নোয়াখালী থেকে শ্রীনগর: ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট কী করছিলেন গান্ধী, নেহেরু, জিন্নাহ ও ফয়েজ

১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট। ভারতবর্ষের ইতিহাসে দিনটি এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছিল। ব্রিটিশ শাসনের অবসান, ভারত ও পাকিস্তান নামে দুটি নতুন রাষ্ট্রের জন্ম; সব মিলিয়ে দিনটি ছিল ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ। কিন্তু সেই দিন সবাই ছিলেন না দিল্লিতে। কেউ ছিলেন সাম্প্রদায়িক সহিংসতায় ক্ষতবিক্ষত এলাকায়, কেউ নতুন রাষ্ট্রের রাজধানীতে, আবার কেউ ছিলেন কাশ্মীরের রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে।

ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভিতে লেখা এক কলামে ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্টের এমনই ভিন্ন ভিন্ন অবস্থানের কথা তুলে ধরেছেন ভারতের লেখক ও কলামিস্ট রাশেদ কিরওয়াই। তার লেখার শিরোনাম, ‘নোয়াখালী থেকে শ্রীনগর: ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট কী করছিলেন গান্ধী, নেহরু, জিন্নাহ ও ফয়েজ’।

স্বাধীনতার সেই দিনে মহাত্মা গান্ধীর অবস্থান ছিল নোয়াখালীতে। দেশভাগের সময় সাম্প্রদায়িক সহিংসতায় বিপর্যস্ত মানুষের পাশে থাকতে তিনি সেখানে ছিলেন। অন্যদিকে জওহরলাল নেহরু ছিলেন দিল্লিতে, যেখানে ভারতের স্বাধীনতার আনুষ্ঠানিকতা ও উদযাপন চলছিল।

পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ ছিলেন নতুন রাষ্ট্র পাকিস্তানে। আর কবি ফয়েজ আহমদ ফয়েজের অবস্থানও ছিল সেই সময়ের রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত।

১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্টের এই ভিন্ন ভিন্ন অবস্থান শুধু চারজন ব্যক্তির আলাদা আলাদা কর্মসূচির গল্প নয়। এটি দেশভাগের সময়কার ভারতীয় উপমহাদেশের বহুমাত্রিক বাস্তবতারও একটি চিত্র। একদিকে স্বাধীনতার আনন্দ, অন্যদিকে সাম্প্রদায়িক সহিংসতা ও বাস্তুচ্যুত মানুষের দুর্ভোগ, একই সময়ে পাশাপাশি চলছিল দুই বিপরীত অভিজ্ঞতা।

রাশেদ কিরওয়াইয়ের ওই কলাম সেই দিনের ঘটনাগুলোকে চার ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বের অবস্থান ও কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে দেখার চেষ্টা করেছে।

দিল্লিতে নেহেরু

১৯৪৭ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ক্লিমেন্ট অ্যাটলি ঘোষণা করেছিলেন যে ব্রিটিশরা ভারত ত্যাগ করবে। পরবর্তীতে ৩ জুন ভাইসরয় লর্ড লুয়িস মাউন্টব্যাটেন মাত্র ৭২ দিনের মধ্যে ক্ষমতা হস্তান্তরের পরিকল্পনা প্রকাশ করেন। এতে উপমহাদেশের বিভাজন, সেনাবাহিনী, সিভিল সার্ভিস, রেলওয়ে, পুলিশ ও ডাক ব্যবস্থা ভাগ করা থেকে শুরু করে অফিসের আসবাবপত্র পর্যন্ত সম্পত্তি বণ্টনের বিশাল দায়িত্ব অন্তর্ভুক্ত ছিল। এই কাজ সময়মতো শেষ করতে মাউন্টব্যাটেনের টেবিলে একটি দিনপঞ্জিকা রাখা ছিল, যেখানে আর কত দিন বাকি তা লেখা থাকত।

১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট মধ্যরাতে ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরু পার্লামেন্টে তার ঐতিহাসিক ভাষণ দেন। তিনি বলেন, বহুদিন আগে আমরা নিয়তির সঙ্গে এক চুক্তি করেছিলাম, আর এখন সময় এসেছে আমাদের সেই অঙ্গীকার পূরণের...।

