যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে বিশাল জয়ের মাধ্যমে রিপাবলিকানদের হারিয়ে প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে ডেমোক্র্যাটিক পার্টি। আগামী জানুয়ারির শুরুতে দায়িত্ব নিতে যাওয়া এই কংগ্রেস ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের প্রথম দুই বছরের চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন হতে যাচ্ছে। যদিও ডেমোক্র্যাটদের নীতি পাসের ও তদারকির ক্ষমতা বেড়েছে, তবে কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়াই প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হাতে এখনও প্রচুর নির্বাহী ক্ষমতা রয়ে গেছে।
যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের ইরান যুদ্ধ
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নিজেই স্বীকার করেছেন যে মধ্যবর্তী নির্বাচনে তার দলের হারের পেছনে ইরান যুদ্ধের ভূমিকা ছিল। ফক্স নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, আমি মনে করি এর একটি অংশ ছিল ইরান, তবে একই সময়ে মানুষ ইরানের বিষয়ে আমার পদক্ষেপের গুরুত্বও বুঝতে পেরেছে।
মুদ্রাস্ফীতি, জ্বালানি ও নিত্যপণ্যের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় ক্ষুব্ধ ভোটারদের সমর্থন পেতে ডেমোক্র্যাটরা জীবনযাত্রার ব্যয়কেই প্রচারণার মূল হাতিয়ার বানায়।
গত ফেব্রুয়ারিতে কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়াই ট্রাম্প এই যুদ্ধ শুরু করেন। ১১ ডিসেম্বর বর্তমান সরকারি বাজেট বিলের মেয়াদ শেষ হলে নতুন কংগ্রেসে ডেমোক্র্যাটরা ট্রাম্পের সামরিক তহবিলের আবেদন প্রত্যাখ্যান করে চাপ সৃষ্টি করতে পারে। তবে ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের গবেষক জেমস বয়েস জানান, যুদ্ধক্ষেত্রে সেনা উপস্থিত থাকা অবস্থায় অর্থ বন্ধ করাটা কঠিন, কারণ এটি মার্কিন সেনাদের জীবন ঝুঁকিতে ফেলার সামিল হবে।
অন্যদিকে, ১৯৭৩ সালের ওয়ার পাওয়ার্স রেজুলেশনের মাধ্যমে ট্রাম্পকে থামানো অসম্ভব হতে পারে। এই আইনে সামরিক অভিযান চালাতে হলে ৬০ দিনের মধ্যে কংগ্রেসের অনুমোদন বা যুদ্ধ ঘোষণার নিয়ম রয়েছে। তা না হলে প্রেসিডেন্টের ভেটো বাতিল করতে উভয় কক্ষে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রয়োজন, যা বর্তমান ডেমোক্র্যাটদের নেই। ইউসিডি ক্লিনটন ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক স্কট লুকাস বলেন, দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা না থাকলেও ডেমোক্র্যাটরা ট্রাম্পের ওপর ক্ষুব্ধ কিছু রিপাবলিকান আইনপ্রণেতাদের সঙ্গে কাজ করে আইন প্রস্তাব করতে পারে। যেমন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স শুরু থেকেই এই যুদ্ধের বিরুদ্ধে ছিলেন এবং সম্প্রতি ইরানকে বার্তা পাঠিয়েছেন।
তবে জেমস বয়েসের মতে, এটি ট্রাম্পের শেষ মেয়াদ হওয়ায় নির্বাচনি বাধ্যবাধকতা না থাকায় তিনি উল্টো আরও বিশ্বমঞ্চে বেপরোয়া হয়ে উঠতে পারেন এবং নিজের রাজনৈতিক অবস্থান শক্ত করতে মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত বাড়াতে পারেন।
শুল্ক ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য
বিশ্ববাজারকে তোলপাড় করে প্রায় ৯০টি দেশের ওপর ট্রাম্পের আরোপিত ১০ থেকে ৫০ শতাংশ শুল্ক গত ফেব্রুয়ারিতে সুপ্রিম কোর্ট বাতিল করেন। কিন্তু এর পরপরই ট্রাম্প অন্য আইনের অধীনে নতুন নির্বাহী আদেশ জারি করে শুল্ক ১৫ শতাংশে উন্নীত করেন, যা ১৫০ দিনের জন্য কার্যকর থাকে এবং বাড়ানোর জন্য কংগ্রেসের অনুমোদনের দরকার হয়।
ডেমোক্র্যাটরা ট্রাম্পের এই শুল্কনীতিকে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির জন্য দায়ী করে অভিযোগ তুলেছেন যে তিনি ‘আমেরিকান জনগণের পকেট কাটছেন’। ডেমোক্র্যাট নিয়ন্ত্রিত কংগ্রেস রফতানিকারকদের কিছুটা সাময়িক স্বস্তি দিতে ছাড় দেওয়ার চাপ সৃষ্টি করতে পারে। কিন্তু পুরোপুরি পরিবর্তন ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে সম্ভব নয়। জেমস বয়েস জানান, শুল্ক মামলাগুলো সুপ্রিম কোর্টে বিচারাধীন রয়েছে এবং আগে আদায় করা শুল্কের অর্থ ফেরত দেওয়া হবে কি না তা নিয়ে বিতর্ক চলছে।
তবে চীনকে প্রযুক্তির নাগাল থেকে দূরে রাখতে ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকানরা একমত। রিমোট অ্যাক্সেস সিকিউরিটি অ্যাক্ট ও চিপ সিকিউরিটি অ্যাক্ট-এর মাধ্যমে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) চিপ ও প্রযুক্তির রফতানি নিয়ন্ত্রণে কড়াকড়ি বজায় রাখবে নতুন কংগ্রেস।
অভিবাসন ও তদন্তের ক্ষমতা
কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ পাওয়ায় সব সংসদীয় কমিটির প্রধান হবেন ডেমোক্র্যাটরা, যার ফলে সাক্ষী তলব ও তদন্তের ক্ষমতা তাদের হাতে আসছে। এর মাধ্যমে ট্রাম্পের পারিবারিক ব্যবসা, জেফরি অ্যাপস্টাইনের সঙ্গে সম্পর্ক এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের যুদ্ধ পরিচালনা নিয়ে তদন্ত হতে পারে। এমনকি ইরান যুদ্ধ কেন্দ্র করে ট্রাম্পকে তৃতীয়বারের মতো অভিশংসনের চেষ্টাও হতে পারে।
এ ছাড়া ট্রাম্পের বিতর্কিত গণ-বিতাড়ন ও অভিবাসন নীতি নিয়ে ব্যাপক তদন্ত চালানোর পরিকল্পনা রয়েছে। মার্কিন কর বিভাগ (আইআরএস) ও হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগের যৌথ অভিযান নিয়ে তারা তলব পাঠাতে পারে। নির্বাচনের আগে ফক্স নিউজের এক জরিপে দেখা গেছে, ৫৩ শতাংশ নিবন্ধিত ভোটার মনে করেন অভিবাসনবিরোধী এই কড়াকড়ি ‘অতিরিক্ত বাড়াবাড়ি’ হয়ে গেছে। স্কট লুকাস মনে করেন, এই ফলের পর ডেমোক্র্যাট ও দায়িত্বশীল রিপাবলিকানরা স্থানীয় কমিউনিটিগুলোকে দায়িত্বশীল নীতি গ্রহণে উৎসাহিত করতে পারবেন।
সূত্র: আল জাজিরা