ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তায় বাধা

মিয়ানমারে ত্রাণ বহরে সেনাদের সতর্কতামূলক গুলি

মিয়ানমারের সেনাবাহিনী একটি চীনা রেড ক্রসের ত্রাণ বহরে সতর্কতামূলক গুলি চালিয়েছে। এই ঘটনায় ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তা পৌঁছানোর ক্ষেত্রে চলমান গৃহযুদ্ধের মধ্যে নতুন চ্যালেঞ্জের ইঙ্গিত মিলেছে। এদিকে, আন্তর্জাতিক সহায়তা সংস্থাগুলো ভুক্তভোগীদের কাছে সহজে পৌঁছানোর সুযোগ দাবি করছে। ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্স এ খবর জানিয়েছে। 

২০২১ সালে নোবেলজয়ী অং সান সু চির নেতৃত্বাধীন নির্বাচিত সরকারের বিরুদ্ধে সেনা অভ্যুত্থানের পর থেকে মিয়ানমারের অর্থনীতি ও স্বাস্থ্যসেবা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। গৃহযুদ্ধের মধ্যে চলমান সংঘাতে সহায়তা কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ভয়াবহ ভূমিকম্প সেই পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটিয়েছে।

সেনা সরকারের মুখপাত্র জাও মিন টুন বলেছেন, চীনা রেড ক্রস কর্তৃপক্ষকে আগে থেকে জানায়নি যে তারা সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে প্রবেশ করবে। মঙ্গলবার রাতে স্থানীয় যানবাহনসহ কনভয়টি থামতে অস্বীকৃতি জানালে নিরাপত্তা বাহিনী সতর্কতামূলক গুলি ছোড়ে। 

চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র গুও জিয়াকুন বলেছেন, সহায়তা দল ও সরঞ্জাম নিরাপদে আছে। তিনি মিয়ানমারের সব পক্ষকে উদ্ধারকর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ত্রাণ কার্যক্রমের জন্য পরিবহন পথ খোলা ও নিরবচ্ছিন্ন রাখা জরুরি। 

শুক্রবার ৭.৭ মাত্রার ভূমিকম্পে এখন পর্যন্ত ২ হাজার  ৮৮৬ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং ৪ হাজার ৬৩৯ জন আহত হয়েছেন বলে মিয়ানমারের রাষ্ট্রীয় মিডিয়া জানিয়েছে। ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ (আইসিজি) বলেছে, সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত সাগাইং অঞ্চলের গ্রামীণ এলাকাগুলো সেনাবাহিনীবিরোধী সশস্ত্র গোষ্ঠীদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। 

সংস্থাটি এক বিবৃতিতে বলেছে, সামরিক সরকারের নিষেধাজ্ঞা, স্থানীয় প্রশাসনের জটিল কাঠামো ও সশস্ত্র গোষ্ঠীদের নিয়ন্ত্রণ এবং চলমান সংঘাতের কারণে সহায়তা সংস্থাগুলোর পক্ষে এসব এলাকায় পৌঁছানো সবচেয়ে কঠিন হবে। 

ভূমিকম্পের আগেও এসব অঞ্চল থেকে তথ্য সংগ্রহ কঠিন ছিল, কারণ সংঘাতের অংশ হিসেবে সেনা সরকার ইন্টারনেট ও মোবাইল নেটওয়ার্ক বন্ধ রেখেছিল। সাগাইং সফরকারী এক ব্যক্তি রয়টার্সকে বলেন, শহরের সর্বত্র সেনারা রয়েছে। তারা উদ্ধার কাজের জন্য নয়, নিরাপত্তার জন্য আছে। তারা প্রতিটি গাড়ি তল্লাশি করছে।

নিউ ইয়র্কভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ) সেনাবাহিনীর কাছে মানবিক সহায়তা অবাধে পৌঁছানোর অনুমতি চেয়েছে এবং ত্রাণ সংস্থাগুলোর কাজে বাধা সৃষ্টিকারী নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। সংস্থাটি বলেছে, দাতারা শুধু সেনা কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে নয়, বরং স্বাধীন গোষ্ঠীর মাধ্যমে সহায়তা পাঠাবে। 

সংস্থাটির এশিয়া বিভাগের উপ-পরিচালক ব্রায়োনি লাউ বলেন, এত বড় দুর্যোগ মোকাবিলায় মিয়ানমারের সেনাবাহিনীকে বিশ্বাস করা যায় না। সংশ্লিষ্ট সরকার ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর উচিত সেনাবাহিনীকে চাপ দেওয়া, যেন তারা যেখানেই থাকুক না কেন, সব ভুক্তভোগীর কাছে অবিলম্বে পূর্ণাঙ্গ সহায়তা পৌঁছানো নিশ্চিত করে।

