পাকিস্তানের বাচা খান ইউনিভার্সিটিতে হামলার সময় সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরেছিলেন খোদ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরাও। ছাত্রদের জীবন বাঁচাতে বাধ্য হয়েই তাদের এটা করতে হয়েছে।
হামলার সময় পুলিশের সাহায্য চান বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচালক মোহাম্মদ শাকিল। তিনি পুলিশকে ঘটনাস্থলে এসে তাকে একটি বন্দুক দেওয়ার অনুরোধ করেন; যাতে তিনি সন্ত্রাসীদের পাল্টা জবাব দিতে পারেন।
মোহাম্মদ শাকিল জানান, নিরস্ত্র অবস্থায় থাকায় তারা পালিয়ে ছিলেন।
তিনি বলেন, আমি শিক্ষার্থীদের নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিলাম। বারবার অনুরোধের পর পুলিশ আমাকে লক্ষ্য করে একটি বন্দুক ছুড়ে মারে। আমি সন্ত্রাসীদের লক্ষ্য করে কয়েকটি গুলিবর্ষণ করি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচালক মোহাম্মদ শাকিল ছাড়াও প্রতিষ্ঠানটির আরও এক কর্মী সন্ত্রাসীদের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধ চালিয়ে আলোচনায় আসেন। সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে শিক্ষকদের বন্দুক ধরার প্রশংসা করেছেন অনেকে। তবে কেউ কেউ অবশ্য এর সমালোচনা করছেন। তারা বলছেন, অন্যদের মতো শিক্ষকরাও যদি বন্দুক ধরেন তাহলে সেটা পেশাগত আদর্শের পরিপন্থী হিসেবে বিবেচিত হবে।
এদিকে বাচা খান বিশ্ববিদ্যালয়ে হামলার ঘটনায় পাকিস্তানে ধরপাকড় শুরু হয়েছে। ওই হামলায় সম্পৃক্ত সন্দেহে এরইমধ্যে বেশ কয়েকজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় এলাকাজুড়ে চিরুনি অভিযান চালানো হচ্ছে।
এই রক্তক্ষয়ী হামলা আফগানিস্তান থেকে নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন পাকিস্তানের সেনা মুখপাত্র লে. জেনারেল অসীম বাজওয়া। তিনি বলেছেন, হামলার সময় সন্ত্রাসীরা টেলিফোনে তাদের নিয়ন্ত্রণকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ করে যাচ্ছিল। এসব হোতাকে গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে।
খাইবার পাখতুনখোয়ার প্রাদেশিক রাজধানী পেশোয়ারে এক সংবাদ সম্মেলনে এ বিষয়টি নিয়ে কথা বলেন জেনারেল অসীম বাজওয়া। তিনি বলেন, আফগানিস্তানের একদল লোকের সঙ্গে হামলাকারীরা যোগাযোগ রক্ষা করছিল। এসব টেলিফোন কলের মধ্যে দু’টি নম্বর শনাক্ত করে এগুলোর তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। টেলিফোনগুলোতে ব্যবহৃত সিমগুলো একটি আফগানিস্তান প্রতিষ্ঠানের। এমনকি একজন জঙ্গি পুলিশের গুলিতে নিহত হওয়ার পরও তার মোবাইলে কল আসছিল।
এর আগে এই হামলার ঘটনায় একটি এফআইআর করা হয়। পাকিস্তানের কাউন্টার টেররিজম দফতরের পক্ষ থেকে এই এফআইআর নথিভুক্ত করা হয়।
কাউন্টার টেররিজম দফতর (সিটিডি) সূত্র জানিয়েছে, প্রাথমিক অনুসন্ধানে ঘটনাস্থল থেকে চারটি গ্রেনেড, ১৬টি ম্যাগাজিন ও ২৪০টি কার্তুজ উদ্ধার করা হয়েছে।
পাকিস্তান ইন্সটিটিউট ফর পিস স্টাডিজ-এর পরিচালক মুহাম্মাদ আমির রানা জানান, গোয়েন্দাদের কাছে জঙ্গিদের সম্ভাব্য হামলা পরিকল্পনার তথ্য ছিল। এর ভিত্তিতে গত সপ্তাহান্তে অনেকগুলো স্কুল বন্ধ করে দেওয়া হয়।
খাইবার পাখতুনখাওয়া প্রদেশের সরকারি মুখপাত্র জানান, নিরাপত্তাজনিত কারণেই তারা স্কুলগুলো বন্ধ রেখেছেন।
বাচা খান বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর ফজলুর রাহিম বলেন, এককভাবে নিরাপত্তা বাহিনী শিক্ষার্থীদের নিরাপদে রাখতে পারবে না।
লোকজনকে ইসলামের চরম ব্যাখ্যা থেকে দূরে রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
এর আগে পেশাওয়ারে হামলার পর পাকিস্তানে একটি যৌথ গোয়েন্দা দফতর প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল সরকার। তবে এখনও পর্যন্ত সেই প্রতিশ্রুতি আলোর মুখ দেখেনি। পরিস্থিতি মোকাবেলায় সরকারের সক্ষমতার প্রশ্নও উঠছে।
২০ জানুয়ারি ২০১৬ বুধবার সকালে পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখোয়ার চারসাদ্দায় অবস্থিত বাচা খান বিশ্ববিদ্যালয়ে হামলা চালায় বন্দুকধারীরা। পরে নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানে নিহত হন ৪ বন্দুকধারী। পেশাওয়ার হামলার মূল হোতা ওমর মনসুর এক ফেসবুক পোস্টের মাধ্যমে দাবি করেছেন, তেহরিক ই তালেবান, পাকিস্তানের তরফে এই হামলা চালানো হয়েছে। তবে তালেবানের এক মুখপাত্র তা অস্বীকার করে ঘটনার নিন্দা জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, যারা এর সঙ্গে তালেবানকে জড়াচ্ছে, তাদের বিচারের আওতায় নেওয়া হবে।
এরইমধ্যে প্রশ্ন উঠেছে নিরাপত্তা বাহিনী জঙ্গিদের হামলা থেকে শিক্ষার্থীদের রক্ষা করতে যথেষ্ট ব্যবস্থা নেয়নি। এ প্রসঙ্গে জেনারেল অসীম বাজওয়া বলেন, হামলা শুরুর সময় বাচা খান বিশ্ববিদ্যালয়ে ৫২ জন নিরাপত্তাকর্মী উপস্থিত ছিলেন। তাদের প্রতিরোধের কারণে বহু মানুষের জীবন রক্ষা করা সম্ভব হয়েছে। এছাড়া,হামলা শুরুর ৪৫ মিনিটের মধ্যে পেশাওয়ার থেকে সেনাবাহিনী ঘটনাস্থলে পৌঁছে জঙ্গিদেরকে একটি ভবনের মধ্যে অবরুদ্ধ করে ফেলে। সময়মতো এসব ব্যবস্থা নেওয়া না হলে হতাহতের সংখ্যা আরও বেশি হতো। সূত্র: ডন।