ট্রাম্পের ইরান যুদ্ধের বলির পাঠা কি জেডি ভ্যান্স

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
২৫ জুন ২০২৬, ১৯:২৩আপডেট : ২৫ জুন ২০২৬, ১৯:২৩

যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স মেয়াদের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন নিজেকে ইরান যুদ্ধবিরতি চুক্তির প্রধান মুখ হিসেবে উপস্থাপন করে। তবে অত্যন্ত নড়বড়ে এই চুক্তিটি এখনই ভেস্তে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। গত ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া ইরান যুদ্ধের কারণে দীর্ঘদিন কোণঠাসা হয়ে থাকার পর, নিজের রাজনৈতিক অবস্থান ফিরে পাওয়ার জন্য ভ্যান্সের সামনে সম্ভবত এটিই এখন শেষ সুযোগ।

চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ট্রাম্প প্রশাসন ইরানে সামরিক অভিযান শুরু করার পর থেকেই জে ডি ভ্যান্সের শিবিরে একধরনের হতাশা নেমে এসেছিল। আগের প্রশাসনগুলোর ‘অনন্তকাল ধরে চলা যুদ্ধ’-এর কড়া সমালোচক ভ্যান্সকে বাধ্য হয়েই মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন প্রজন্মের বৃহত্তম সামরিক হস্তক্ষেপের পক্ষে সাফাই গাইতে হচ্ছিলো।  ইরাকে যুদ্ধকালীন সংবাদকর্মী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন তিনি। জনসমক্ষে মার-এ-লাগোর ‘ওয়ার রুম’ থেকে তাকে বাদ দেওয়া হয়েছিল এবং ইরানের যুদ্ধ পরিকল্পনা থেকে তাকে দূরে রাখা হয়েছে বলেই ধারণা করা হয়।

তবে পর্দার আড়ালে সাংবাদিকরা এই যুদ্ধের প্রতি ভ্যান্সের বিরোধিতার কথা জানতে পারছিলেন। সিনেটে ভ্যান্সের এক সাবেক সহকর্মী বলেন, আমরা দেখতে পাচ্ছিলাম এই যুদ্ধ নিয়ে তিনি তীব্র অস্বস্তিতে ছিলেন। প্রশাসন গঠনে যোগ দেওয়ার সময় তিনি এটি চাননি। কিন্তু ট্রাম্পের সঙ্গে টিকে থাকতে তিনি এই পথ বেছে নেন।

ওই সিনেটর আরও বলেন, ‘তিনি জানতেন এমনটা ঘটতে পারে’।

হোয়াইট সূত্র মতে, এই পরিস্থিতি ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ভ্যান্সের সম্ভাব্য প্রার্থী হওয়াকেও ঝুঁকিতে ফেলে দিয়েছে। যদিও রিপাবলিকান শিবিরে তিনি এখনও পছন্দের তালিকায় এগিয়ে। তবে পররাষ্ট্রনীতির কট্টরপন্থি মার্কো রুবিওর কাছে তিনি কিছুটা অবস্থান হারিয়েছেন। রুবিও নিজেকে একজন দক্ষ শীর্ষ কূটনীতিক ও নিরাপত্তা কর্মকর্তা হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করেছেন।

নব্য-রক্ষণশীলতা এবং বিদেশে মার্কিন হস্তক্ষেপের কড়া সমালোচক আমেরিকান কনজারভেটিভ-এর অ্যান্ড্রু ডে লিখেছেন, অনেক ভোটারের কাছে ভ্যান্স এখন একটি চরম অজনপ্রিয় প্রশাসনের প্রতিনিধিত্ব করছেন, যা স্থবির অর্থনীতি, ভূ-রাজনৈতিক পতন এবং ইরানের সঙ্গে এক বিপর্যয়কর যুদ্ধের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।

তিনি আরও লিখেছেন, ২০২৮ সালে ভ্যান্সের প্রার্থী হওয়াটা যে অবধারিত মনে হচ্ছিলো, তা এখন আর নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। শীর্ষে আসতে হলে ভ্যান্সকে প্রথমে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করতে হবে।

