দারুওয়ালা থেকে পুনাওয়ালা: পার্সিদের পদবি এত বিচিত্র কেন

ভারতীয় পার্সি সম্প্রদায়ের পদবিগুলো সাধারণ পরিবারের পরিচয়ের চেয়েও অনন্য ও আকর্ষণীয়। কোনও কোনও ক্ষেত্রে এগুলোকে বিচিত্র হিসেবেও বর্ণনা করা হয়। অন্য সম্প্রদায়ের মতো পার্সিদের মধ্যে পদবি ব্যবহারের ঐতিহ্য ছিল না। তবে ১৮০০-এর দশকে ব্রিটিশ সরকারের করা আদমশুমারির পর পদবি রাখা বাধ্যতামূলক হলে পার্সি পরিবারগুলো নিজেরাই তাদের পদবির সৃষ্টি করে।

পার্সিদের ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায়, সপ্তম শতকে পারস্য (বর্তমান ইরান) আরব-ইসলামি শাসকদের দখলে গেলে ধর্মীয় নিপীড়ন থেকে বাঁচতে পার্সি সম্প্রদায় ভারতে বিশেষ করে গুজরাটে আশ্রয় নেয়। ষোড়শ শতকের পার্সিয়ান কাব্য ‘কিসসা-ই-সঞ্জান’ অনুযায়ী, তৎকালীন হিন্দু রাজা জাদি রানার কাছে আশ্রয় চেয়ে পার্সিরা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল যে, দুধে চিনি মেশার মতো তারা স্থানীয় সংস্কৃতির সঙ্গে মিশে যাবে। এরপর দীর্ঘ এক হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে তারা কেবল নিজেদের নামেই পরিচিত হতেন। পরবর্তীতে ব্রিটিশদের আদমশুমারির কারণে পেশা ও বাসস্থানের ওপর ভিত্তি করে পদবি তৈরি করা শুরু হয়। যেমন মদ বিক্রেতারা ‘দারুওয়ালা’ এবং পুনের বাসিন্দারা ‘পুনাওয়ালা’ পদবি গ্রহণ করেন।

প্রত্নতাত্ত্বিক ও ইতিহাসবিদ ড. কুরুশ এফ দালাল জানান, বড় বড় শহরের পেশার ওপর ভিত্তি করে পদবিগুলো তৈরি হয়েছিল। তবে বাজারে বহুল পরিচিত ‘সোডাবোটলওপেনারওয়ালা’ নামের কোনও বাস্তব পদবির অস্তিত্ব ছিল না, এটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক। অন্যদিকে, ব্রিটিশ সেনাদের কাজে নিয়োজিত এক ব্যক্তির নাম রাখা হয়েছিল ‘বামসাকারওয়ালা’। এ ছাড়া সিনেমা প্রজেক্টর পরিচালকদের বলা হতো ‘ওয়ার্কিংবক্সওয়ালা’, যা এসেছে ‘ওয়ার্কিং বক্স’ নামের প্রজেক্টর কোম্পানি থেকে।

ইরান থেকে আসা অনেকে ‘ইরাানি’ পদবি নেন। আবার ভারতে আসা প্রথম পূর্বপুরুষের নাম অনুযায়ীও পদবি রাখার চল ছিল; যেমন ‘ফরহাদি’। এ ছাড়া ব্রিটিশদের কাছ থেকে সহজে টাকা ধার দেওয়ার সুবাদে কাওয়াসজি জাহাঙ্গীর উপাধি পান ‘রেডিমানি’, যা পরবর্তীতে পরিবারের পদবিতে রূপ নেয়। রাজস্ব ব্যবস্থাপনার সম্মানসূচক উপাধি থেকে আসে ‘পার্সি দেশমুখ’। তবে ‘গোরখোড়ু’ (কবর খননকারী) বা গুজরাটের বাঁধের জলে হারিয়ে যাওয়া গ্রাম থেকে আসা ‘কামোদ’-এর মতো অনেক প্রাচীন পদবি এখন আর ব্যবহৃত হয় না।

অনেক পদবির উৎস আবার রহস্যজনক। যেমন ‘জামুজি’ পদবির উৎস নিয়ে সাবেক ক্যাপ্টেন রোহিন্টন জামুজি জানান, লন্ডনে এক জাপানি নারীর সঙ্গে সাক্ষাতের পর তিনি জানতে পারেন এটি জাপানি শব্দ, যার অর্থ ‘বণিক’। ব্রিটিশ শাসন আমলের আগেই জাপানের সঙ্গে বাণিজ্যের সূত্রে পদবিটির উৎপত্তি হতে পারে।

সাধারণত পার্সি পদবির শেষে ‘ওয়ালা’ বা ‘জি’ যুক্ত থাকে। কনটেন্ট লিড শিরিন জামুজির মতে, জাতপ্রথাহীন এই ধর্মে পদবিগুলো কেবল পূর্বপুরুষদের পেশা বা পরিচয়ের মজার তথ্য দেয়। পেশা, বাসস্থান কিংবা অদ্ভুত সব ডাকনাম থেকে তৈরি এসব পদবি প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে কৌতুহল জাগিয়ে চলেছে।

সূত্র: এনডিটিভি