বানরের দাপটে দিশেহারা নেপালের কৃষকরা

নেপালে কৃষকদের জন্য সবচেয়ে স্থায়ী ও ধ্বংসাত্মক শত্রুদের অন্যতম হয়ে উঠেছে বানর। ফসল রক্ষায় প্রতিদিন ভোরে গ্রামীণ এলাকায় মানুষ স্লিংশট, লাঠি ও ঘরোয়া শব্দকামান নিয়ে মাঠে পাহারা দিচ্ছেন। কেউ সঙ্গে নিচ্ছেন কুকুর, আবার কেউ জঙ্গলের দিকে চিৎকার করে বানরের দল তাড়ানোর চেষ্টা করছেন। তাদের লক্ষ্য, মুহূর্তের মধ্যে ফসল নষ্ট করে দেওয়া বানরের দলকে ঠেকানো।

প্রতিদিনের এই চিত্র নেপালের গ্রামাঞ্চলে ক্রমবর্ধমান সংকটের প্রতিফলন। কৃষকদের অভিযোগ, বছরের পর বছর নানা চেষ্টা করেও আক্রমণাত্মক বানরের উৎপাত ঠেকানো যায়নি। এতে তাদের জীবিকা বড় ধরনের হুমকির মুখে পড়েছে। একই সঙ্গে গ্রাম থেকে শহর ও বিদেশে মানুষের চলে যাওয়ায় কৃষিকাজ ও জমি রক্ষার জন্য পর্যাপ্ত লোকও থাকছে না।

বানর তাড়াতে গ্রামবাসীরা স্লিংশট, পাথর, লেজার আলো, কুকুর ও ঘরোয়া শব্দকামানসহ নানা পদ্ধতি ব্যবহার করেছেন। গত মাসে পূর্ব নেপালের একটি গ্রামীণ পৌরসভা শত শত বাসিন্দাকে নিয়ে বানরের দলকে জঙ্গলে তাড়াতে তিন দিনের জন্য স্কুল ও সরকারি কার্যালয় বন্ধ রাখে। তবে কয়েক দিনের মধ্যেই বানরগুলো আবার ফিরে আসে।

বানরের হাত থেকে ফসল পাহারা দেওয়ার সময় এক কৃষক গুলতি ব্যবহার করছেন। ছবি: এপি

পূর্ব নেপালের আইনপ্রণেতা ধুর্বা রাই বলেন, প্রায় এক দশক আগে সরকার গ্রামবাসীদের আগ্নেয়াস্ত্র জব্দ করার পর থেকে সমস্যা আরও বেড়েছে। মাওবাদী বিদ্রোহের সময় দীর্ঘদিন ধরে এসব অস্ত্র দিয়ে মানুষ ফসল ও গবাদিপশু রক্ষা করতেন। তার দাবি, সেই প্রতিরোধ না থাকায় বানরগুলো আরও সাহসী হয়ে উঠেছে।

বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ এবং গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর টিকে থাকার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা নিয়ে দেশটির পার্লামেন্টেও বিষয়টি রাজনৈতিক ইস্যুতে পরিণত হয়েছে।

৭১ বছর বয়সী দেবাকা কার্কির কাছে এসব বিতর্ক দূরের বিষয়। তিনি প্রায় প্রতিদিনই নিজের ছোট জমিতে দাঁড়িয়ে আশপাশের গাছপালার দিকে নজর রাখেন। সম্প্রতি একদিন গরম পানি ভরতে কয়েক মিনিটের জন্য মাঠ ছেড়ে যান তিনি। ফিরে এসে দেখেন, বানরের একটি দল তার কয়েক মাসের পরিশ্রমে ফলানো ফসল নষ্ট করে দিয়েছে।

তার ছেলেরা কাজের জন্য কাঠমান্ডুতে চলে যাওয়ায় তিনি ও তার স্বামী একাই কৃষিকাজ সামলাচ্ছেন। গ্রামে তরুণ মানুষের সংখ্যা কমে যাওয়ায় বানর তাড়ানোর মতো সহায়তাও মিলছে না।

ফসল পাহারা দেওয়ার সময় বানরের আক্রমণের শিকার হওয়া একজন তার শরীরে বানরের কামড়ের দাগ দেখাচ্ছেন। ছবি: এপি

দোলাখা জেলার ধর্মঘর গ্রামে ২০১৭ সালে জনসংখ্যা ছিল প্রায় ৮০০। বর্তমানে তা নেমে এসেছে প্রায় ১৫০ জনে। স্থানীয় কমিউনিটি ফরেস্টের প্রধান গণেশ কার্কি জানান, গ্রামের প্রায় ২১০টি পরিবারের মধ্যে এখন মাত্র অর্ধেক বসবাস করছে। বাকিরা শহর কিংবা বিদেশে চলে গেছেন। তিনি জানান, পরিত্যক্ত বাড়িঘর ও কৃষিজমি বানরের বিস্তারের সুযোগ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

৭৩ বছর বয়সী কৃষ্ণ বাহাদুর খাডকা গত বছর একদল বানরের হামলার শিকার হন। বানরগুলো তাকে মাটিতে ফেলে দেয়, পিঠে কামড় দেয় এবং প্রায় চার মাস তাকে শয্যাশায়ী থাকতে হয়। সেই হামলার ধকল তিনি এখনও পুরোপুরি কাটিয়ে উঠতে পারেননি। তিনি বলেন, সৌভাগ্যবশত অন্য লোকজন এসে বানরগুলোকে তাড়িয়ে দেয়। না হলে কী হতো, আমি জানি না।

সূত্র: এপি