শ্রীলঙ্কার আসন্ন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ৩৮ জন প্রার্থীর মধ্যে একজনও নারী নেই। ভারত মহাসাগরের এই দ্বীপ রাষ্ট্রে ভোটার ও শ্রমশক্তির অর্ধেকের বেশি নারী হলেও নির্বাচনে তাদের প্রতিনিধিত্ব কম। এটিকে দেশের রাজনৈতিক ক্ষেত্রের একটি স্পষ্ট বৈষম্য হিসেবে মনে করা হচ্ছে। ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে এমন পরিস্থিতির কথা উঠে এসেছে।
১৯৬০ সালে শ্রীলঙ্কা বিশ্বকে প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী উপহার দিয়েছিল। ওই সময় সিরিমাভো বন্দরনায়েকে নির্বাচিত হন। তার মেয়ে চন্দ্রিকা কুমারাতুঙ্গাও পরবর্তীতে একই পদে অধিষ্ঠিত হন। কিন্তু ৫২ শতাংশ নারী ভোটারের উপস্থিতি সত্ত্বেও, দেশের পার্লামেন্টে নারীদের সংখ্যা কখনোই ৭ শতাংশ ছাড়িয়ে যায়নি। বর্তমানে ২২৫ সদস্যবিশিষ্ট পার্লামেন্টে নারীদের সংখ্যা মাত্র ৫ দশমিক ৩ শতাংশ। মন্ত্রিসভারও একটি ক্ষুদ্র অংশ নারীদের দখলে, যেখানে বর্তমান মন্ত্রিসভায় ১৬ জনের মধ্যে মাত্র একজন নারী আছেন—সেচমন্ত্রী পবিত্রা দেবী ওয়ান্নিয়ারাচ্চি।
১৯৩১ সালে শ্রীলঙ্কায় সাধারণ ভোটাধিকার প্রবর্তনের পর থেকে নারী প্রতিনিধিত্বের সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট। ২০১৬ সালে আইন প্রণয়ন করা হয় যে, সংসদ সদস্যদের মধ্যে ২৫ শতাংশ কোটা নারীদের জন্য নির্ধারিত থাকবে। তবে, কেবল কোটা নির্ধারণ করাই যথেষ্ট নয় বলে মনে করেন নারী সংসদ সদস্য হরিনী অমরসূরিয়া। তার মতে, ‘কোটা পদ্ধতি শুধু একটি সংখ্যা বদল করতে পারে, কিন্তু কার্যকর পরিবর্তনের জন্য এমন উদ্যোগ দরকার, যা নারীদের রাজনীতিতে সক্রিয়ভাবে যুক্ত করবে এবং নেতৃত্বের ভূমিকায় আনবে।’
নারীদের রাজনীতিতে প্রবেশের পথে সবচেয়ে বড় বাধা হলো শ্রীলঙ্কার রাজনৈতিক দলের পিতৃতান্ত্রিক কাঠামো। উইমেন্স পলিটিক্যাল অ্যাকাডেমির নেত্রী নিমালকা ফার্নান্দো বলেন, ‘নারীদের সঙ্গে সমানভাবে ভাগ করার মতো ক্ষেত্র হিসেবে রাজনীতিকে পুরুষরা দেখে না।’
তার প্রতিষ্ঠান গত ১২ বছরে প্রায় ৩ হাজার নারীকে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণের জন্য প্রশিক্ষণ দিয়েছে। তিনি বলেন, আমরা বাড়ি সমানভাবে ভাগ করি, কিন্তু রাজনীতি বাড়ির বাইরে থেকে যায়।
বিরোধী দলের নেতা সাজিথ প্রেমাদাসার প্রচারণায় অংশ নেওয়া ৬১ বছর বয়সী সমুদ্র জয়লথ বলেন, রাজনীতিতে নারীদের এগিয়ে আসা খুব কঠিন, বিশেষ করে রাজনৈতিক পরিবার থেকে না এলে।
জয়লথ ২০১২ সালে একটি পৌরসভা নির্বাচনে জয়ী হয়েছিলেন, তবে তার রাজনৈতিক ক্যারিয়ার তেমনভাবে এগোয়নি। তিনি বলেন, দলগুলো শুধু নারীদের চেয়ার পূরণের জন্য ব্যবহার করতে চায়।
এই নির্বাচনে প্রধান তিন প্রার্থী হলেন বর্তমান প্রেসিডেন্ট রনিল বিক্রমাসিংহে, সাজিথ প্রেমাদাসা ও মার্কসবাদী-প্রবণ সংসদ সদস্য অনুরা কুমার ডিসানায়েক। বিক্রমাসিংহে নারীদের প্রতিনিধিত্ব বাড়াতে বিশেষ প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন, প্রেমাদাসা মাতৃত্বকালীন আইন ও শিশুদের জন্য ডে-কেয়ার নীতি উন্নত করতে চান। অন্যদিকে, ডিসানায়েক প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন নারীদের ব্যবস্থাপনায় উন্নীত ও শ্রম আইন আধুনিকায়ন করতে।
কিন্তু নারীদের স্থানীয় সরকারের স্তরে প্রতিনিধিত্ব কখনোই ২৩ শতাংশ ছাড়ায়নি এবং প্রাদেশিক স্তরে ৫ শতাংশ থেকে বেশি করার জন্য প্রস্তাবিত কোটা গত দুই বছর ধরে সংসদে স্থগিত রয়েছে। সমুদ্র জয়লথের মতে, পরিবর্তনের জন্য আমরা জোর না দিলে এই ব্যবস্থা বহাল থাকবে। পরিবর্তন আসবে না।
এটি জয়লথের শেষ নির্বাচন হবে, তিনি একজন পুরুষ সহকর্মীর কাছে তার দায়িত্ব হস্তান্তর করবেন। তার কথায়, রাজনীতির জন্য আপনার মধ্যে জন্মগত প্রতিভা থাকতে হবে। এখন সময় এসেছে আমাদের এই ব্যবস্থার পরিবর্তন আনার জন্য শক্তিশালী পদক্ষেপ নেওয়ার।