পাকিস্তানের হাসপাতালে হামলার লক্ষ্য ছিলেন আইনজীবীরা

Quetta-blast-AFP-3এক আইনজীবী হত্যার প্রতিবাদে ২দিন আদালত বর্জনের ঘোষণা দেওয়ার কিছুদিনের মধ্যে হত্যাকাণ্ডের স্বীকার হন বেলুচিস্তানের বার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি বিলাল আনওয়ার কাসি। সহকর্মী ও সংগঠনের নেতার মৃত্যুর খবর পেয়ে শতাধিক আইনজীবী জড়ো হয়েছিলেন কোয়েটার এক হাসপাতালের জরুরি বিভাগে। শোকাহত আইনজীবীরা কাসির লাশের পাশে জরুরি বিভাগে জড়ো হওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যে হাসপাতালের ভেতরেই ঘটল ভয়াবহ বোমার বিস্ফোরণ। নিমিষেই শোকে বিহবল আইনজীবীরা যন্ত্রণায় কাতরে ওঠেন। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত আত্মঘাতী এ হামলায় অন্তত ৬৩ জন নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে বেশির ভাগই আইনজীবী।

ইসলামাবাদ থেকে কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরার প্রতিনিধি জানিয়েছেন, নিরাপত্তা এলাকার প্রধান গেটে এই হামলা হয়েছে। তিনি আভাস দিয়েছেন, আইনজীবীদের লক্ষ্য করেই এই হামলা চালানো হয়েছে। ‘গুরুত্বপূর্ণ হলো কোয়েটা বারের সভাপতির মৃত্যর পর এই ঘটনা ঘটলো। গুরুত্বপূর্ণ যে হামলার স্বীকার যারা, তাদের প্রায় সবাই আইনি পেশা-সংশ্লিষ্ট’ বলেছেন তিনি।

ed8a72917bee4b29a5833784b672cb10_18

আইনজীবীদের ওপর হামলার ঘটনায় সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশন এক সপ্তাহ শোক পালনের ঘোষণা দিয়েছে। প্রতিবাদে বিক্ষোভ পালন করেছেন লাহোর হাইকোর্টের আইনজীবীরা। এক সংবাদ সম্মেলনে লাহোর সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি হামলার নিন্দা জানিয়েছেন। তিনি বলেন, এটা শুধু আইনজীবীদের ওপর হামলা নয়। এটা সব নাগরিকের ওপর হামলা। আমরা সব সময় গণতান্ত্রিক শক্তির পক্ষে দাঁড়িয়েছি। তাই আমরা হামলার শিকার হচ্ছি।

পাকিস্তানের আইনজীবীদের অন্যতম নেতা আলি জাফর এ হামলাকে ‘বিচার ব্যবস্থায় হামলা’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি ঘোষণা দিয়েছেন, আইনজীবীরা আগামী তিনদিন আদালত বর্জন করবেন।

শুধু সোমবারের হামলাই নয়, সম্প্রতি পাকিস্তানে বিশেষ করে বালুচিস্তানে বেশ কয়েকজন আইনজীবী হামলার শিকার হয়েছেন।

৩ আগস্ট অজ্ঞাতদের গুলিতে নিহত জাহানজেব আলভি নামের এক আইনজীবী। এ হত্যার তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন সোমবার নিহত বিলাল কাসি। এ হত্যার প্রতিবাদে দুইদিন কোর্টের কার্যক্রম বয়কটের ঘোষণা দিয়েছিলেন তিনি।

জুনে স্পিনি রোডে বালুচিস্তান আইন কলেজের প্রিন্সিপাল ব্যারিস্টার আমানুল্লাহ আচাকজিকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এর আগে পাকিস্তানি খ্রিস্টান নাগরিকের পক্ষে মামলা পরিচালনার জন্য এক আইনজীবীকে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়।

সোমবার সকালে আদালতে যাওয়ার পথে অজ্ঞাত দুই বন্দুকধারী গুলি করে বিলাল কাসিকে। আহত অবস্থায় তাকে বেলুচিস্তানের কোয়েটার সিভিল হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া যায়। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। এ খবর শুনে হাসপাতালে উপস্থিত হন শতাধিক আইনজীবী। এমন সময়েই ঘটে বিস্ফোরণ।এরপরই একাধিক গুলিরও শব্দ শোনা যায়। পুলিশ ও বোমা বিশেষজ্ঞ দল জানিয়েছে হামলাটি ছিল আত্মঘাতী। প্রায় ৮ কেজি বিস্ফোরক ব্যবহার করা হয়েছে।

এক প্রত্যক্ষদর্শী জানিয়েছেন, হামলায় আহত ও নিহতদের বেশিরভাগই আইনজীবী। কয়েকজন সাংবাদিক ও হাসপাতালের কর্মীও রয়েছেন। বিবিসির খবরে বলা হয়েছে, নিহতদের মধ্যে অন্তত ১৮জন আইনজীবী রয়েছেন।

জ্যেষ্ঠ পুলিশ কর্মকর্তা জাহুর আহমেদ আফ্রিদি জানান, নিহতদের বেশির ভাগিই আইনজীবী। আহত আইনজীবীদের মধ্যে বেলুচিস্তান বার অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি বাজ মোহাম্মদ কাকারও রয়েছেন। ঘটনাস্থলে উপস্থিত সাংবাদিকরাও আহত হয়েছেন। ডন নিউজের ক্যামেরাম্যান মাহমুদ খান গুরুতর আহত হওয়ার পর হাসপাতালে মৃত্যু হয়। আজ টিভির ক্যামেরাম্যান শাহজাদ খানও বিস্ফোরণে নিহত হয়েছেন।

বিস্ফোরণে আহতদের দেখতে গিয়েছিলেন দক্ষিণাঞ্চলের সামরিক কমান্ডার লেফটেন্যান্ট জেনারেল আমির রিয়াজ। এ সময় আহত এক আইনজীবী হাসপাতালে তাকে জানান যে, আইনজীবীদের হাসপাতালের মোটরসাইকেল ও গাড়ি নিতে দেওয়া হয়নি। ওই আইনজীবী সেনা কর্মকর্তাকে বলেন, আমরা সবাই সভ্য মানুষ। কিন্তু আহত বিলাল কাসিকে হাসপাতালে নিয়ে আসার সময় আমাদের গাড়ি ও মোটর সাইকেল হাসপাতালে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি। যদি হামলাকারী হাসপাতালের ভেতরে আসতে পারে তাহলে আমরা কেন পারব না?

বেলুচিস্তান সরকারের মুখপাত্র আনওয়ার উল হক কাকার বলেছেন, অবস্থাদৃষ্টে মনে এটা পরিকল্পিত আক্রমণ। সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে,  ইতোমধ্যে আহত দুই ব্যক্তিকে করাচিতে পাঠানো হয়েছে চিকিৎসার জন্য। সামরিক বিমানে করে আরও ২০ জনকে অন্যান্য শহরগুলোতে পাঠানো হবে।

কোয়েটা সিভিল হাসপাতালের পরিচালক আব্দুল রেহমান বার্তা সংস্থা এপিকে জানিয়েছেন, এ পর্যন্ত ৬৩ জন নিহত হওয়ার খবর নিশ্চিত হওয়া গেছে। আরও আহত ৯২ জনের চিকিৎসা চলছে। তিনিও জানিয়েছেন, হতাহতদের বেশিরভাগই আইনজীবী।

সূত্র: ডন, জিও নিউজ, এক্সপ্রেস ট্রিবিউন, আল-জাজিরা, এপি, বিবিসি।

এ সম্পর্কিত আরও খবর-

/এএ/বিএ/