চীনের ‘সালামি স্লাইসিং’ কৌশল কী

মাত্র কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে চীনের জাহাজগুলো মূল ভূখণ্ড থেকে দূরবর্তী অঞ্চলে ‘আইন প্রয়োগকারী’ কার্যক্রম পরিচালনা, একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল সমুদ্রতলদেশ ম্যাপিং এবং ৫০০ মাইলেরও বেশি দূরের বিতর্কিত উপদ্বীপে ‘গবেষণা’ চালিয়েছে। আন্তর্জাতিক আইনে সার্বভৌমত্বের দাবি যেখানে অস্পষ্ট, সেখানে সরাসরি যুদ্ধে না জড়িয়ে ছোট ছোট পদক্ষেপে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করার এই চীনা নীতিকে বিশেষজ্ঞরা ‘সালামি স্লাইসিং’ হিসেবে অভিহিত করছেন।

বিশ্লেষকদের মতে, বেইজিং ও ওয়াশিংটনের মধ্যকার গুরুত্বপূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রেখা ফার্স্ট আইল্যান্ড চেইনে’র বাইরে নিজেদের উপস্থিতি বাড়াতে এবং বিশেষ করে তাইওয়ানকে চাপে ফেলতেই চীনের এই নতুন কৌশল। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বেইজিং সফরের পরপরই এই সামুদ্রিক তৎপরতা শুরু হয়, যেখানে চীনা নেতা শি জিনপিং স্পষ্ট করেছিলেন যে তাইওয়ান ইস্যুই যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্ককে লাইনচ্যুত করতে পারে।

চলতি মাসের শুরুতে চীনের বেসামরিক সংস্থা মেরিটাইম সেফটি এজেন্সি (এমএসএ)-এর তিনটি জাহাজ ফিলিপাইন ও তাইওয়ানের মধ্যবর্তী বাশি চ্যানেল পার হয়ে তাইওয়ানের পূর্ব জলসীমায় ম্যাপিং শুরু করে।

স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটির সিলাইট প্রজেক্টের পরিচালক রে পাওয়েল একে ‘বাশি ব্রেকআউট’ নামে অভিহিত করে বলেন, বেইজিং মূলত এই চেইনের ওপারেও তাদের এখতিয়ার দাবি করছে। এর মাধ্যমে বিতর্কিত ‘৯-ড্যাশ লাইন’ (যা বর্তমানে ১০-ড্যাশ লাইন করা হয়েছে) এর বাইরে চীন প্রথমবারের মতো সার্বভৌমত্ব টহল দিলো।

চীনের রাষ্ট্রীয় ট্যাবলয়েড গ্লোবাল টাইমস একে ‘আইনি ও রাজনৈতিক ইঙ্গিতপূর্ণ সার্বভৌমত্ব ঘোষণা’ বলেছে। চীনের জাতীয় সম্প্রচার মাধ্যমের একটি আধা-সরকারি অ্যাকাউন্ট ইউয়ান তিয়ানতিয়ান জানিয়েছে, এই জলসীমা এখন থেকে চীনের ‘নিকটবর্তী জলসীমা’ হিসেবে গণ্য হবে।

তবে তাইওয়ানের প্রেসিডেন্ট লাই চিং-তে একে বেইজিংয়ের ‘সাম্রাজ্য বিস্তারের নতুন কৌশল’ বলে আখ্যা দিয়েছেন।

বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, সামরিক জাহাজের চেয়ে এমএসএ-এর মতো অসামরিক জাহাজগুলোর নিয়মিত টহল তাইওয়ানের জন্য বড় হুমকি, কারণ এগুলো আপাতদৃষ্টিতে কম বিপজ্জনক মনে হয়। রে পাওয়েল সতর্ক করেন, পরবর্তী ধাপে চীন তাইওয়ানগামী বাণিজ্যিক বা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি)-বাহী জাহাজগুলো আটকে দিয়ে তাইওয়ানের জ্বালানি আমদানি নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের প্যাসিফিক কমান্ডের সাবেক গোয়েন্দা কর্মকর্তা কার্ল শুস্টার জানান, এই সমুদ্রতল ম্যাপিংয়ের ফলে চীনের নৌবাহিনী সাবমেরিন ও টাস্ক গ্রুপ পরিচালনায় সামরিক সুবিধা পাবে এবং সমুদ্রের নিচ দিয়ে ক্যাবলগুলোর সঠিক চিত্র পেয়ে যাবে।

এই ঘটনার পর যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, ফ্রান্স ও জার্মানি গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে একে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও নৌ-চলাচলের স্বাধীনতার জন্য হুমকিস্বরূপ বলে উল্লেখ করেছে।

অন্যদিকে, দক্ষিণ চীন সাগরের স্কারবোরো শোয়াল-এ ফিলিপাইনের বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের ভেতরে চীনের একটি ভাসমান কাঠামো নিয়ে ফিলিপাইন তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে। চীন এটিকে সামুদ্রিক গবেষণা কাঠামো দাবি করে সরিয়ে নিলেও, ফিলিপাইনের প্রতিরক্ষা সচিব গিলবার্ট টিওডোরো আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন যে চীন পূর্বেও এভাবে কৃত্রিম দ্বীপ বানিয়ে সামরিক ঘাঁটি তৈরি করেছিল।

পরিস্থিতি মোকাবিলায় ম্যানিলার মার্কিন দূতাবাস ফিলিপাইনকে ১৩ মিলিয়ন ডলার মূল্যের ৪টি সামুদ্রিক ড্রোন দিয়েছে। রে পাওয়েলের মতে, আন্তর্জাতিক মহলের নিষ্ক্রিয়তার সুযোগ নিয়ে চীন একে একে অঞ্চলগুলো নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নিচ্ছে।

সূত্র: সিএনএন