তামিল চলচ্চিত্রে নায়কের আগমনী দৃশ্য মানেই এক অতিপ্রাকৃত ও রাজকীয় ব্যাপার। গত ১০ মে যখন অভিনেতা থেকে রাজনীতিবিদ বনে যাওয়া সি জোসেফ বিজয় তামিলনাড়ুর নবম মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন, তখন বাস্তব জগতের দৃশ্যটিও সিনেমার চেয়ে কম ছিল না। ১৯৬৭ সাল থেকে রাজ্য শাসন করা দ্রাবিড় একাধিপত্যকে এক অবিশ্বাস্য রায় দিয়ে উপড়ে ফেলে ক্ষমতায় বসেন তিনি। তবে সিংহাসনে বসার মাত্র এক মাসের মাথায় যেন দ্রুতই ‘বিরতি’র সময় চলে এসেছে; যেখানে এক প্রান্তে রয়েছে তার শাসনব্যবস্থার প্রকৃত আকাঙ্ক্ষা, আর অন্য প্রান্তে রয়েছে বেশ কিছু বড় ধরণের হোঁচট।
শীর্ষ পর্যায়ে নিয়মানুবর্তিতা
বিজয় তার মেয়াদের শুরুতেই যে বিষয়টির জন্য সবচেয়ে বেশি প্রশংসিত হয়েছেন, তার সঙ্গে কোনও নীতির সম্পর্ক নেই, তা হলো তার নিয়মানুবর্তিতা। তামিল রাজনীতির ঐতিহ্যবাহী সাদা ধুতি পরিহার করে তিনি ঠিক সময়ে সচিবালয়ে পৌঁছান কালো স্যুট ও সাদা শার্ট পরে। কোনও কথা বলার আগেই এই পোশাকের মাধ্যমে তিনি এক নীরব বার্তা দেন। সোমবার থেকে শুক্রবার প্রতিদিন বিজয় পুরো সাত ঘণ্টা তার ডেস্কে কাটান এবং কর্মকর্তাদের জন্য প্রশাসনিক সময়ানুবর্তিতাকে বাধ্যতামূলক করেছেন। এমনকি তিনি নিজের দুপুরের খাবার বাড়ি থেকে নিয়ে আসেন এবং কেবিনে বসে নীরবে খান। এই পদক্ষেপগুলোকে অনেকে হয়তো রাজনৈতিক নাটক বলে উড়িয়ে দিতে পারেন, কিন্তু শীর্ষ পর্যায় থেকে আসা এই বার্তাগুলোকে শাসনব্যবস্থায় উপেক্ষা করা কঠিন।
মদ ও নারী নিরাপত্তা
শুরুর দিকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলোর মধ্যে ছিল উপাসনালয়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং বাস স্ট্যান্ডের ৫০০ মিটারের মধ্যে অবস্থিত ৭১৭টি রাষ্ট্রায়ত্ত মদের দোকান বন্ধের নির্দেশ। যার মধ্যে ধর্মীয় উপাসনালয়ের কাছে ২৭৬টি, স্কুল ও কলেজের কাছে ১৮৬টি এবং বাস টার্মিনালের কাছে ২৫৫টি দোকান রয়েছে। এর মাধ্যমে টিভিকে দলের ইশতেহারের মূল প্রতিশ্রুতি পূরণ করে মাত্র দুই সপ্তাহের মধ্যে দোকানগুলো বন্ধ করা হয়। এই সিদ্ধান্তে ৩ হাজার ৪৭৪ জন কর্মচারী সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হলেও সরকার দ্রুত তাদের অন্য টাসম্যাক দোকানে পুনর্বাসিত করেছে।
তবে সমালোচকদের মতে, রাজ্যে এখনও ৪ হাজার ৭০০টির বেশি মদের দোকান চালু রয়েছে; ফলে এই পদক্ষেপ কেবল দূরত্ব কমিয়েছে, মদের সহজলভ্যতার মূল সমস্যার সমাধান করেনি। উপরন্তু, রাজ্যের রাজস্বে টাসম্যাকের বড় অবদান থাকায় এই বিষয়টিকে বিজয়ের বেশ সতর্কতার সঙ্গে সামলাতে হবে।
