মণিপুর শান্ত করার গুরুদায়িত্বে এক তায়কোয়ান্দো শিক্ষক

ভারতের অশান্ত উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য মণিপুরে এক বছরের সরাসরি কেন্দ্রীয় শাসনের অবসান ঘটেছে। গত সপ্তাহে রাজ্যের নতুন মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন ৬২ বছর বয়সী বিজেপি নেতা ইউমনাম খেমচাঁদ সিং। ২৬০ জনের বেশি মানুষের প্রাণহানি এবং হাজার হাজার মানুষের ঘরবাড়ি ছাড়ার ক্ষত নিয়ে এখনও ধুঁকছে মণিপুর। এই পরিস্থিতিতে মার্শাল আর্ট তায়কোয়ান্দোর ব্ল্যাক বেল্টধারী এই শিক্ষক কি পারবেন সংখ্যাগুরু মেইতেই এবং সংখ্যালঘু কুকি-জো সম্প্রদায়ের মধ্যে শান্তি ফিরিয়ে আনতে? ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি এ খবর জানিয়েছে।

কোরীয় মার্শাল আর্ট তায়কোয়ান্দোতে পঞ্চম ড্যান ব্ল্যাক বেল্টধারী খেমচাঁদ সিং দীর্ঘদিন এই খেলাটির শিক্ষকতা করেছেন। ২০১৭ সালে প্রথমবার বিধায়ক নির্বাচিত হওয়া এই নেতা এর আগে বিধানসভার স্পিকার এবং শিক্ষা ও গ্রামীণ উন্নয়নের মতো গুরুত্বপূর্ণ দফতরের মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। বিজেপির আদর্শিক অভিভাবক হিসেবে পরিচিত আরএসএসের সঙ্গে দীর্ঘ ঘনিষ্ঠতা থাকলেও নির্বাচনি রাজনীতিতে তিনি এসেছেন কিছুটা দেরিতে।

২০২৩ সালের মে মাসে জাতিগত দাঙ্গা শুরু হওয়ার পর থেকে মণিপুর কার্যত দুই ভাগে বিভক্ত। রাজ্যের রাজধানী ইম্ফলসহ সমতল এলাকায় বাস করেন মেইতেইরা, আর পাহাড়ি অঞ্চলে কুকি-জোদের প্রাধান্য। গত ৪ ফেব্রুয়ারি খেমচাঁদ সিং যখন শপথ নিচ্ছিলেন, ঠিক তখনই কুকি-জো অধ্যুষিত চুরাচাঁদপুর জেলায় রাস্তা অবরোধ ও বনধের মাধ্যমে প্রতিবাদ জানানো হয়। কুকি-জোদের দাবি, বর্তমান ব্যবস্থার বদলে তাদের জন্য আলাদা প্রশাসনিক কাঠামো গঠন করতে হবে।

নিজে মেইতেই সম্প্রদায়ের হলেও খেমচাঁদ সিং তার মন্ত্রিসভায় তিনজন কুকি-জো নেতাকে মন্ত্রী করেছেন, যার মধ্যে একজন উপ-মুখ্যমন্ত্রী। মূলত জাতিগত বিভেদ মেটাতেই বিজেপি এই ভারসাম্যের কৌশল নিয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, গত বছরের ডিসেম্বরে খেমচাঁদ সিং বাস্তুচ্যুত কুকি-জোদের একটি আশ্রয় শিবির পরিদর্শন করেছিলেন, যা একজন মেইতেই নেতার জন্য তখন ছিল অকল্পনীয়। তার এই পদক্ষেপটিই সম্ভবত কুকি-জো বিধায়কদের সমর্থন আদায়ে সাহায্য করেছে।

খেমচাঁদ সিংয়ের নেতৃত্ব নিয়ে জনমত বিভক্ত। ইম্ফল রিভিউ অব আর্টস অ্যান্ড পলিটিক্স-এর সম্পাদক প্রদীপ ফাঞ্জৌবাম বলেন, এখনই কিছু বলা কঠিন। আগামী কয়েক সপ্তাহ পরিস্থিতি বোঝার জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ।

অন্যদিকে, কুকি ছাত্রনেতা মাং খংসাই মনে করেন, কেবল প্রশাসন পরিচালনা করলেই শান্তি আসবে না; এর জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক সততা। তার মতে, সরকার এখন পর্যন্ত বিরোধ নিষ্পত্তির কোনও বিশ্বাসযোগ্য রোডম্যাপ দিতে পারেনি।

মেইতেই ও কুকি-জোদের বিরোধের মাঝেই নতুন করে উত্তেজনা দেখা দিয়েছে কুকি-জো ও নাগা আদিবাসীদের মধ্যে। রবিবার উখরুল জেলায় দুই গোষ্ঠীর সংঘর্ষের পর সেখানে সভা-সমাবেশের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করেছে কর্তৃপক্ষ।

মাত্র ৩০ লাখ জনসংখ্যার ছোট এই রাজ্যটি অলিম্পিক পদকজয়ী মীরাবাঈ চানু বা মেরি কমের মতো অ্যাথলেট তৈরির জন্য বিখ্যাত। খেমচাঁদ সিং নিজেও সেই ক্রীড়া সংস্কৃতিরই অংশ। কিন্তু বর্তমানে মিলিশিয়া বাহিনীর হাতে অস্ত্র এবং চরম অবিশ্বাসের আবহে সেই ঐতিহ্য হুমকির মুখে। দিল্লির মেইতেই কোঅর্ডিনেটিং কমিটির কনভেনার সেরাম রোজেস বলেন, টেকসই শান্তির জন্য সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে নিরস্ত্রীকরণ করা জরুরি।