কী, কেন, কীভাবে

নেপালে ফের বন্যার আতঙ্ক: রুদ্ধ হ্রদ কী এবং এটি ভাঙলে কতটা ভয়াবহ হতে পারে

হিমালয় সীমান্ত অঞ্চলে শত শত মানুষের প্রাণহানির পর এবার নেপাল ও তিব্বত সীমান্তে সৃষ্টি হওয়া একটি বিশাল রুদ্ধ হ্রদ ভেঙে গিয়ে দ্বিতীয় দফায় প্রলয়ঙ্করী বন্যার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। তিব্বত অংশে ছুচেন ও পুরেপু সাংপো নদীর সঙ্গমস্থলে পাহাড় ধসে বরফ ও পাথরের স্তূপ জমে নদীর প্রবাহ আটকে এই কৃত্রিম হ্রদটি তৈরি হয়।

শুক্রবার নেপাল পুলিশের এক সতর্কবার্তায় জানানো হয়, তিব্বত অংশের এই রুদ্ধ হ্রদ বা প্রাকৃতিক বাঁধটি ইতোমধ্যে ভেঙে গেছে। এর আগে চীন ও নেপাল উভয় দেশই এটি ভেঙে নিম্নাঞ্চলে দ্বিতীয় দফায় প্লাবনের সতর্কতা জারি করেছিল। সিসিটিভির তথ্য অনুযায়ী, হ্রদে ইতোমধ্যে ২০ লাখ ঘনমিটার পানি জমা হয়েছে এবং পরবর্তী তিন দিনে আরও ৩০ লাখ ঘনমিটার পানি প্রবেশের কথা বলা হয়েছিল, যা বাঁধ ভাঙার চরম ঝুঁকি তৈরি করে।

রুদ্ধ হ্রদ কী?

মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থার মতে, যখন ভূমিধস বা তুষারধসের কাদা-মাটি ও পাথরের ধ্বংসাবশেষ নদীর স্বাভাবিক প্রবাহকে পুরোপুরি অবরুদ্ধ করে দেয়, তখন উপত্যকায় যে অস্থায়ী হ্রদ তৈরি হয় তাকেই রুদ্ধ হ্রদ বলে। ভূমিকম্প ও অতিরিক্ত বৃষ্টিপাতই এর প্রধান কারণ।

এ ধরনের অস্থায়ী হ্রদে পানি বের হওয়ার কোনও পথ না থাকায় বিপুল পরিমাণ পানি জমতে থাকে। পরে পানি উপচে বা বাঁধ ভেঙে যে ধ্বংসাত্মক বন্যার সৃষ্টি হয় তাকে বৈজ্ঞানিক ভাষায় ল্যান্ডস্লাইড লেক আউটবার্স্ট ফ্লাড বলা হয়। এটি হিমবাহ হ্রদ ফেটে যাওয়া বন্যার মতোই বিধ্বংসী। একটি বাঁধ ভাঙতে কয়েক দিন থেকে শুরু করে দশক পার হতে পারে। যেমন, কিরগিজস্তানের একটি বাঁধ ভাঙতে ১৩১ বছর লেগেছিল, আবার ১৭৮৬ সালে চীনের প্রলয়ঙ্করী ঘটনার সময় মাত্র ১০ দিন সময় লেগেছিল।

২০১৭ সালের একটি গবেষণা অনুযায়ী, হিমালয়ের মতো খাড়া পাহাড় ও অপ্রশস্ত নদী উপত্যকাযুক্ত অঞ্চলগুলো এ ধরনের দুর্যোগের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক।

বাঁধ ভাঙলে ক্ষতির মাত্রা কতটা ভয়াবহ হতে পারে?

হ্রদের বাঁধ ভেঙে গেলে খুব অল্প সময়ে লাখ লাখ ঘনমিটার পানি প্রবল বেগে নিচের দিকে নেমে আসে, যা নদী অববাহিকায় প্রলয়ঙ্করী বন্যা সৃষ্টি করে। এর পানির তোড়ে আরেকবার ভূমিধস হয়ে মূল দুর্যোগকে বহু গুণ বাড়িয়ে দেয়।

ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ রুদ্ধ হ্রদ বিস্ফোরণ ঘটেছিল ১৭৮৬ সালে চীনের সিচুয়ান প্রদেশে। ভূমিকম্পের কারণে দাদু নদী অবরুদ্ধ হয়ে তৈরি হওয়া হ্রদটি ১০ দিন পর ভেঙে ১,৪০০ কিলোমিটার এলাকা প্লাবিত করে এবং প্রায় ১ লাখ মানুষের মৃত্যু ঘটে।

এ ছাড়া এসব প্রাকৃতিক বিপর্যয় আন্তঃসীমান্ত প্রভাব ফেলে। ২০০০ সালের এপ্রিলে তিব্বতের ইয়িগং নদীর বাঁধ দুই মাস পর ভেঙে গিয়ে ভারতের অরুণাচল প্রদেশের ৫০০ কিলোমিটার এলাকা প্লাবিত করে এবং আসামের ব্রহ্মপুত্র নদে আছড়ে পড়ে। এতে ২০টি সেতু ধ্বংস হয় ও ৫০ হাজার মানুষ গৃহহীন হন। ২০০০ ও ২০০৫ সালে একই কারণে ভারতের হিমাচল প্রদেশের সতলেজ ও স্পিতি নদীতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ও শতাধিক মানুষের মৃত্যু হয়।

অন্যদিকে, ২০০৮ সালে চীনের ওয়েনচুয়ান ভূমিকম্পের পর টাংজিয়াশান এলাকায় তৈরি হওয়া বিশাল হ্রদের প্লাবন ঝুঁকি থেকে ১৩ লাখ মানুষকে রক্ষা করতে কৃত্রিম খাল কেটে নিয়ন্ত্রিতভাবে পানি বের করা হয়েছিল। পরবর্তীতে ২০১৪ সালে নেপালের সুনকোশী নদীতে তৈরি হওয়া হ্রদ ৪৫ দিন পর জিও-ইঞ্জিনিয়ারিং পদ্ধতিতে খালি করা হয়েছিল।

বর্তমান পরিস্থিতি কী?

সীমান্তে হ্রদ ভাঙার উচ্চ ঝুঁকির কারণে তল্লাশি ও উদ্ধার অভিযান স্থগিত রাখা হয়েছে। নেপাল পুলিশ তাদের নিরাপত্তা বাহিনী ও উদ্ধারকর্মীদের অবিলম্বে নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছে।

অন্যদিকে, চীনা কর্তৃপক্ষ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ৮ সদস্যের একটি প্রকৌশলী দল পাঠায়, যারা ড্রোন ও ৩ডি মডেলিংয়ের মাধ্যমে হ্রদটি জরিপ করে। জরিপে দেখা যায় হ্রদটি প্রায় ১৫০ মিটার দীর্ঘ এবং ৪০-৫০ মিটার গভীর, যেখানে ১৫ থেকে ২০ লাখ ঘনমিটার পানি আটকে ছিল।

প্রকৌশলী চেন হানসিয়াও জানান, বাঁধের নিচু অংশে একটি কৃত্রিম নিষ্কাশন নালা বা খাল খনন করে পানি বের করাই ছিল হ্রদের ঝুঁকি কমানোর মূল উপায়। তবে হ্রদটি ভেঙে যাওয়ার পর নেপালে দ্বিতীয় দফায় প্রলয়ঙ্করী বন্যা দেখা দেওয়ার সম্ভাবনা এখন প্রবল।

সূত্র: ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস