পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি এক নজিরবিহীন নাটকীয় মোড় নিয়েছে। তৃণমূল কংগ্রেস থেকেই ‘অপসারিত’ হলেন খোদ দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। দলটির ‘দখল’ নিয়েছে বিদ্রোহী শিবির, অন্তত এমনই দাবি করছেন উলুবেড়িয়া উত্তরের বিধায়ক ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়। এরই মধ্যে ‘তৃণমূলে’ একটি নতুন কমিটি গঠন করা হয়েছে, যার নতুন চেয়ারম্যান করা হয়েছে হাওড়া মধ্য বিধানসভার বিধায়ক অরূপ রায়কে। শুধু তা-ই নয়, তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কেও। তার জায়গায় বেছে নেওয়া হয়েছে নতুন সাধারণ সম্পাদক।
সোমবার বিধানসভায় বাজেট অধিবেশন ছিল। সেই অধিবেশন শেষ হতেই তৃণমূলের বিদ্রোহী বিধায়কেরা নিউ টাউনের একটি হোটেলে গোপন বৈঠকে বসেন। ওই বৈঠকে তৃণমূলের ৬০ জন বিধায়ক এবং কলকাতার প্রায় ৭০ জন সাবেক কাউন্সিলর উপস্থিত ছিলেন। সেই বৈঠকেই ‘তৃণমূলের’ ৩০ জনের একটি নতুন কমিটি তৈরির কথা আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়।
বিদ্রোহী শিবিরের এই বৈঠকে তৃণমূলের গঠনতন্ত্রের ২০ নম্বর ধারার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। সেই ধারা অনুযায়ী, প্রতি তিন বছর অন্তর জাতীয় কর্মসমিতির বৈঠক ডাকার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কিন্তু ২০২২ সালের পর আর তৃণমূলের কোনও জাতীয় কর্মসমিতির বৈঠক হয়নি। এই কারণ ও যুক্তি দেখিয়ে প্রস্তাব এনে ভেঙে দেওয়া হয় আগের জাতীয় কর্মসমিতি। এরপরই নতুন জাতীয় কর্মসমিতি গঠন করে ঋতব্রতদের ‘তৃণমূল’। সেই কর্মসমিতির চেয়ারম্যান করা হয়েছে মধ্য হাওড়ার বিধায়ক অরূপ রায়কে। এ ছাড়াও বেছে নেওয়া হয়েছে সহ-সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক ও কোষাধ্যক্ষ।
নতুন কমিটির সহ-সভাপতি করা হয়েছে রাজ্যের সাবেক মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাসকে। এ ছাড়া তৃণমূলের আরও দুই বিধায়ক ফিরহাদ হাকিম এবং রথীন ঘোষকে সহ-সভাপতি করা হয়েছে। সাধারণ সম্পাদক পদে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় ছাড়াও বেছে নেওয়া হয়েছে জাভেদ খান, সন্দীপন সাহা ও সাবিনা ইয়াসমিনকে। নতুন কমিটির কোষাধ্যক্ষ করা হয়েছে আখরুজ্জামানকে।
বিধানসভা নির্বাচনে ভরাডুবির পর থেকেই তৃণমূলের অন্দরে বিদ্রোহের শুরু। সূত্রপাত মূলত একটি জাল স্বাক্ষর নিয়ে। বিধানসভায় বিরোধী দলনেতা, উপদলনেতা এবং মুখ্যসচেতক কে হবেন, তা নিয়ে পরিষদীয় নিয়মের জটিলতায় পড়তে হয়েছিল দলটিকে। অভিযোগ ওঠে, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় বিধানসভার স্পিকার রথীন্দ্র বসুর কাছে তৃণমূল বিধায়কদের সই করা যে প্রস্তাবিত চিঠি পাঠিয়েছিলেন, তাতে কয়েক জন বিধায়কের সই ‘জাল’ করা হয়েছিল। সেই অভিযোগ প্রথম প্রকাশ্যে আনেন বিধায়ক ঋতব্রত এবং এন্টালির সন্দীপন। সেই নিয়ে বেশ কয়েক দিন টালবাহানা চলার পর দলের মধ্যে ভাঙন ক্রমশ স্পষ্ট হতে থাকে এবং মমতার হাত থেকে তৃণমূলের রাশ আলগা হতে শুরু করে। প্রথম পর্যায়ে একসঙ্গে ৫৮ জন বিধায়কের সমর্থনে ঋতব্রতকে বিধানসভায় বিরোধী দলনেতা করা হয়।
সেই শুরু; এরপর একে একে ফিরহাদ হাকিমের মতো মমতা-ঘনিষ্ঠেরাও শেষ পর্যন্ত বিদ্রোহ শিবিরে নাম লেখাতে শুরু করেন। শুধু তৃণমূলের পরিষদীয় (বিধানসভা) দলে নয়, বড় ভাঙন ধরে সংসদীয় দলেও। একসঙ্গে লোকসভার ২০ জন সাংসদ তৃণমূল ছাড়েন এবং ন্যাশনালিস্ট সিটিজেন পার্টি অব ইন্ডিয়া নামে একটি রাজনৈতিক দলের হাত ধরেন। অন্যদিকে সুখেন্দুশেখর রায় ও সুস্মিতা দেবের মতো নেতারা রাজ্যসভার সাংসদ পদ থেকে ইস্তফা দেন।