অন্যদিকে, নারী নিরাপত্তার ক্ষেত্রে বিজয় শুধু ঘোষণাতেই সীমাবদ্ধ থাকেননি, তা বাস্তবায়নও করেছেন। গত ৯ জুন আনুষ্ঠানিকভাবে ‘সিঙ্গাপেন্নে’ নামের বিশেষ টাস্কফোর্স চালু করা হয়েছে। প্রবীণ আইপিএস কর্মকর্তা কে. ভুবনেশ্বরীর নেতৃত্বে নারী ও শিশুদের বিরুদ্ধে অপরাধ দমনে নিয়োজিত এই বিশেষ পুলিশ বাহিনীকে এখন সব জেলায় মোতায়েন করা হচ্ছে। নামের মতোই এই বাহিনী বাস্তবে কতটা কাজ করতে পারে, এখন সেটিই দেখার বিষয়।
ঠিকাদার চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান
নতুন প্রশাসনের অন্যতম রাজনৈতিক সাহসী পদক্ষেপ হলো সরকারি অবকাঠামো চুক্তিতে ঘুষের বিরুদ্ধে জিরো-টলারেন্স নীতি ঘোষণা। গণপূর্ত বিভাগ এবং মহাসড়ক বিভাগকে স্পষ্ট নির্দেশ দিয়ে ঠিকাদার ও কর্মকর্তাদের এই ‘কমিশন সিস্টেম’ সম্পর্কে সতর্ক করা হয়েছে। ঠিকাদার সমিতির সভাপতি গুণমনি প্রকাশ্যে স্বীকার করেছেন যে, নতুন সরকার মন্ত্রীদের বা সরকারি কর্মকর্তাদের ঘুষ না দেওয়ার জন্য ঠিকাদারদের নির্দেশ দিয়েছে।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, পূর্ববর্তী প্রশাসন চুক্তি অনুমোদনের জন্য নিয়মিত ১৫ শতাংশ কমিশন আদায় করত। তবে এই নির্দেশ কাঠামোগত পরিবর্তনে রূপ নেবে নাকি কেবল কাগজে-কলমে থেকে যাবে, তা নির্ভর করবে ভবিষ্যৎ পদক্ষেপের ওপর।
ভিশন ডকুমেন্ট ও দুর্নীতিবিরোধী বার্তা
বিজয়ের মন্ত্রিসভা তাদের প্রাথমিক শাসনব্যবস্থার ভিত্তি হিসেবে ভেট্রি তামিজাগাম ভিশন ডকুমেন্ট তৈরি করেছে। যা ৩৫টি সরকারি বিভাগের জন্য একটি ৪৩৬-দফা বিশিষ্ট প্রশাসনিক রূপরেখা। এই নথিতে জবাবদিহিতার একটি কাঠামো দেওয়া হলেও, এর বিশাল পরিধি ব্যর্থতার ঝুঁকিও বাড়ায়। এর সঙ্গে রয়েছে একটি স্পষ্ট দুর্নীতিবিরোধী নির্দেশ: মুখ্যমন্ত্রী হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যে দলের নেতৃত্বের কাছাকাছি ব্যক্তি হলেও দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তাদের দ্রুত শাস্তি পেতে হবে।
‘আম্মা উনবাগম’ ক্যান্টিনের পুনরুজ্জীবন