অভ্যুত্থান-পরবর্তী বহুমুখী বিদ্রোহ দমনে সেনাবাহিনী ব্যাপক নৃশংসতা চালিয়েছে—এমন অভিযোগকে তারা ভুল তথ্য বলে উড়িয়ে দিয়েছে। বিদ্রোহীরা অভিযোগ করেছে, ভূমিকম্পের পরেও সেনাবাহিনী বিমান হামলা চালিয়েছে। মঙ্গলবার একটি বড় বিদ্রোহী জোট ত্রাণ কার্যক্রমে সহায়তার জন্য একতরফা যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করেছে। 

জাতিসংঘ বলেছে, ভূমিকম্পপ্রবণ ছয় অঞ্চলে ২৮ লাখের বেশি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। খাদ্য, আশ্রয়, পানি, স্যানিটেশন, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা ও অন্যান্য সহায়তার জন্য তাদের কাছে ১ কোটি ২০ লাখ ডলারের জরুরি তহবিল আছে। 

জাতিসংঘের প্রকল্প সেবা কার্যালয় (ইউএনওপিএস) বলেছে, পরিস্থিতি এখনও গুরুতর। যোগাযোগ ও সড়কপথ বন্ধ থাকায় ত্রাণ কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, বিশেষ করে সাগাইংয়ে।

অস্ট্রেলিয়া মিয়ানমারে অতিরিক্ত ৬৫ লাখ অস্ট্রেলীয় ডলার (৪১ লাখ মার্কিন ডলার) মানবিক সহায়তা দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী পেনি ওয়ং বুধবার এক বিবৃতিতে বলেন, আমরা সক্রিয়ভাবে নিশ্চিত করছি যে আমাদের সহায়তা মিয়ানমারের সেনা সরকারকে বৈধতা দেবে না। 

ভূমিকম্পের কেন্দ্রস্থলের কাছাকাছি মান্দালয়ের এক নারী রয়টার্সকে বলেন, বহু মানুষ গৃহহীন হয়ে পড়লেও কর্তৃপক্ষ এ মাসের থিংগান জল উৎসবের জন্য মঞ্চ বানাচ্ছে। ধসে যাওয়া ভবনের নিচে এখনও লাশ পড়ে আছে। 

মিলিটারি কাউন্সিল আন্তর্জাতিক সাংবাদিকদের ভূমিকম্পের ধ্বংসস্তূপ কভার করতে অনুমতি দেওয়ার অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করেছে পানি, বিদ্যুৎ ও হোটেলের অভাব দেখিয়ে। 

থাইল্যান্ডে মৃত্যু বেড়ে ২২

পাশের দেশ থাইল্যান্ডে ভূমিকম্পে নিহতের সংখ্যা বুধবার ২২ জনে দাঁড়িয়েছে। শতাধিক ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। রাজধানী ব্যাংককে নির্মাণাধীন একটি আকাশচুম্বী ভবনের ধ্বংসস্তূপে আটকে পড়াদের খোঁজার কাজ পঞ্চম দিনে পড়েছে। এখানে ১৫ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং ৭২ জন নিখোঁজ রয়েছেন। 

কর্তৃপক্ষ বলেছে, নিখোঁজদের পরিবারের সদস্যদের মানসিক সহায়তা দিতে দুইটি কুকুরকে নতুন দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। একটি অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রে আলোকিত জ্যাকেট পরা গোল্ডেন রিট্রিভার কুকুর দুটিকে শিশুরা আদর করছে, কেউ কেউ তাদের সঙ্গে কোমল স্বরে কথা বলছে। 

নিখোঁজ মা ও ছোট বোনের সন্ধানরত চানপেন কেওনোই বলেন, এটি সামান্য স্বস্তি এনেছে। তিনি বলেন, তারা বলেছে, কুকুরটি সংকেত শুনে যতক্ষণ ঘেউ ঘেউ করবে, ততক্ষণ আশা আছে যে কেউ বেঁচে থাকতে পারে। 

ভবন ধসের কারণ তদন্ত করছে সরকার। প্রাথমিক পরীক্ষায় দেখা গেছে, সংগ্রহ করা কিছু ইস্পাত নমুনা মানসম্মত নয়।