গত ৩০ সেপ্টেম্বর (বুধবার) ফ্লাইদুবাইয়ের বিমানে ককপিটে হামলার মুখে রক্তাত্ত হয়েও ককপিটের দরজা খুলে দিয়ে ১৭৪ জন যাত্রীর জীবন বাঁচিয়েছেন ভারতীয় ক্যাপ্টেন স্মিত মাচ্ছার। কো-পাইলটের হামলার শিকার হয়ে মারাত্মকভাবে আহত হওয়া সত্ত্বেও মাচ্ছারের এই সাহসিকতা চার দশক আগের আরেকটি ঐতিহাসিক বীরত্বের স্মৃতি ফিরিয়ে এনেছে। ১৯৮৬ সালে করাচিতে প্যান অ্যাম ফ্লাইট ৭৩-এ একইভাবে শত শত যাত্রীর জীবন বাঁচাতে গিয়ে নিজের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন ২২ বছর বয়সী ভারতীয় বিমানবালা নিরজা ভানোট।
দুই ঘটনার প্রেক্ষাপট ভিন্ন হলেও উভয় ক্ষেত্রে ভারতীয় অ্যাভিয়েশন কর্মীদের নিজের প্রাণ বাঁচানোর সুযোগ থাকা সত্ত্বেও যাত্রীদের নিরাপত্তার প্রতি অনন্য নিষ্ঠা দেখা গেছে। ফ্লাইদুবাইয়ের বোয়িং ৭৩৭ ম্যাক্স ৮ বিমানটিতে কো-পাইলটের আক্রমণের পর ক্যাপ্টেন মাচ্ছার মেঝেতে লুটিয়ে পড়েও ককপিটের লকিং সিস্টেম খুলে দিতে সক্ষম হন। ফলে যাত্রী ও অন্য ক্রু সদস্যরা ভেতরে ঢুকে হামলাকারীকে কাবু করেন এবং বিমানে থাকা ছুটিপ্রাপ্ত দুই পাইলট বিমানটি সৌদি আরবের তাবুকে নিরাপদে অবতরণ করাতে সক্ষম হন।
এই ঘটনা মনে করিয়ে দেয় ১৯৮৬ সালের ৫ সেপ্টেম্বরের কথা। মুম্বাই থেকে ফ্রাঙ্কফুর্ট ও নিউইয়র্কগামী প্যান অ্যাম ফ্লাইট ৭৩-এর বোয়িং ৭৪৭ বিমানটি করাচি বিমানবন্দরে অবস্থানকালে আবু নিদাল অর্গানাইজেশনের চারজন সশস্ত্র প্যালেস্টাইনি জঙ্গি বিমানটি ছিনতাই করে। ৩৭৯ জন যাত্রী ও ক্রু পরিবেষ্টিত ওই বিমানে ১৭ ঘণ্টার জিম্মিদশায় অন্তত ২০ জন নিহত ও ১০০ জনের বেশি আহত হন।
ঘটনার শুরুতেই সিনিয়র ফ্লাইট পার্সার নিরজা ভানোট বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে পাইলটদের সতর্ক করেন, যার ফলে ককপিট ক্রুরা বিমান ছেড়ে পালাতে সক্ষম হন এবং বিমানটি করাচিতেই আটকে থাকে। পরবর্তীতে যখন ছিনতাইকারীরা আমেরিকান যাত্রীদের আলাদা করার জন্য পাসপোর্ট চাওয়া শুরু করে, তখন নিরজা ও তার সহকর্মীরা অত্যন্ত ঝুঁকির মধ্যে সেই পাসপোর্টগুলো লুকিয়ে ফেলেন।
দীর্ঘ সময় ধরে বন্দুকধারীদের উপস্থিতির মধ্যেও নিরজা আতঙ্কিত যাত্রীদের শান্ত রাখার চেষ্টা করেন। প্যান অ্যাম ফ্লাইটের বেঁচে যাওয়া ২১ বছর বয়সী যাত্রী ধর্মেন্দ্র শাহ পরবর্তী সময়ে বলেন, নিরজা এক্সিটের একদম পাশেই দাঁড়িয়ে ছিল। সে চাইলে সবার আগে অনায়াসেই পালিয়ে যেতে পারত, কিন্তু সে অন্যদের ধাক্কা দিয়ে বের হতে সাহায্য করছিল। আটকে পড়া শিশুদের বাঁচাতে গিয়ে পেছন থেকে তার গায়ে গুলি লাগে।
মার্কিন বিচার বিভাগ নিশ্চিত করে যে নিরজার সময়োচিত পদক্ষেপের কারণে শতাধিক প্রাণ বেঁচে যায়। ১৩ জন ক্রু সদস্যের মধ্যে কেবল নিরজাই জঙ্গিদের গুলিতে প্রাণ হারান। মরণোত্তর সম্মাননা হিসেবে ভারতের সর্বোচ্চ শান্তিকালীন বীরত্বসূচক পদক ‘অশোক চক্র’-এ ভূষিত হন তিনি। প্রথম নারী ও দীর্ঘ সময় পর্যন্ত কনিষ্ঠ ব্যক্তি হিসেবে তিনি এই সম্মান পান। এ ছাড়া ১৯৮৭ সালে পাকিস্তান তাকে ‘তমঘা-ই-পাকিস্তান’ এবং ২০০৬ সালে মার্কিন বিচার বিভাগ তাকে ‘স্পেশাল কারেজ অ্যাওয়ার্ড’-এ ভূষিত করে।
সূত্র: ইন্ডিয়া টুডে