ব্রিটিশ ভারতে যে রেলপথ তৈরিতে ঝরেছিল ২৪ হাজার প্রাণ

উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের কাছে তুলার গুরুত্ব ছিল অপরিসীম, যা ‘সাদা স্বর্ণ’ নামে পরিচিত ছিল। মুম্বাই থেকে সোলাপুর ও নাগপুরের মতো সুতি উৎপাদনকারী ডেকান মালভূমি অঞ্চলে সরাসরি যাতায়াতের একমাত্র বড় বাধা ছিল সহ্যাদ্রি পর্বতমালা বা ভোর ঘাট। পথটি সুগম করতে এবং মুম্বাইয়ের সঙ্গে পুনে, কলকাতা, মাদ্রাজ ও দিল্লির সরাসরি যোগাযোগ স্থাপন করতে এক অসম্ভব রেলপথ নির্মাণের পরিকল্পনা করে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি।

১৮৫২ সালে দ্য গ্রেট ইন্ডিয়ান পেনিনসুলার রেলওয়ের চিফ রেসিডেন্ট ইঞ্জিনিয়ার জেমস জন বার্কলে ৪ বছর ধরে জরিপ চালিয়ে ৩ হাজার মানচিত্র তৈরি করে ভোর ঘাটের পথটি চূড়ান্ত করেন। প্রকল্পটির পরিধি ছিল বিশাল। ২৫টি সুড়ঙ্গ, ৮টি খিলানযুক্ত ভায়াডাক্ট এবং হাত দিয়ে প্রায় ৫ কোটি ৪০ লাখ ঘনফুট পাথর কাটার কাজ।

১৮৫৬ সালের জানুয়ারিতে শুরু হওয়া এই কাজ সম্পন্ন করতে গিয়ে অসুস্থ হয়ে ইংল্যান্ডে ফেরেন বার্কলে। পরবর্তীতে ঠিকাদার উইলিয়াম ফ্যাভিয়েল ও শ্রমিকদের ওপর তার অমানবিক আচরণের খবর উঠে আসে। ২৫ হাজার থেকে ৪২ হাজার শ্রমিক খোলা হাতে ও সাধারণ সরঞ্জাম নিয়ে এই খাড়া পাহাড়ে কাজ করেছেন। এদের মধ্যে নারী ও শিশুও ছিল।

ম্যালেরিয়া, কলেরা, খাড়া পাহাড়ে দড়ি দিয়ে ঝুলে কাজ করার সময় পড়ে যাওয়া এবং বিস্ফোরণের মতো দুর্ঘটনায় প্রকল্পের প্রায় আট বছরে আনুমানিক ২৪ হাজার শ্রমিকের মৃত্যু হয়। ১৮৫৯ সালে মাসের পর মাস বকেয়া মজুরি না দিয়ে তা অর্ধেক করার সিদ্ধান্তে শ্রমিকদের সঙ্গে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হয়, যাতে মিস্টার কারেন নামের এক ব্রিটিশ পরিদর্শক গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান।

পরে দায়িত্ব নেওয়া ঠিকাদার সলোমন ট্রেডওয়েলও কলেরায় মারা যান এবং তার স্ত্রী অ্যালিস ট্রেডওয়েল প্রকল্পের দায়িত্ব নেন। অবশেষে ১৮৬৩ সালের এপ্রিলে রেলপথের নির্মাণ শেষ হয় এবং বোম্বাইয়ের গভর্নর স্যার বার্টল ফ্রেরে এটিকে ভারতের ‘রেল যুগের সূচনা’ বলে ঘোষণা করেন। কিন্তু যাদের রক্ত ও ঘামে এটি তৈরি হয়েছিল, সেই হাজার হাজার ভারতীয় শ্রমিকের কথা ইতিহাসের পাতায় অনুল্লেখিতই থেকে যায়।

সূত্র: ইন্ডিয়া টুডে