পাকিস্তানের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় বেলুচিস্তান প্রদেশের এক দূরবর্তী অঞ্চলে এক নারী ও তার প্রেমিককে ‘সম্মান রক্ষার নামে হত্যা’ বা আনার কিলিংয়ের একটি ভাইরাল ভিডিও জাতীয় ক্ষোভকে উস্কে দিয়েছে। বিষয়টি বহুদিনের উপজাতীয় বিধান নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে এবং দেশটিতে বিচার চাওয়ার দাবি জোরালো করেছে। সেখানে এমন হত্যাকাণ্ড প্রায়ই নীরবতার মধ্যেই চাপা পড়ে যায়।
পাকিস্তানে প্রতিবছর শত শত তথাকথিত অনার কিলিং বা সম্মান রক্ষার নামে হত্যার ঘটনা রিপোর্ট করা হয়। কিন্তু সাধারণত তাতে সামান্যই জনসচেতনতা বা আইনগত প্রতিক্রিয়া দেখা যায়।
তবে এবারে একদল পুরুষ এক নারী ও পুরুষকে ব্যভিচারের অভিযোগে মরুভূমিতে নিয়ে গিয়ে হত্যা করার ভিডিওটি জাতীয় আবেগকে নাড়িয়ে দিয়েছে।
ভিডিওতে দেখা যায়, নারীটির নাম বানো বিবি। তাকে একজন ব্যক্তি (যাকে পুলিশ তার ভাই হিসেবে শনাক্ত করেছে) কোরআন শরীফ তুলে দেয়। বানো বলেন, ‘আমার সঙ্গে সাত কদম হাঁটো, তারপর আমাকে গুলি করো’। এরপর তিনি কিছু কদম এগিয়ে যান এবং পেছন ফিরে দাঁড়ান।
ভাই- জলাল সাতকজাই এরপর তাকে তিনবার গুলি করে। বানো মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। কয়েক সেকেন্ড পর সে বানোর প্রেমিক এহসান উল্লাহ সামালানিকেও গুলি করে হত্যা করে।
পাকিস্তানের বেলুচিস্তান প্রদেশে এই হত্যাকাণ্ডের ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর তাৎক্ষণিকভাবে সরকার ব্যবস্থা নেয়। রাজনীতিবিদ, অধিকার সংগঠন ও আলেমদের পক্ষ থেকেও নিন্দা জানানো হয়।
তবে নাগরিক অধিকারকর্মী ও আইনজীবী জিবরান নাসির বলেন, সরকারের প্রতিক্রিয়া ছিল বিচার প্রতিষ্ঠার চেয়ে বেশি প্রদর্শনমূলক। এই অপরাধটি বহু মাস আগে ঘটেছে। গোপনে নয় বরং প্রকাশ্যেই একটি প্রাদেশিক রাজধানীর কাছাকাছি এলাকায় ঘটেছে। কিন্তু কেউ কোনও ব্যবস্থা নেয়নি যতক্ষণ না ২৪ কোটি মানুষ এই হত্যাকাণ্ড ক্যামেরায় দেখে।
তিনি বলেন, ‘এটি কোনো অপরাধের প্রতি প্রতিক্রিয়া নয়। এটি একটি ভাইরাল মুহূর্তের প্রতি প্রতিক্রিয়া।’
পুলিশ জানিয়েছে, বেলুচিস্তানের নাসিরাবাদ জেলায় ১৬ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তাদের মধ্যে একজন উপজাতীয় প্রধান ও নিহত নারীর মা রয়েছেন।
ও নারীর মা গুল জান বিবি এক ভিডিও বার্তায় (যেটিও পরে ভাইরাল হয়) বলেছেন, এই হত্যাকাণ্ড পরিবার ও স্থানীয় প্রবীণদের দ্বারা ‘শতাব্দী-প্রাচীন বেলুচ প্রথা’ অনুসারে করা হয়েছে এবং এটি কোনও উপজাতীয় প্রধানের আদেশে হয়নি।
তিনি বলেন, “আমরা কোনো পাপ করিনি। বানো ও এহসানকে আমাদের রীতিনীতি অনুযায়ী হত্যা করা হয়েছে।”
তিনি আরও জানান, তার মেয়ে তিন পুত্র ও দুই কন্যার জননী। সে এহসানের সঙ্গে পালিয়ে গিয়েছিলেন এবং ২৫ দিন পর ফিরে এসেছিলেন।
পুলিশ জানিয়েছে, বানোর ছোট ভাই এই জোড়া হত্যাকাণ্ড ঘটান। সে এখনও পলাতক।
বেলুচিস্তানের মুখ্যমন্ত্রী সরফরাজ বুগতি বলেন, এটি একটি ‘পরীক্ষামূলক’ মামলা এবং তিনি অবৈধ উপজাতীয় আদালতগুলোকে বিলুপ্ত করার অঙ্গীকার করেন।
পুলিশ এর আগে জানিয়েছে, একটি জিরগা — যা একটি অনানুষ্ঠানিক উপজাতীয় পরিষদ এবং যা বহির্বিধানিক রায় দিয়ে থাকে — এই হত্যার আদেশ দেয়।
এই ভিডিওটি অনলাইনে ব্যাপক নিন্দার জন্ম দেয়। পাকিস্তান উলামা কাউন্সিল এই হত্যাকাণ্ডকে ‘অ-ইসলামিক’ বলে অভিহিত করে। এতে জড়িতদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবাদের অভিযোগ আনার আহ্বান জানায়।
ডজনখানেক নাগরিক সমাজের সদস্য ও মানবাধিকারকর্মী শনিবার প্রাদেশিক রাজধানী কোয়েটায় বিক্ষোভ করেন। তারা বিচার ও সমান্তরাল বিচারব্যবস্থার অবসানের দাবি জানান।
বেলুচিস্তানের এই হত্যাকাণ্ড পাকিস্তানের পার্লামেন্টে উত্থাপিত হয়। মানবাধিকার কমিটি এই হত্যাকাণ্ডের নিন্দা জানায় এবং যারা এই জিরগা বসিয়েছিল, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানায়। সংসদ সদস্যরা সতর্ক করেন যে, সমান্তরাল বিচারব্যবস্থার জন্য দায়ীদের দায়মুক্তি এ ধরনের সহিংসতাকে উৎসাহিত করতে পারে।
তবে অধিকারকর্মী ও বিশ্লেষকরা বলেন, এই ক্ষোভ দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার সম্ভাবনা কম। কারণ রাষ্ট্র এই জিরগাগুলোকে টিকে থাকতে দিচ্ছে দিচ্ছে।
পাকিস্তান ২০১৬ সালে অনার কিলিং নিষিদ্ধ করেছিল। সেসময় সোশ্যাল মিডিয়া তারকা কন্দিল বালুচকে হত্যার ঘটনা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ক্ষোভ সৃষ্টি করেছিল।
তারপরও হিউম্যান রাইটস কমিশন অব পাকিস্তান ২০২৪ সালে অন্তত ৪০৫টি সম্মান হত্যার রিপোর্ট করেছে। ভুক্তভোগীদের মধ্যে অধিকাংশই নারী। পরিবারের সম্মান রক্ষার দাবিতে যারা আত্মীয়-স্বজনদের হাতেই হত্যার শিকার হয়েছে।
সূত্র: রয়টার্স