পাকিস্তানি মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে ইরানের সঙ্গে আলোচনার দায়িত্ব নিয়ে ভ্যান্স যে একটি বড় ঝুঁকি নিচ্ছিলেন, তা নিয়ে কারও মনে কোনও সন্দেহ ছিল না। ১৯৭৯ সালের ইরানি বিপ্লব ও কূটনৈতিক সংকটের পর মার্কিন ও ইরানি কর্মকর্তাদের মধ্যে এটাই ছিল সবচেয়ে উচ্চপর্যায়ের দ্বিপাক্ষিক আলোচনা।

চুক্তির শর্তগুলো যখন জনসমক্ষে আসে, তখন ইরানকে নিষেধাজ্ঞা থেকে অব্যাহতি ও অবরুদ্ধ সম্পদ ফিরিয়ে দেওয়ার মতো কিছু সুবিধা দেওয়ার প্রস্তাব ভ্যান্সের ওপরই বর্তায়। এর ফলে তিনি নিজের দলেরই কট্টরপন্থি এবং ইসরায়েলপন্থি সদস্যদের নিশানায় পরিণত হন। সমালোচকরা বলছেন, ইরানের প্রতিশ্রুতির ওপর ভ্যান্স বড্ড বেশি অন্ধবিশ্বাস দেখিয়েছেন।

সবচেয়ে খারাপ বিষয় হলো, হোয়াইট হাউস নিজেই বারবার তার অবস্থানকে দুর্বল করেছে। আলোচনা চলাকালেই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইরানে পুনরায় হামলা চালানো এবং এমনকি ইরানি আলোচকদের হত্যার হুমকি দিয়ে বসেন। বরাবরের মতোই ভ্যান্স ট্রাম্পের এই রুক্ষ আচরণকে সামাল দেওয়ার চেষ্টা করে বলেন, ‘আমরা গতকাল ইরানিদের বলেছি যে আপনারা যখন এমন আজেবাজে কথা বলবেন, তখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট তার জবাব দেবেন না বা সত্যটা তুলে ধরবেন না, এমনটা আশা করতে পারেন না।’

তারপরেও, এই প্রায় অসম্ভব ইরান চুক্তিটিকে এগিয়ে নেওয়ার মাধ্যমে ভ্যান্স বর্তমান প্রশাসনে প্রথমবারের মতো নিজস্ব কোনও উদ্যোগ নিয়েছেন। এর মাধ্যমে তিনি যেমন যুদ্ধ শেষ করতে চান, তেমনি আগামী নির্বাচনের আগে যুদ্ধবিরোধী প্রার্থী হিসেবে নিজের ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধার করতে চান।

গত প্রায় এক সপ্তাহ ধরে ভ্যান্স টেলিভিশন চ্যানেলগুলোতে এই ইরান চুক্তি এবং ট্রাম্পের অন্যান্য বিতর্কিত নীতিগুলো মার্কিন জনগণের কাছে তুলে ধরার চেষ্টা করছেন। দ্য ভিউ অনুষ্ঠানে উইপি গোল্ডবার্গ এবং জয় বেহারের মতো উপস্থাপকদের তীব্র কটাক্ষের মুখোমুখি হতে হয়েছে তাকে। একপর্যায়ে জয় বেহার ভ্যান্সকে উদ্দেশ্য করে বলেই বসেন, ‘আপনি কি তার (ট্রাম্পের) দোভাষী নাকি ভাইস প্রেসিডেন্ট? দয়া করে স্পষ্ট করুন।’

নিউ ইয়র্ক টাইমসের রস ডাউথ্যাটের সঙ্গে আলাপকালে ভ্যান্স মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলের পররাষ্ট্রনীতির এক অস্বাভাবিক সমালোচনা করেন। ইরান সফরের বিষয়ে কট্টরপন্থি ইসরায়েলি রাজনীতিকদের সমালোচনার জবাবে ভ্যান্স বলেন, ‘আপনাদের সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবটা কী? আপনারা ৯০ লাখের একটি দেশ। আপনাদের প্রতিটি জাতীয় নিরাপত্তা সমস্যার সমাধান কেবলই মানুষ হত্যার মাধ্যমে হতে পারে না।