এই স্মারক ভাষণের কয়েক মিনিট পর নেহেরু ভাইসরয়ের প্রাসাদে (বর্তমান রাষ্ট্রপতি ভবন) যান এবং স্বাধীন ভারতের গভর্নর-জেনারেল হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের জন্য মাউন্টব্যাটেনকে আনুষ্ঠানিকভাবে আমন্ত্রণ জানান। তিনি তার হাতে মন্ত্রী পরিষদের তালিকা সম্বলিত একটি খাম তুলে দেন। কিন্তু স্বাধীনতার উত্তেজনায় হয়তো কেউ ভেতরের তালিকা ছাড়াই খামটি সিল করে ফেলেছিলেন।

মাউন্টব্যাটেনের জন্য এক শুভ দিন

কয়েকজন জ্যোতিষী ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্টকে অশুভ বিবেচনা করলেও মাউন্টব্যাটেনের জন্য এটি ছিল এক অবিস্মরণীয় দিন। ১৯৪৫ সালের ১৫ আগস্ট জাপানি সেনাবাহিনী আত্মসমর্পণ করেছিল, যখন মাউন্টব্যাটেন সম্মিলিত যৌথ বাহিনীর সুপ্রিম কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। সেই দিনটি জাপান বিজয় দিবস হিসেবে পরিচিত।

অন্যদিকে, ১৪ আগস্ট জন্ম নেয় প্রতিবেশী রাষ্ট্র পাকিস্তান। দিনটি ছিল রমজান মাসের ২৬তম দিন। নবগঠিত ইসলামি রাষ্ট্রের বহু মানুষ যখন রোজা রাখছিলেন, তখন মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ লর্ড মাউন্টব্যাটেনের জন্য এক মধ্যাহ্নভোজের আয়োজন করেছিলেন। মজার বিষয় হলো, আইনগতভাবে পাকিস্তানেরও ১৫ আগস্ট আত্মপ্রকাশ করার কথা ছিল। ১৯৪৭ সালের ১৮ জুলাই ব্রিটিশ পার্লামেন্টে পাস হওয়া ইন্ডিয়ান ইন্ডিপেন্ডেন্স অ্যাক্ট-এ স্পষ্ট লেখা ছিল, নাইনটিন হান্ড্রেড অ্যান্ড ফোরটি সেভেনের ১৫ আগস্ট থেকে ভারতে দুটি স্বাধীন ডোমিনিয়ন প্রতিষ্ঠা করা হবে, যা যথাক্রমে ভারত ও পাকিস্তান নামে পরিচিত হবে।

আইনগতভাবে পাকিস্তানের জন্ম ১৫ আগস্ট হওয়ার কথা থাকলেও, মাউন্টব্যাটেনকে করাচি থেকে নয়াদিল্লি ভ্রমণ করতে হয়েছিল বলে ১৪ আগস্টকে অফিসিয়াল তারিখ হিসেবে গ্রহণ করা হয়।

নোয়াখালীর মাঠে মহাত্মা গান্ধী

দেশ যখন স্বাধীনতার আনন্দে ভাসছে, তখন মহাত্মা গান্ধী জ্বলতে থাকা বাংলায়। দাঙ্গার উত্তপ্ত পরিস্থিতির মধ্যে তিনি নোয়াখালী জেলার এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রামে খালি পায়ে হেঁটে বেড়াচ্ছেন এবং মানুষকে একে অপরকে হত্যা না করার শপথ করাচ্ছেন। পবিত্র ধর্মগ্রন্থ হাতে নিয়ে তিনি হিন্দু ও মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের কাছে শান্তির আবেদন জানাচ্ছিলেন।

