চীনের শহরগুলোতে নীরবে বদলে যাচ্ছে মানুষের দৈনন্দিন অভ্যাস। ঝাল ও তেলেভাজা খাবারের জন্য পরিচিত ছোংছিং শহরে এক দশক ধরে বসবাস করা হুয়াং মেংইয়া জানালেন, ঝাল-মসলা ও তেলের আধিক্য থাকা হটপটের জায়গায় এখন তিনি বেছে নিচ্ছেন হালকা স্বাদের স্বাস্থ্যকর হটপট। ‘শুধু শরীরের গঠনটা ধরে রাখতেই খাচ্ছি তা নয়, স্বাস্থ্যকর হটপট বলতে এখানে কম ক্যালরির খাবার বোঝাচ্ছি, যাতে পুষ্টি রয়েছে বেশি,’ বললেন মেংইয়া।
খাদ্যাভ্যাসে নীরব এই পরিবর্তন আসছে অনেক শহুরে চীনাদের জীবনে। তবে এটি শুধু খাবারেই সীমাবদ্ধ নয়। বেইজিংয়ে কর্মজীবী মানুষজন এখন নিয়মিত মক্সিবাসশন, ম্যাসাজ ও স্পা থেরাপির মতো প্রাচীন চীনা চিকিৎসাপদ্ধতির দিকেও ঝুঁকছেন। ক্লান্তি, ঘাড়ব্যথা বা অনিদ্রা—এসব সমস্যা কমাতে এসব স্বাস্থ্যসেবা নতুন ভরসা হয়ে উঠেছে।
বেইজিংয়ের ৩৮ বছর বয়সী থাং সিয়াওহুয়া সপ্তাহে একবার মক্সিবাশনের জন্য একটি হেলথ বারে যান। তিনি বলেন, ছয় মাস চিকিৎসার পর তার কাঁধ এবং ঘাড়ের ব্যথা কমেছে। এখন সহজে ক্লান্তবোধ করেন না এবং আগের চেয়ে ভালো ঘুমাতে পারেন।
হেলথ বারের কর্ণধার লিউ তোং জানালেন, ‘মক্সিবাশন রক্ত প্রবাহ উন্নত করতে, ঠান্ডা দূর করতে এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে।’
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ম্যাসাজ এবং স্পা চিকিৎসার জন্য আসা গ্রাহকদের সংখ্যা বৃদ্ধিও লক্ষ্য করেছেন লিউ।
পরিসংখ্যানও বলছে একই কথা। ২০২৫ সালে করা এক জরিপে দেখা গেছে, ৯৪ শতাংশ চীনার কাছে স্বাস্থ্য ও সুস্থতা এখন সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পাওয়া বিষয়। আয় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্ট পণ্য ও সেবায় ব্যয়ও দ্রুত বাড়ছে। শহরের রাস্তায় চিনি-ভরা বাবল টির বদলে দেখা যাচ্ছে ভেষজ পানীয়, আর পোশাকের বাজারে ক্যাজুয়েলের পরই জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে স্পোর্টসওয়্যার।
সরকারি নীতিও এই ধারাকে শক্তিশালী করছে। ‘হেলদি চায়না ২০৩০’ পরিকল্পনার মাধ্যমে চিকিৎসার চেয়ে প্রতিরোধ ও সুস্থ জীবনযাপনে জোর দেওয়া হচ্ছে।
খাদ্য খাতে পরিবর্তন স্পষ্ট। ব্যবসায়িক তথ্য প্ল্যাটফর্ম থিয়ানইয়ানছার তথ্যানুযায়ী, চীনে এখন ১৪ হাজারের বেশি স্বাস্থ্যকর খাবার-সম্পর্কিত উদ্যোগ রয়েছে, যার মধ্যে প্রায় ৬০ শতাংশ গত পাঁচ বছরের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোয় চীনে স্বাস্থ্য সম্পর্কিত পর্যটনও ব্যাপকভাবে বেড়েছে। হাইনান ও ইয়ুননান এক্ষেত্রে জনপ্রিয় গন্তব্যস্থল। দক্ষিণের এই প্রদেশগুলোতে, রিসোর্টগুলো উষ্ণ প্রস্রবণ, বন এবং টিসিএমকে স্বাস্থ্যসেবায় একীভূত করেছে।
এদিকে চিকিৎসা অগ্রগতির দিক থেকেও চীন বিশ্বের দ্রুততম অগ্রগতিশীল দেশগুলোর একটি। মধ্যম ও উচ্চ-আয়ের দেশগুলোর মধ্যে প্রধান স্বাস্থ্য সূচকগুলোর মধ্যে শীর্ষস্থানে রয়েছে। ২০২৪ সালে, চীনা জনগণের গড় আয়ু ৭৯ বছরে দাঁড়িয়েছে, যা বিশ্বের গড় আয়ুর চেয়ে পাঁচ বছর বেশি। দেশটি ২০৩০ সালের মধ্যে এই সংখ্যা ৮০-তে উন্নীত করার লক্ষ্য নিয়েছে।
২০২৪ সালে, চীন সরকার স্বাস্থ্যকর জীবনধারাকে উৎসাহিত করার এবং দীর্ঘস্থায়ী রোগ প্রতিরোধের লক্ষ্যে তিন বছরের ওজন ব্যবস্থাপনা অভিযান শুরু করে। গত বছর, স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, খেলাধুলা এবং দেশের বয়স্ক জনসংখ্যার জন্য পরিষেবার মতো বিভিন্ন পদক্ষেপের রূপরেখা দিয়ে স্বাস্থ্য-সম্পর্কিত একটি কর্ম পরিকল্পনা চালু করা হয়েছিল। সেই ধারাবাহিকতায় চীনে স্পোর্টস ফ্যাসিলিটি ও ইভেন্টের সংখ্যা বাড়তে দেখা গেছে। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোয় এখন শিক্ষার্থীদের প্রতিদিন কমপক্ষে দুই ঘণ্টা শারীরিক কার্যকলাপে অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।
হাসপাতালগুলো ওজন ব্যবস্থাপনা ক্লিনিক খুলছে, অতিরিক্ত ওজন এবং স্থূলতার সাথে লড়াই করা ব্যক্তিদের জন্য ব্যক্তিগতকৃত পরিকল্পনা প্রদান করছে। ইতোমধ্যে, কিছু সিনিয়র কেয়ার সুবিধা তাদের বয়স্ক বাসিন্দাদের জন্য স্মার্ট ফিটনেস আয়না, স্মার্ট গদি ও সঙ্গী রোবট চালু করেছে।
চীনের ক্যাটারিং সেক্টরে, রেস্তোরাঁ এবং ক্যান্টিনগুলোও এখন স্বাস্থ্যকর মেনু সম্পর্কিত প্রচার জোরদার করেছে। ছোংছিংয়ের একটি রেস্তোরাঁ চেইন ‘লাইট নুডলস’ চালু করেছে। ওই কোম্পানির প্রধান লি হ্যাং বলেছেন, মাত্র তিন মাসে তার বিক্রি ছাড়িয়েছে এক লাখ বাটি।
সব মিলিয়ে চীনে সুস্থতার চর্চা এখন আর বিলাস নয়, বরং দৈনন্দিন জীবনেরই অংশ।