ভ্যান্সের জন্য এখন এই সিদ্ধান্তের ফলাফল অনেক গুরুত্বপূর্ণ। হোয়াইট হাউস আবারও স্পষ্ট করে দিয়েছে যে তারা নীতি নির্ধারণের ক্ষেত্রে নমনীয় হলেও ব্যর্থতা মোটেও বরদাশত করবে না।

এই শান্তি চুক্তি নিয়ে ট্রাম্প স্পষ্ট করে বলেছেন, ‘যদি এটি সফল হয়, তবে সব কৃতিত্ব আমি নেব। আর যদি এটি কাজ না করে, তবে আমি জে ডি-কে (ভ্যান্স) দোষারোপ করব।’

ঠিক এক বছর আগে মার্কো রুবিওকে নিয়েও ট্রাম্প একই রকম একটি কৌতুক করেছিলেন। তখন রুবিওকে ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য বহিরাগত মনে হলেও, এখন সেই তপ্ত চেয়ারে বসে আছেন খোদ জে ডি ভ্যান্স।

সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান

/এএ/
সম্পর্কিত
কাজ না করে আয় করাই এখন নতুন ‘আমেরিকান স্বপ্ন’
অটিস্টিক শিশুকে ধর্ষণের দায়ে ব্রিটিশ-বাংলাদেশি তরুণের কারাদণ্ড
দিনের গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক খবর
সর্বশেষ খবর
খুচরা বিক্রেতাদের ওপর ০.২ শতাংশ অগ্রিম কর প্রত্যাহারের দাবি
খুচরা বিক্রেতাদের ওপর ০.২ শতাংশ অগ্রিম কর প্রত্যাহারের দাবি
মা ও তিন মেয়েকে কুপিয়ে হত্যার রহস্য কী, যা বললেন প্রতিবেশীরা
মা ও তিন মেয়েকে কুপিয়ে হত্যার রহস্য কী, যা বললেন প্রতিবেশীরা
মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মানী ভাতা বৃদ্ধির দাবি সংসদে
মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মানী ভাতা বৃদ্ধির দাবি সংসদে
দেশে মাদকাসক্ত প্রায় ৮২ লাখ, ঢাকাতেই পেন্ডিং ৮০ হাজার মামলা
আন্তর্জাতিক মাদকবিরোধী দিবস আজদেশে মাদকাসক্ত প্রায় ৮২ লাখ, ঢাকাতেই পেন্ডিং ৮০ হাজার মামলা
সর্বাধিক পঠিত
বিদ্যুৎস্পৃষ্টে বাবা, ঘাতকের হাতে মা ও তিন মেয়ের মৃত্যুতে শেষ একটি পরিবার
লক্ষ্মীপুরে বাসায় ঢুকে কুপিয়ে হত্যাবিদ্যুৎস্পৃষ্টে বাবা, ঘাতকের হাতে মা ও তিন মেয়ের মৃত্যুতে শেষ একটি পরিবার
তীব্র গরমেও ইউরোপে কেন এসি এত বিরল
তীব্র গরমেও ইউরোপে কেন এসি এত বিরল
বিএসএফের ২১ ঘণ্টার চেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়ে প্রশংসায় ভাসছে বিজিবি 
বিএসএফের ২১ ঘণ্টার চেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়ে প্রশংসায় ভাসছে বিজিবি 
নতুন নিয়মে ভারতের ট্যুরিস্ট ভিসা আবেদন কীভাবে করবেন
নতুন নিয়মে ভারতের ট্যুরিস্ট ভিসা আবেদন কীভাবে করবেন
তিন গ্রুপের খেলা শেষ, দ্বিতীয় রাউন্ডে কোন দল কার মুখোমুখি হচ্ছে
তিন গ্রুপের খেলা শেষ, দ্বিতীয় রাউন্ডে কোন দল কার মুখোমুখি হচ্ছে