দায়িত্ব নেওয়ার প্রথম দুই সপ্তাহের মধ্যে বিজয় তামিলনাড়ু জুড়ে চালু থাকা ৬২০টি ‘আম্মা উনবাগম’ ক্যান্টিন ব্যাপকভাবে সংস্কারের নির্দেশ দেন। এর মধ্যে চেন্নাই করপোরেশনের অধীনে ৩৮৩টি এবং অন্যান্য পৌরসভা ও টাউন পঞ্চায়েতের অধীনে ২৩৭টি ক্যান্টিন রয়েছে। ক্যান্টিনগুলোর অবস্থা পর্যালোচনার পর মুখ্যমন্ত্রী ক্ষতিগ্রস্ত তৈজসপত্র পরিবর্তন, রান্নাঘর আধুনিকীকরণ, স্যানিটেশন ব্যবস্থার মানোন্নয়ন এবং জনসাধারণের অভিযোগ দ্রুত সমাধানের ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন। এই সংস্কার ও নতুন খাদ্যসামগ্রীর অর্থ সরাসরি মিউনিসিপ্যাল করপোরেশনের সাধারণ তহবিল থেকে নেওয়া হবে। দিনমজুর, শহরের দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোকে সাশ্রয়ী মূল্যে খাবার দেওয়া এই ক্যান্টিন নেটওয়ার্কটি অনেক জায়গায় প্রায় ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছিল; বিজয়ের এই নির্দেশ একে পুনরায় সচল করার ইঙ্গিত দেয়।
শুরুর দিকের কিছু হোঁচট
বিজয়ের প্রথম মাসটি কিন্তু পুরোপুরি বিতর্কহীন ছিল না। সরকারের পক্ষ থেকে শুরুতে একজন জ্যোতিষীকে অফিসার অন স্পেশাল ডিউটি হিসেবে নিয়োগ দেওয়ায় বিরোধী দলসহ খোদ সরকারি জোটের ভেতর থেকেই তীব্র সমালোচনা ধেয়ে আসে। ফলে ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই সেই নিয়োগ বাতিল করা হয়, যাকে অনেকে জনগণের চাপের প্রতি সম্মান হিসেবে দেখলেও, অন্যরা একে সরকারের দুর্বল যাচাই-বাছাইয়ের প্রমাণ হিসেবে দেখছেন।
দ্বিতীয় বিতর্কটি তৈরি হয় কাঞ্চিপুরামের একটি পানির ট্যাঙ্কের টেন্ডার নিয়ে। যেখানে দরপত্র জমা দেওয়ার জন্য মাত্র ছয় ঘণ্টার সময়সীমা দেওয়া হয়েছিল। এতে অভিযোগ ওঠে যে, একটি নির্দিষ্ট ঠিকাদারকে সুবিধা দেওয়ার জন্যই এই প্রক্রিয়া সাজানো হয়েছিল। পরবর্তীতে সেই টেন্ডারটিও প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়; যার ফলে প্রথম সপ্তাহের মধ্যেই পরপর দুটি সরকারি আদেশ বাতিলের ঘটনা ঘটে। উদয়নিধি স্ট্যালিনের ডিএমকে-র নেতৃত্বে বিরোধী দলগুলো যুক্তি দিয়েছে যে, প্রশাসনিক অভিজ্ঞতার অভাব বলে এই ধরণের ভুল শাসন পদক্ষেপকে আড়াল করা যাবে না।
এ ছাড়া আরেকটি সমালোচনা তৈরি হয়েছে মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে বিজয়ের প্রথম বড় জনসভাকে কেন্দ্র করে। গত ১ জুন ত্রিচিতে অনুষ্ঠিত এই ধন্যবাদ জ্ঞাপন সমাবেশে প্রশাসনিক ঘোষণার চেয়ে ডিএমকে এবং এআইএডিএমকে-র সঙ্গে রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ মেলাতেই বেশি সময় নেন বিজয়। সমর্থকদের কাছে এটি তার জনসমর্থনের প্রমাণ হলেও, সমালোচকদের মতে মুখ্যমন্ত্রীর মনোযোগ সচিবালয়ের কাজে ঠিকমতো আছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
সূত্র: ইন্ডিয়া টুডে