ভারতের অন্যান্য অঞ্চলে মন্দিরে আমিষ খাবার খাওয়া নিয়ে ধর্মীয় মহলের আপত্তির নজির থাকলেও পশ্চিমবঙ্গের শতাব্দীপ্রাচীন কালীঘাট মন্দিরে তা এক চিরাচরিত প্রথা। তবে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর কালীঘাটে মাছের ভোগ খাওয়ার বিষয়টি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে সম্প্রতি দুর্গাপূজায় বাঙালিদের আমিষ খাবার খাওয়া নিয়ে এক হিন্দু পুরোহিতের সমালোচনাকে কেন্দ্র করে।
শাক্য হিন্দুদের কাছে পবিত্র তিথি কৌশিকী অমাবস্যার সন্ধ্যায় কালীঘাট মন্দিরে যান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। একটি ভিডিওতে তাকে মেঝেতে বসে ভোগ খেতে দেখা যায়, যার মধ্যে ছিল কালীঘাটের ভোগ থালার বিশেষ আকর্ষণ মাছের মাথা, ভাজা মাছ ও বাসন্তী পোলাও। কালীঘাট মন্দিরে দেবী কালীকে মাছ এবং বলির ছাগল উৎসর্গ করার এবং পরবর্তীতে ভক্তদের তা গ্রহণ করার ঐতিহ্য রয়েছে।
উত্তর ভারতের নিরামিষ খাদ্যাভ্যাস বঙ্গে আমদানির অভিযোগ প্রায়ই প্রত্যাখ্যান করে থাকে বিজেপি। শুভেন্দু অধিকারীর ভিডিওর সূত্র ধরে ক্ষমতাসীন দলের পক্ষ থেকে জানানো হয় যে নিরামিষ-আমিষ বিতর্ক এবার থামানো উচিত। বিজেপি মুখপাত্র প্রদীপ ভাণ্ডারী সামাজিক মাধ্যমে জানান, কালীঘাটে মা কালীর ঐতিহ্যবাহী মাছের ভোগ গ্রহণ করে বাংলার বিশ্বাস ও জীবনযাত্রাকেই সম্মান জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী।
এই বিতর্কের সূত্রপাত বাতেশ্বর ধামের প্রধান পুরোহিত ধীরেন্দ্র শাস্ত্রী বা বাতেশ্বর বাবার একটি আহ্বান থেকে, যেখানে তিনি বাঙালি হিন্দুদের দুর্গাপূজার সময় আমিষ খাবার পরিহার করার আহ্বান জানান এবং আমিষভোজীদের ‘পখণ্ডী’ বা কপট বলে অভিহিত করেন। তিনি আরও দাবি করেন, দুর্গাপূজার সময় পশ্চিমবঙ্গে মাংস ও মদের দোকান বন্ধ রাখা উচিত। এই মন্তব্যের পর থেকেই পুজোয় আমিষ খাবার খাওয়ার পাশাপাশি দেবীকে তা উৎসর্গ করার ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতিতে অভ্যস্ত স্থানীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।
তবে জনমত এবং আদর্শগত অনুভূতির মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে দ্রুত পদক্ষেপ নেয় বিজেপি। একদিকে শুভেন্দু অধিকারী বাতেশ্বর বাবাকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানালেও তার দল স্পষ্ট জানিয়ে দেয়, মানুষের খাদ্যাভ্যাস নির্ধারণের অধিকার কোনও ধর্মগুরুর নেই। বিজেপির রাজ্য প্রধান সমীক ভট্টাচার্য বলেন, বাতেশ্বর বাবা অন্য দুনিয়া থেকে এসেছেন এবং বাংলার মানুষ কী খাবে তা ঠিক করার অধিকার তার নেই, কারণ স্বামী বিবেকানন্দও বাঙালিদের মাছ-মাংস খাওয়ার পক্ষে কথা বলেছেন।
শুভেন্দু অধিকারীও রাজনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখার এক অনন্য কৌশল নেন। বাতেশ্বর বাবার ছবি পোড়ানোর অভিযোগে তিনি যেমন প্রতিবেশীদের গ্রেফতারের নির্দেশ দেন, তেমনি তার বক্তব্যের জবাবে কালীঘাট মন্দিরে দেবীকে নিবেদিত মাছের ভোগ খেয়ে সবচেয়ে ‘বাঙালি সুলভ’ উত্তরটি দেন। পরবর্তীতে ধীরেন্দ্র শাস্ত্রীর মন্তব্য সম্পর্কে তিনি বলেন, প্রত্যেকেরই ব্যক্তিগত মতামত প্রকাশের অধিকার রয়েছে এবং মানুষ তা গ্রহণ বা বর্জন করতে পারে।
শুভেন্দু বলেন, আমি একজন সনাতনী হিন্দু। মহা অষ্টমীতে যখন মা দুর্গার পুজো করি, তখন সাত্ত্বিক খাবার খাই। কার্তিক মাসেও আমি সাত্ত্বিক খাবার গ্রহণ করি। একই সঙ্গে মা কালীকে নিবেদিত খাসির মাংসের মতো আমিষ খাবারও আমি খাই। আজ মন্দিরে যে ভোগ দেওয়া হয়েছিল, তাতে মাছের মাথা, ভাজা মাছ এবং বাসন্তী পোলাও ছিল। আমি সেটাই খেয়েছি।
সূত্র: এনডিটিভি

‘বাঙালি মাছ-মাংস খাবেই’, বাঘেশ্বর বাবাকে রাজ্য বিজেপির জবাব







