রাশিয়া থেকে সস্তায় তেল কিনে কয়েক বিলিয়ন ডলার সাশ্রয় করেছিল ভারত। কিন্তু মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নতুন শুল্ক নীতি কার্যকর হওয়ায় সেই সাশ্রয় দ্রুত শেষ হয়ে যাচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, এর কোনও সহজ সমাধানও নেই নয়া দিল্লির কাছে। ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্স এ খবর জানিয়েছে।
গ্লোবাল ট্রেড রিসার্চ ইনিশিয়েটিভের (জিটিআরআই) হিসাবে, ২০২২ সালে ইউক্রেনে রুশ আক্রমণ শুরুর পর থেকে রাশিয়ার তেল আমদানি বাড়িয়ে অন্তত ১৭ বিলিয়ন ডলার সাশ্রয় করেছে ভারত। কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসনের আরোপিত সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ শুল্কে চলতি অর্থবছরেই ভারতের রফতানি কমতে পারে ৪০ শতাংশ বা প্রায় ৩৭ বিলিয়ন ডলার।
জিটিআরআইয়ের প্রতিষ্ঠাতা অজয় শ্রীবাস্তব বলেন, শুল্ক আংশিক শিথিল হলেও প্রভাব দীর্ঘমেয়াদি হবে। প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলো সুযোগ নেবে। চীন, ভিয়েতনাম, মেক্সিকো কিংবা পাকিস্তান পর্যন্ত ভারতকে অনেক বাজার থেকে সরিয়ে দিতে পারে।’
এতে রাজনৈতিকভাবেও চাপে পড়তে পারেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। শ্রমনির্ভর খাত যেমন টেক্সটাইল, হীরা ও গহনা শিল্পে হাজারো চাকরি ঝুঁকিতে পড়বে। বিশ্লেষক হ্যাপিমন জ্যাকব বলেন, ‘ভারত এখনও প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম, সস্তা তেল, ভূরাজনৈতিক ভারসাম্য এবং নানা সংবেদনশীল বিষয়ে রাশিয়ার সমর্থন চাইবে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রকেও উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। ভারতের জন্য উভয়ের সঙ্গে সম্পর্ক সমান গুরুত্বপূর্ণ।
ভারতের পররাষ্ট্রসচিব জানিয়েছেন, ওয়াশিংটনের সঙ্গে বাণিজ্য, জ্বালানি নিরাপত্তা (পারমাণবিক সহযোগিতাসহ) ও গুরুত্বপূর্ণ খনিজ অনুসন্ধান নিয়ে ভার্চুয়াল বৈঠক চলছে। সরকার চাইছে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক মেরামত করতে। তবে রাশিয়ার তেল আমদানি পুরোপুরি বন্ধের পরিকল্পনা নেই। বর্তমানে ভারতের দৈনিক তেলের ৪০ শতাংশই আসছে রাশিয়া থেকে, যা যুদ্ধ শুরুর আগে ছিল প্রায় শূন্য।
ভারতের আশঙ্কা, আমদানি বন্ধ হলে বৈশ্বিক তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ২০০ ডলার ছাড়াতে পারে। দেশীয় জ্বালানির মূল্যও হু হু করে বাড়বে। নিউ দিল্লি যুক্তি দিয়েছে, সস্তা তেল না পেলে ভোক্তার জন্য জ্বালানি ব্যয় নিয়ন্ত্রণ অসম্ভব হয়ে পড়বে।
এই পরিস্থিতিকে দ্বিচারিতা বলে উল্লেখ করেছে ভারত। কারণ, যুক্তরাষ্ট্র নিজেই রাশিয়ার ইউরেনিয়াম হেক্সাফ্লুরাইড, প্যালাডিয়াম ও সার কিনে যাচ্ছে। অথচ শুধু ভারতকেই নিশানা বানাচ্ছে। এ প্রসঙ্গে মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট সম্প্রতি অভিযোগ করেছেন, ভারত যুদ্ধ শুরুর পর রাশিয়ার তেল কিনে মুনাফা করেছে, যা অগ্রহণযোগ্য।
অন্যদিকে, আসন্ন নির্বাচনি বছর ঘিরে মোদি কৃষকদের পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। পাশাপাশি পণ্য ও পরিষেবা কর (জিএসটি) কমানোর অঙ্গীকার করেছেন, যাতে অভ্যন্তরীণ চাহিদা বাড়ে। বিশ্লেষকদের মতে, শুল্ক সংকট কৃষি ও গ্রামীণ ভোটব্যাংকেও প্রভাব ফেলতে পারে।
এদিকে, রাশিয়া চায় ভারত তার তেল কেনা অব্যাহত রাখুক। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র মনে করছে, ভারতের সহযোগিতা ছাড়া ইন্দো-প্যাসিফিকে চীনের প্রভাব ঠেকানো সম্ভব নয়। এই কূটনৈতিক টানাপোড়েনের মাঝেই মোদি শিগগিরই সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশনের সম্মেলনে অংশ নেবেন। সেখানে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং উপস্থিত থাকবেন।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত শুধু বাণিজ্য নয়, ভিসা নীতি ও আইটি সেবা খাতেও ভারতের জন্য নতুন ঝুঁকি তৈরি করেছে। যুক্তরাষ্ট্র-ভারতের সম্পর্ক হয়তো ১৯৯৮ সালের পারমাণবিক পরীক্ষা-পরবর্তী পর্যায়ের মতো সংকটে পড়েছে।
হ্যাপিমন জ্যাকবের ভাষায়, বিশ্বের অন্য দেশগুলো এখন দেখছে, যুক্তরাষ্ট্রের চাপে ভারতকেও ছাড় দিতে হচ্ছে। তাহলে তাদের পক্ষে ওয়াশিংটনের চাপ প্রতিহত করা আরও কঠিন হবে। আর এতে চীন বিকল্প শক্তি হয়ে উঠতে পারে।