একটি হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটেছিল নোয়াখালীর এক গ্রামে। গান্ধী স্থানীয় হিন্দু ও মুসলমানদের এক সঙ্গে এসে একটি সাধারণ প্রার্থনা ও শান্তির শপথ নেওয়ার আহ্বান জানান। কিন্তু আধা ঘণ্টা অপেক্ষা করার পরও কেউ ঘর থেকে বের হয়নি। তখন তিনি এক অভিনব উপায় বের করলেন। তিনি বল হাতে কিছু ছোট শিশুদের কাছে গিয়ে বললেন, ‘এই গ্রামের ছোট বাচ্চারা, তোমাদের বাবা-মায়েরা একে অপরকে ভয় পাচ্ছে, কিন্তু তোমাদের ভয় কিসের? বয়স্ক হিন্দু-মুসলিমরা একে অপরকে ভয় পেতে পারে। কিন্তু শিশুরা নিষ্পাপ, তোমরা তো ঈশ্বরের সন্তান। আমি তোমাদের বল খেলার জন্য আমন্ত্রণ জানাচ্ছি।’ শিশুদের সঙ্গে আধা ঘণ্টা খেলার পর তিনি গ্রামবাসীদের উদ্দেশে বলেন, ‘তোমাদের সাহস নেই, কিন্তু যদি সেই সাহস পেতে চাও, তবে তা তোমাদের শিশুদের থেকে শিক্ষা নাও।’

কিংসওয়ে হাসপাতালে সফর

পরবর্তীতে গান্ধী যখন দিল্লিতে ফেরেন, তখন জানতে পারেন যে তার অনুগামী সুভদ্রা জোশী সাম্প্রদায়িক সহিংসতায় আহত হয়ে কিংসওয়ে হাসপাতালে ভর্তি। তিনি তাকে দেখতে হাসপাতালে যান এবং দিল্লিতে দাঙ্গায় কতজন নিরপরাধ মানুষের জীবন গেছে তা জানতে চান। সুভদ্রা যখন অনুমান করে বলেন যে সংখ্যাটি এক হাজারের বেশি হতে পারে, তখন গান্ধীজি জিজ্ঞেস করেন যে এতে কোনও কংগ্রেস কর্মী আছেন কি না।

সুভদ্রা যখন উত্তর দেন ‘কেউ নেই’, তখন গান্ধী ব্যথিত ও হতাশ হন। তিনি ভেবে পাননি যে সুভদ্রা বা অন্য কংগ্রেস কর্মীরা সত সত্যি নিরপরাধ মানুষদের বাঁচানোর চেষ্টা করেছিলেন কি না। সুভদ্রা যখন যুক্তি দেন যে তারা সহিংসতা থামানোর চেষ্টা করলেও পুলিশ শোনেনি, তখন গান্ধীজি ক্ষুব্ধ হয়ে উত্তর দেন, ‘আমি এসব কী শুনছি! তোমরা ব্রিটিশদের গুলির মুখোমুখি হয়েছ আর এখন বলছ নিজেদের পুলিশ সামলাতে পারছ না?’

সিভিল সার্ভিস কর্মকর্তা ও লেখক এস এস গিল তার ‘দ্য ডাইনেস্টি’ গ্রন্থে ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্টকে একটি ‘ধূসর ভোর’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। কবি ফয়েজ আহমদ ফয়েজ ১৫ আগস্ট শ্রীনগরে অবস্থান করছিলেন। স্বাধীনতার সেই ভোর নিয়ে তার বিখ্যাত কবিতা ‘সুবহে আজাদি’তে (স্বাধীনতার ভোর) তিনি লিখেছিলেন,

“কলঙ্কিত এই আলো, রাত-কামড়ানো এই ভোর-

যার অপেক্ষায় ছিলাম আমরা, এটি সেই ভোর নয়।

এটি সেই ভোর নয়, যার আশায়

বুক ভরা আশা নিয়ে আমরা বেরিয়েছিলাম যে

কোথাও না কোথাও দেখা মিলবেই;

আকাশের প্রান্তরে তারাদের শেষ গন্তব্য,

নিশি-ক্লান্ত ঢেউগুলোর কোথাও না কোথাও তো তীর মিলবে,

কোথাও না কোথাও গিয়ে থামবে আমাদের হৃদয়ের দুঃখের তরী।”