স্বাস্থ্যঝুঁকির পরেও যে কারণে সস্তা প্যাকেটজাত খাবারে নির্ভরশীল ভারত

ভারতে কিছু খাদ্যপণ্যে স্বাস্থ্য সতর্কতায় লাল লেবেল যুক্ত করার প্রস্তাব ঘিরে দেশজুড়ে বিতর্ক শুরু হয়েছে। কীভাবে সস্তা প্যাকেটজাত খাবারের ওপর ভারতীয়দের নির্ভরতা তৈরি হলো এবং একই ব্র্যান্ডের তুলনামূলক পুষ্টিকর সংস্করণ অন্য দেশে বিক্রি হলেও ভারতে কেন ভিন্ন পণ্য পাওয়া যায় তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

ভারতে পরিবারের গড় আয় বিশ্বের গড়ের তুলনায় অনেক কম। ফলে নেসলের ম্যাগি ইনস্ট্যান্ট নুডলস ও কোকা-কোলার থামস আপের মতো সস্তা খাবার ও পানীয়ের বড় বাজার তৈরি হয়েছে। এতে বড় খাদ্য কোম্পানিগুলোর ওপর চালু থাকা কঠোর খাদ্যমান অনুসরণের চাপও তুলনামূলক কম।

বৃহস্পতিবার ভারতের খাদ্য নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রক সংস্থা এফএসএসএআই জানায়, অতিরিক্ত চিনি, লবণ বা স্যাচুরেটেড ফ্যাট থাকা খাবারে আরও কঠোর লাল সতর্কতা লেবেল আনার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। 

ডেনিশ ওষুধ প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান নোভো নরডিস্ক-এর জুলাই মাসের তথ্য অনুযায়ী, ভারতের মোট বৈশ্বিক ডায়াবেটিস রোগীর প্রায় এক-চতুর্থাংশ রয়েছে। দেশটিতে ১০ কোটি ১০ লাখের বেশি মানুষ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত এবং আরও ১৩ কোটি ৬০ লাখ প্রি-ডায়াবেটিসে ভুগছেন।

২০২৬ সালে ভারতের প্যাকেটজাত খাবারের বাজার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৩৭ দশমিক ২৫ বিলিয়ন ডলারে, যা ২০২৫ সালে ছিল ১২৯ দশমিক ১৮ বিলিয়ন ডলার। ২০৩৪ সালের মধ্যে বাজারটি ২৩৮ দশমিক ৮৩ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ভারতে ম্যাগির জনপ্রিয়তা এতটাই বেশি যে প্রতি বছর পরিবার ও রাস্তার খাবারের দোকানে প্রায় ৬০০ কোটি বাটি ম্যাগি ‘টু-মিনিট’ মাসালা নুডলস খাওয়া হয়। ভারতে ম্যাগির সব ধরনের সংস্করণেই পাম তেল ব্যবহার করা হয়, যেখানে ব্রিটেনে অনেক সংস্করণে বেশি দামি সূর্যমুখী তেল ব্যবহৃত হয়। একইভাবে, ভারতের কিটক্যাটে অস্ট্রেলিয়ার সংস্করণের তুলনায় কোকোর পরিমাণ কম।

নেসলে জানিয়েছে, স্থানীয় ভোক্তার চাহিদা, স্বাদ, খাদ্যসংস্কৃতি, উপকরণের প্রাপ্যতা ও আবহাওয়ার বিষয় বিবেচনায় নিয়ে তাদের পণ্যের রেসিপি তৈরি করা হয়। কোম্পানিটির দাবি, রেসিপিতে পার্থক্য পণ্যের মানে প্রভাব ফেলে না এবং তারা ভারতের সব খাদ্য নিরাপত্তা আইন মেনে চলে।

ভারতে পশ্চিমা প্যাকেটজাত খাদ্য কোম্পানিগুলোর ব্যবসা প্রায় এক শতাব্দী ধরে চলছে। নেসলে ১৯১২ সালে মিষ্টি কনডেন্সড মিল্ক বিক্রির মাধ্যমে ভারতে ব্যবসা শুরু করে। এরপর স্থানীয়ভাবে উৎপাদনের মাধ্যমে দাম কম রাখা হয়। এক খাদ্য কোম্পানি সাবেক কর্মকর্তা বলেন, কয়েক দশক আগে ভারতের মূল্য সচেতন ভোক্তাদের কথা মাথায় রেখে তৈরি করা অনেক রেসিপিই এখনও চালু রয়েছে।

ইউনিলিভার ১৯৩৭ সালে ভারতে প্রক্রিয়াজাত উদ্ভিজ্জ তেলের একটি মিশ্রণ-বিক্রি শুরু করে। এটি ব্যয়বহুল ও প্রথাগত ঘিয়ের একটি অত্যন্ত সাশ্রয়ী বিকল্প হিসেবে তৈরি হয় এবং দ্রুতই নিম্নবিত্ত পরিবারের রান্নাঘর, রেস্তোরাঁ ও মিষ্টির দোকানের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে পরিণত হয়।

মন্ডেলেজ ইন্ডিয়ার প্রাক্তন নির্বাহী পারুল শর্মা বলেন, ভারতে অনেক রান্নার পদ্ধতি বা রেসিপি কয়েক দশক আগে এমন সব ভোক্তাদের কথা মাথায় রেখে তৈরি হয়েছিল যারা খরচ নিয়ে অত্যন্ত সচেতন আর সেই রেসিপিগুলোই মূলত আজও একইভাবে চলে আসছে।

সূত্র: রয়টার্স