মার্কিন চাপে ইরানের চাবাহার বন্দর থেকে কি সরে যাচ্ছে ভারত?

ইরানের কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ চাবাহার বন্দর প্রকল্পে ভারতের এক দশকের সম্পৃক্ততা এখন বড় ধরনের প্রশ্নের মুখে। সাম্প্রতিক বিভিন্ন প্রতিবেদন ও নাটকীয় কিছু পদক্ষেপ ইঙ্গিত দিচ্ছে যে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন নিষেধাজ্ঞা এবং অতিরিক্ত শুল্কের খড়গ থেকে বাঁচতে নয়াদিল্লি সম্ভবত এই প্রকল্প থেকে নিজেদের গুটিয়ে নিচ্ছে। তুরস্কের সংবাদমাধ্যম টিআরটি ওয়ার্ল্ড এ খবর জানিয়েছে।

হরমুজ প্রণালির বাইরে ইরানের দক্ষিণ-পূর্ব উপকূলে অবস্থিত চাবাহার বন্দরটি ভারতের কাছে দীর্ঘকাল ধরেই ছিল কৌশলগত তুরুপের তাস। পাকিস্তানকে এড়িয়ে আফগানিস্তান ও মধ্য এশিয়ায় প্রবেশের প্রধান পথ হিসেবে এই বন্দরকে বিবেচনা করে ভারত। তবে ভূ-রাজনীতির মারপ্যাঁচে সেই স্বপ্ন এখন ফিকে হতে শুরু করেছে।

বৃহস্পতিবার দ্য ইকোনমিক টাইমস (ইটি ইনফ্রা) একটি বিস্তারিত প্রতিবেদনে জানিয়েছে, ভারত চাবাহার বন্দরের উন্নয়নের জন্য তাদের নির্ধারিত আর্থিক প্রতিশ্রুতির পুরো অর্থ প্রায় ১২ কোটি ডলার ইতোমধ্যে ইরানকে পাঠিয়ে দিয়েছে। এর মাধ্যমে প্রকল্পের প্রতি তাদের আর্থিক দায়বদ্ধতা থেকে নিজেদের দায়মুক্ত করেছে নয়াদিল্লি।

সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো এই অর্থ হস্তান্তরের সময়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরের শেষে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা পুনরায় কার্যকর হওয়ার আগেই ভারত এই অর্থ পরিশোধ সম্পন্ন করে। ইটি ইনফ্রা-এর সম্পাদক পি মনোজের মতে, এটি আসলে ভারতের এই প্রকল্প থেকে সুকৌশলে বেরিয়ে যাওয়ার বা ‘গেম ওভার’-এর ইঙ্গিত। তিনি বলেন, অবাক করার বিষয় হলো নিষেধাজ্ঞা শুরু হওয়ার আগেই ভারত তাদের পুরো প্রতিশ্রুত অর্থ ইরানকে দিয়ে দিয়েছে।

কৌশলগত পিছুটান নাকি সাময়িক কৌশল?

অবশ্য ভারতের সাবেক কূটনীতিবিদ অনিল ওয়াধওয়া এই পদক্ষেপকে ভিন্নভাবে দেখছেন। তার মতে, এটি কোনও স্থায়ী প্রস্থান নয় বরং একটি ‘কৌশলগত পুনর্মূল্যায়ন’। তিনি বলেন, নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হলে অর্থ পাঠানো অসম্ভব হয়ে পড়তো বলেই আগেভাগে তা পাঠানো হয়েছে, যাতে বন্দরের কাজ বন্ধ না হয়। এর মানে এই নয় যে ভারত সরে গেছে।

উল্লেখ্য, যুক্তরাষ্ট্র গত ২৯ অক্টোবর থেকে ২০২৬ সালের ২৬ এপ্রিল পর্যন্ত ভারতকে ছয় মাসের একটি শর্তাধীন ছাড় (ওয়েভার) দিয়েছে। এই সময়ের মধ্যে ভারতকে ওয়াশিংটনের সঙ্গে একটি সমঝোতায় পৌঁছাতে হবে। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় (এমইএ) জানিয়েছে, তারা এই ছাড়ের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কাজ করছে এবং পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।

ট্রাম্পের শুল্কনীতি ও ত্রিমুখী চাপ

ভারতের সামনে এখন বড় সংকট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কঠোর বাণিজ্যনীতি। ইতোমধ্যে ট্রাম্প প্রশাসন ভারতীয় পণ্যের ওপর ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছে। এর ওপর গত ১২ জানুয়ারি ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, ইরানের সঙ্গে ব্যবসা করলে অতিরিক্ত আরও ২৫ শতাংশ শুল্ক গুনতে হবে।

এমন অবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দীর্ঘকাল ধরে ঝুলে থাকা মুক্তবাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) নিশ্চিত করা ভারতের জন্য অগ্রাধিকার হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে চাবাহার নিয়ে জেদ বজায় রাখা ভারতের জন্য অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক উভয় দিক থেকেই অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।

কার্যক্রম থেকে ভারতের পিছুটান

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভারত কেবল আর্থিকভাবেই নয়, কার্যক্রমের দিক থেকেও পিছিয়ে আসতে শুরু করেছে। চাবাহার বন্দর পরিচালনার দায়িত্বে থাকা রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা ইন্ডিয়া পোর্টস গ্লোবাল লিমিটেড (আইপিজিএল)-এর সরকার মনোনীত পরিচালকরা নিষেধাজ্ঞার ভয়ে গণপদত্যাগ করেছেন। এমনকি কর্মকর্তাদের ওপর মার্কিন শাস্তির প্রভাব এড়াতে কোম্পানির ওয়েবসাইটটিও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

ভারত বর্তমানে চাবাহারে কোনও স্থায়ী সম্পদ (ফিজিক্যাল অ্যাসেট) রাখছে না, বরং কেবল জনবল দিয়ে সহায়তা করছিল। ইটি ইনফ্রা-এর একটি সূত্র বলছে, নিষেধাজ্ঞা শিথিল না হলে ভারতের সামনে বেরিয়ে আসা ছাড়া আর কোনও পথ নেই।

মধ্য এশিয়ার প্রবেশপথ কি রুদ্ধ হচ্ছে?

চাবাহার শুধু একটি বন্দর নয়, এটি ৭ হাজার ২০০ কিলোমিটার দীর্ঘ আন্তর্জাতিক উত্তর-দক্ষিণ পরিবহন করিডোর (আইএনএসটিসি)-এর একটি অন্যতম অংশ। এর মাধ্যমে ভারত সরাসরি রাশিয়া ও ইউরোপের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার পরিকল্পনা করেছিল। কিন্তু বর্তমান অস্থিরতা সেই বিশাল উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, ভারত এখন নিজের জন্য সবচেয়ে ভালোটি খুঁজে দেখছে। একদিকে দীর্ঘদিনের কৌশলগত বন্ধু ইরান, অন্যদিকে বিশাল বড় বাণিজ্যিক বাজার যুক্তরাষ্ট্র। শেষ পর্যন্ত অর্থনীতির চাপে পড়ে ভারতকে সম্ভবত কৌশলগত স্বার্থ আপাতত বিসর্জন দিতে হতে পারে। চাবাহার থেকে ভারতের এই প্রস্থান যদি চূড়ান্ত হয়, তবে তা দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক রাজনীতিতে এক বড় ধরনের পালাবদল হিসেবে চিহ্নিত হবে।