ভারতের ছত্তিশগড়ে মদের ব্যবসা ঘিরে এক বিস্ময়কর দুর্নীতির চিত্র সামনে এনেছে দেশটির এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ইডি)। সংস্থাটির তদন্তে উঠে এসেছে, ২০১৯ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে পুরো রাজ্যের মদনীতি আসলে ছিল রাষ্ট্রীয় সুরক্ষায় পরিচালিত চাঁদাবাজি। এই কেলেঙ্কারির কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ভূপেশ বাঘেলের ছেলে চৈতন্য বাঘেল। সম্প্রতি তাকে গ্রেফতার করেছে ইডি। সংস্থাটির অভিযোগ, মদের বেআইনি অর্থ দিয়ে চৈতন্য গড়ে তুলেছেন রিয়েল এস্টেট সাম্রাজ্য, প্রভাব বিস্তার করেছেন রাজনৈতিক মহলেও। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি এ খবর জানিয়েছে।
ইডি জানিয়েছে, ছত্তিশগড়ে মদ ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করছিল একটি সংগঠিত সিন্ডিকেট। এই চক্রে ছিলেন আনোয়ার ধেবার, অবসরপ্রাপ্ত আইএএস কর্মকর্তা অনিল তুতেজা এবং আইটিএস অফিসার অরুণ পাতি ত্রিপাঠী। এদের পেছনে ছিলেন সাবেক মুখ্য সচিব ও অবসরপ্রাপ্ত আইএএস কর্মকর্তা বিবেক ধান্দ। তিনি প্রত্যক্ষ সুবিধাভোগী বলেও অভিযোগ করেছে ইডি।
ইডি জানায়, চৈতন্য বাঘেলের রিয়েল এস্টেট প্রকল্প ‘ভিত্তাল গ্রিন’ ছিল মূলত দুর্নীতির অর্থ সাদা করার কেন্দ্রে। একটি শেল কোম্পানি সাহেলি জুয়েলার্স থেকে তার কোম্পানিতে আসে ৫ কোটি রুপি। ‘ঋণ’ হিসেবে দেখানো হলেও এর কোনও সুদ ছিল না এবং এখনও বকেয়া ৪ কোটি ৫০ লাখ রুপি পরিশোধ হয়নি।
তদন্তে জানা গেছে, প্রকল্পটির প্রকৃত নির্মাণ ব্যয় ছিল ১৩-১৫ কোটি রুপি। অথচ হিসাবপত্রে দেখানো হয়েছে মাত্র ৭.১৪ কোটি। এর মধ্যে ৪.২ কোটি রুপি নগদ দেওয়া হয়েছিল ঠিকাদারদের।
২০২০ সালে একদিনে ১৯টি ফ্ল্যাট কিনে ফেলেন মদ ব্যবসায়ী ত্রিলোক সিং ধিল্লনের কর্মচারীরা। ইডির মতে, এটি ছিল অর্থের উৎস আড়াল করার কৌশল।
ইডি তাদের রিমান্ড নোটে দুর্নীতির পুরো কাঠামো তিন ভাগে ভাগ করেছে। প্রথম ভাগে প্রতি মদের বাক্সে ৭৫ রুপি ‘কমিশন’ নেওয়া হতো। এর মাধ্যমে প্রায় ৩১৯ কোটি রুপি আদায় হয়। দ্বিতীয় ভাগে নকল হলোগ্রামের মাধ্যমে মদ বিক্রি হতো সরকারি গুদামকে পাশ কাটিয়ে। শুধু ২০২২-২৩ সালেই প্রতিমাসে ৪০০ ট্রাক মদ সরানো হয়েছে। প্রতিটি কেসে ৩ হাজার রুপি লাভ হয়েছে সিন্ডিকেটের। তৃতীয়ত, সিন্ডিকেটের ছায়াতলে থাকা কোম্পানিগুলো বিশেষ লাইসেন্স পায় এবং পুরোনো দামে কিনে উচ্চ দামে বিক্রি করে ২১১ কোটি রুপি মুনাফা করে। এই অর্থের ৬০ শতাংশই চলে যায় রাজনৈতিক মহলে।
ইডি বলছে, শুধু রাজনীতিক নয়, এই দুর্নীতিতে যুক্ত ছিলেন বোতল প্রস্তুতকারক, সিকিউরিটি কন্ট্রাক্টর, আবগারি কর্মকর্তা ও এমনকি হলোগ্রাম ছাপার কর্মীরাও। ইডির এক কর্মকর্তার মতে, এই দুর্নীতি ছিল একটা গোটা রাষ্ট্রীয় কাঠামোর দখল। নীতির নামে ছিল নির্লজ্জ লুণ্ঠন।
এই মামলার অন্যতম আসামি লক্ষ্মীনারায়ণ বংসাল ওরফে পাপ্পু জানিয়েছেন, তিনি একাই ১ হাজার কোটি রুপি ব্যবস্থাপনা করেছেন। তার দাবি, তিনি চৈতন্য বাঘেলের নির্দেশে কেকে শ্রীবাস্তব নামের এক ব্যক্তির কাছে ৮০-১০০ কোটি রুপি নগদ পৌঁছে দিয়েছেন।
আনোয়ার ধেবারের ফোনে পাওয়া চ্যাটলগ থেকে জানা গেছে, চৈতন্য শুধু নির্দেশদাতা নন, বরং পুরো অর্থপাচার প্রক্রিয়ার সক্রিয় পরিকল্পনাকারী ছিলেন।
ইডি জানিয়েছে, ২০১৯ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে পুরো চক্রটি কংগ্রেস নেতাদের কাছে প্রায় ১ হাজার ৩৯২ কোটি রুপি স্থানান্তর করেছে। চৈতন্য বাঘেলের গ্রেফতারের পর এখন পাঁচ দিনের হেফাজত চেয়েছে ইডি, যাতে ডিজিটাল তথ্য ও আর্থিক লেনদেনের নথি উদ্ধার করা যায়।
তবে তদন্তকারীদের মতে, সাবেক মুখ্যমন্ত্রীর ছেলে এখনও অসহযোগিতা করছেন এবং অর্থের উৎস ও ব্যবহার বিষয়ে মুখ খুলছেন না।