেখা করে গাড়ি নিয়ে বের হচ্ছিলেন। তাকে গাড়ির ভেতরেই গুলি করে হত্যা করা হয়। এরপর ঘাতকরা মূল বাড়িতে প্রবেশ করে নৃশংস তাণ্ডব চালায়। সেব্রিংকে গুলি করে ও কুপিয়ে হত্যা করা হয়, আর ফ্রাইকোভস্কি ও ফলগার পালানোর চেষ্টা করলেও তাদের তাড়া করে হত্যা করা হয়। শ্যারন টেট তার গর্ভস্থ সন্তানের প্রাণভিক্ষা চাইলেও বারবার ছুরিকাঘাত করে তাকে হত্যা করা হয়। যাওয়ার আগে ঘাতকরা টেটের রক্ত ব্যবহার করে বাড়ির সামনের দরজায় লিখে দিয়ে যায় ‘পিআইজি’ (শুয়োর)।

পরদিন সকালে পরিচ্ছন্নতাকর্মী উইনিফ্রেড চ্যাপম্যান কাজে এসে প্রথম স্টিভেন প্যারেন্টের লাশ দেখতে পান এবং ভেতরে গিয়ে বিভীষিকাময় দৃশ্য দেখে চিৎকার করতে করতে পালিয়ে যান। লস অ্যাঞ্জেলেস পুলিশ কোনও সুনির্দিষ্ট মোটিভ খুঁজে না পাওয়ায় গোটা হলিউড এক অজানা আতঙ্কে শিউরে ওঠে। এর দুদিন পরই ১০ আগস্ট রাতে খুচরা ব্যবসায়ী লেনো লাবিয়াঙ্কা ও তার স্ত্রী রোজমেরিকে তাদের নিজ বাড়িতে ঢুকে একইভাবে হত্যা করে ম্যানসনের অনুসারীরা।

পরে পৃথক একটি মামলায় পুলিশি হেফাজতে থাকা অবস্থায় সুসান অ্যাটকিন্স টেট হত্যাকাণ্ডের কথা প্রকাশ করলে আসল অপরাধীদের নাগাল পায় পুলিশ। তদন্তে বেরিয়ে আসে চার্লস ম্যানসনের নাম। তিনি নিজে সরাসরি শ্যারন টেটকে হত্যা না করলেও পুরো হত্যাকাণ্ডের রূপকার ছিলেন। ১৯৭১ সালে আদালত ম্যানসনসহ তার সহযোগীদের মৃত্যুদণ্ড দেয়, যা পরবর্তীতে ক্যালিফোর্নিয়া রাজ্যে মৃত্যুদণ্ড বাতিল হওয়ায় আমৃত্যু কারাদণ্ডে রূপান্তরিত হয়। ২০১৭ সালে কারাগারে শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন চার্লস ম্যানসন।

মূলত টেরি মেলচারের প্রতি ম্যানসনের একতরফা ক্ষোভ এবং প্রত্যাখ্যাত স্বপ্নের নির্মম শিকার হতে হয়েছিল শ্যারন টেটকে, যিনি ম্যানসনকে চিনতেনও না। হলিউড স্টার হতে না পেরে চার্লস ম্যানসন নিজের নামকে এক বীভৎস ইতিহাসের পাতায় স্থায়ী করার পথ বেছে নিয়েছিলেন।

সূত্র: এনডিটিভি