যুক্তরাষ্ট্রকে টেক্কা দেওয়া চীনের এআই ‘মাস্টারমাইন্ড’ কারা

এক দশক আগেও কম্পিউটার বিজ্ঞানী টাং জি এবং তার ছাত্র ইয়াং ঝিলিনের চোখে স্বপ্ন ছিল মানুষের মতো চিন্তা করতে পারা একটি যন্ত্র তৈরি করা। আজ ৪৯ বছর বয়সী অধ্যাপক টাং জি (জি.এআই-এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা) এবং তার সাবেক ছাত্র ইয়াং ঝিলিন (মুংশট এআই-এর কর্ণধার) চীনের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) জগতের দুই পরাশক্তি। তাদের একেকটি প্রতিষ্ঠানের মূল্য আজ শতকোটি ডলার। চীনের এই অভাবনীয় উত্থান দেখে স্বয়ং সিলিকন ভ্যালি ও ওয়াশিংটনও এখন শঙ্কিত।

যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের মতে, চীনের সেরা এআই মডেলগুলোর সক্ষমতা বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ মডেলগুলোর থেকে মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে রয়েছে। সম্প্রতি জি.এআই তাদের সর্বশেষ ‘জিএলএম-৫.৩’ মডেল উন্মোচন করে দাবি করেছে, এটি সাইবার নিরাপত্তার ক্ষেত্রে মার্কিন প্রতিষ্ঠান অ্যানথ্রোপিকের মডেলাকে টেক্কা দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। এমনকি ইলন মাস্ক চলতি বছরে পূর্বাভাস দিয়েছিলেন যে ২০২৭ সালের আগে চীন যুক্তরাষ্ট্রের সমকক্ষ হতে পারবে না; যার জবাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ টাং চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে বলেছিলেন, ‘এত সময় লাগবে না’।

যেভাবে এলো এই সাফল্য

চীনের এই এআই বিপ্লব রাতারাতি ঘটেনি। এর পেছনে রয়েছে সুদীর্ঘ পঁচিশ বছরের পথচলা, যার অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু ছিল বেইজিংয়ের ঐতিহ্যবাহী ত্সিংহুয়া বিশ্ববিদ্যালয়। ২০০৫ সালে প্রখ্যাত কম্পিউটার বিজ্ঞানী অ্যান্ড্রু ইয়ো ত্সিংহুয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে শীর্ষ মেধা তৈরির জন্য ‘ইয়ো ক্লাস’ চালু করেন। টাং ও ইয়াং উভয়েই এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উঠে এসেছেন। এছাড়া সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা এবং বেসরকারি প্রতিযোগিতার এক অনন্য মিশ্রণ চীনকে দ্রুত এগিয়ে নিয়েছে। চলতি বছরের প্রথমার্ধেই চীনের ইক্যুইটি-ক্যাপিটাল বিনিয়োগের প্রায় অর্ধেকই গেছে এআই খাতে, যার বড় অংশই এসেছে সরকারি তহবিল থেকে।

কম খরচে সেরা সাফল্য

আমেরিকান চিপ বিক্রির ওপর নিষেধাজ্ঞা এবং তুলনামূলক কম তহবিলের মুখোমুখি হয়েও চতুর কৌশল অবলম্বন করেছেন চীনা উদ্ভাবকেরা। এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত উদাহরণ ডিপসিক-এর প্রতিষ্ঠাতা লিয়াং ওয়েনফেং। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ডিপসিক একটি সাশ্রয়ী ও শক্তিশালী ওপেন-সোর্স মডেল ছেড়ে মার্কিন শেয়ারবাজারে তোলপাড় ফেলে দিয়েছিল, যাকে বলা হয় ‘ডিপসিক শক’। তাদের উদ্ভাবিত এমএলএ টেকনোলজি এবং মিক্সচার অব এক্সপার্টস ডিজাইন কম্পিউটার মেমোরি ও চিপ ব্যবহারের খরচ নাটকীয়ভাবে কমিয়ে আনে।

তবে বিতর্কের ঊর্ধ্বেও ছিল না এই অগ্রগতি। যুক্তরাষ্ট্রের মডেলে লাখ লাখ প্রশ্ন জিজ্ঞেস করে উত্তর বিশ্লেষণের মাধ্যমে নিজেদের মডেলকে দ্রুত প্রশিক্ষণ করার অভিযোগ উঠেছে চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে। অ্যানথ্রোপিক এই অভিযোগ তুললেও চীনা ডেভলপারদের মতে, এই প্রক্রিয়া বিশ্বজুড়েই ব্যবহৃত হয়।

ভবিষ্যতের লড়াই

কম চিপ ও কম পুঁজি থাকা সত্ত্বেও চীনা ডেভেলপাররা তাদের সক্ষমতার চরম সীমানায় গিয়ে কাজ করছেন। এআই স্টার্টআপ হিসেবে জি.এআই চলতি বছরে হংকং স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত হয়ে বার্ষিক ১০০ কোটি ডলারের রাজস্ব আয়ের ঘরে পৌঁছেছে।

টাং জি এখন এমন এক ফ্ল্যাগশিপ মডেল তৈরির কাজ করছেন, যা সপ্তাহে পর সপ্তাহ ধরে চলা জটিল গবেষণার কাজ একাই সম্পন্ন করতে পারবে। জুলাই মাসে কর্মীদের উদ্দেশ্যে পাঠানো এক চিঠিতে টাং লিখেছেন, প্রযুক্তির সীমানাকে যিনি প্রথম এক ইঞ্চি হলেও প্রসারিত করতে পারবেন, তিনিই প্রতিটি শিল্পের নতুন ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবেন।

সূত্র: ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল