বেকার তরুণদের নিয়ে তেলাপোকা মন্তব্যের জবাবকে সারা দেশের প্রতিবাদ আন্দোলনে রূপ দেওয়া রাজনৈতিক কৌশলবিদ অভিজিৎ দিপকেকে শনিবার আটক করেছে ভারতীয় পুলিশ। এই আন্দোলনের জেরে এক কেন্দ্রীয় মন্ত্রীকে পদত্যাগ করতে হয়েছিলো।
ভোটার তালিকায় পরিবর্তন আনার অভিযোগে নির্বাচন কমিশনের প্রধানের পদত্যাগ চেয়ে সমাবেশের আগে রাজধানী নয়াদিল্লিতে দিপকের বিমান অবতরণ করলে পুলিশ সেখানে হাজির হয়। সমালোচকদের দাবি, এই কারসাজিতে খসড়া তালিকা থেকে প্রায় ১৩ কোটি ভোটারের নাম বাদ পড়েছে। প্রকাশিত ভিডিওতে দেখা যায়, বিমানের ভেতরে পুলিশ কর্মকর্তাদের উদ্দেশে দিপকে বলছেন, আমি গ্রেফতার হতেই এসেছি, আমাকে গ্রেফতার করুন...আমি আপনাদের ভয় পাই না। একজন কর্মকর্তা তাকে আশ্বস্ত করেন, তাকে গ্রেফতার করা হচ্ছে না, বরং তার সহযোগিতা চাওয়া হচ্ছে।
৩১ বছর বয়সী দিপকে ভারতের বর্ণব্যবস্থার নিচের স্তরের পরিবারে জন্মেছেন। এ বছর তিনি খ্যাতি পান, যখন বেকার তরুণদের তেলাপোকার সঙ্গে তুলনা করে সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের মন্তব্যের জবাবে তার ছয় শব্দের একটি পোস্ট অনলাইনে ভাইরাল হয়।
ওই পোস্ট থেকে জন্ম নেয় ব্যঙ্গাত্মক কক্ষরোচ জনতা পার্টি, যা দ্রুত অনলাইন আন্দোলন থেকে রাজনৈতিক শক্তিতে রূপ নেয়। গণবিক্ষোভ সংগঠিত করে তারা জুলাইয়ে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ ঘটায়। ক্রমাগত জনচাপে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির মন্ত্রিসভা থেকে এমন প্রস্থান বিরল।
সিইসি জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে শনিবারের নতুন বিক্ষোভের ডাক দেওয়ার পরই দিপকে আটক হলেন। নির্বাচন কমিশন বলছে, জাপানের জনসংখ্যার চেয়েও বড় এই সংখ্যা খসড়া সংশোধনের সময় চিহ্নিত এন্ট্রি নিয়ে গঠিত এবং ভুলভাবে বাদ পড়া ভোটাররা আবার নিবন্ধন করতে পারবেন। দাড়িওয়ালা দিপকে সাধারণত টি-শার্ট ও জিনস পরেন। দক্ষিণের প্রযুক্তিকেন্দ্র বেঙ্গালুরুতে বিক্ষোভের নেতৃত্ব দিয়ে মুম্বই হয়ে তিনি রাজধানীতে আসেন। সেখানে পুলিশ তাকে এবং সংগঠনের দুই জ্যেষ্ঠ নেতা সৌরভ দাস ও আশুতোষ রাঙ্কাকে আটক করে।
দিল্লিতে পুলিশি অভিযান ও বিক্ষোভে কড়া বিধিনিষেধ সত্ত্বেও দিপকে সমর্থকদের অহিংসার প্রবক্তা মহাত্মা গান্ধীর উদাহরণ টেনে শান্তিপূর্ণভাবে বিক্ষোভ করার আহ্বান জানান। ফ্লাইটের আগে রেকর্ড করা এক ভিডিওতে দিপকে বলেন, আগামীকাল কী হবে, আমি জানি না। তবে একটি বিষয়ে আমি নিশ্চিত, আমি ভয় পাব না। পিছিয়েও যাব না। আমাদের গণতন্ত্র বাঁচাতে হবে।
তরুণদের বিক্ষোভ ঠেকাতে লকডাউনের মতো ব্যবস্থায় ভ্রমণ ও ইন্টারনেট বন্ধ রাখে কর্তৃপক্ষ হাজার হাজার নিরাপত্তা সদস্য মোতায়েন করে দিল্লিকে দুর্গে পরিণত করেছে। এর আগে দিপকে প্রশ্ন তোলেন, প্রধানমন্ত্রী কেন দেশের তরুণ, দেশের মানুষকে এত ভয় পাচ্ছেন?
মে মাসে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দিপকের প্রশ্ন ছিল, সব তেলাপোকা যদি একজোট হয়? প্রায় রাতারাতি এই পোস্ট রাজনৈতিক যোগাযোগ পেশাজীবী দিপকেকে ভারতের তরুণদের প্রতিবাদ আন্দোলনের অন্যতম পরিচিত মুখে পরিণত করে।
যুক্তরাষ্ট্রে জনসংযোগে স্নাতকোত্তর শেষ করে তিনি ভারতে ফেরেন। নিজের ও পরিবারের প্রতি হুমকি সত্ত্বেও ভাইরাল সাফল্য তাকে প্রকৃত, অর্থবহ কাজ করার সুযোগ দিয়েছে বলে জানান তিনি। কক্ষরোচ জনতা পার্টি অনলাইনে লাখ লাখ অনুসারী জুটিয়েছে। প্রায় ২০ লাখ পরীক্ষার্থীকে প্রভাবিত করা মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিরুদ্ধে বিক্ষোভেও তারা ভূমিকা রেখেছে। আন্দোলনের ক্ষোভ শেষ পর্যন্ত শিক্ষামন্ত্রীর ওপর কেন্দ্রীভূত হয়, যিনি ২৫ জুলাই পদত্যাগ করেন।
এরপর থেকে দিপকে ও তার সমর্থকেরা, যারা সংগঠনটিকে রাজনৈতিক দলের চেয়ে চাপ সৃষ্টিকারী আন্দোলন হিসেবে দেখেন, সরকারি স্কুলের অবকাঠামো থেকে তরুণদের কর্মসংস্থান পর্যন্ত নানা ইস্যুতে প্রচার চালিয়েছেন। গত মাসে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকার একটি প্রতিবেদনের পর তারা ফের রাস্তায় নামেন। পত্রিকাটি জানায়, ভোটার তালিকা সংশোধন, নিবন্ধন পদ্ধতি ও কমিশনের ডিজিটাল ব্যবস্থা নিয়ে কুমারের দুই সহকর্মী বারবার উদ্বেগ তুলেছিলেন। নির্বাচন কমিশন বলেছে, অভ্যন্তরীণ আলোচনায় ভিন্নমত স্বাভাবিক।
সূত্র: রয়টার্স