সাবেক জার্মান চ্যান্সেলর আঙ্গেলা ম্যার্কেল বলেছেন, ১৬ বছর দায়িত্ব পালনের সময় রাশিয়া নিয়ে তার সরকারের নীতি নিয়ে ক্ষমা চাইবেন না তিনি। গত বছর ক্ষমতা ছাড়ার পর প্রথম সাক্ষাৎকারে তিনি একথা জানিয়েছেন। সমালোচকরা দাবি করছেন, ইউক্রেনে রাশিয়ার আক্রমণের জন্য তার এসব নীতি কোনও না কোনোভাবে দায়ী।
মঙ্গলবার জার্মান সাময়িকী ডের স্পিগেল-এ প্রকাশিত সাক্ষাৎকারে আঙ্গেলা ম্যার্কেল বলেন, আমার নিজেকে দায়ী করার প্রয়োজন নেই। আমি চেষ্টা করেছি। কাজ না হওয়া অনেক লজ্জার।
ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনে রাশিয়া আক্রমণ শুরুর পর থেকে জার্মানির রাজনৈতিক শ্রেণি মস্কো নিয়ে তাদের দশক পুরনো নীতি পুনর্বিবেচনা করতে বাধ্য হয়। এই নীতিকে বাণিজ্যে মাধ্যমে পরিবর্তিত হিসেবে দেখা হয়। সমালোচকরা দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছিলেন, এটি মস্কোর প্রতি অধিক নমনীয় নীতি।
১৬ বছরের শাসনামলে জার্মান-রুশ বাণিজ্যিক স্বার্থকে গুরুত্ব দেওয়ার কারণে প্রচণ্ড চাপে ছিলেন সাবেক এই চ্যান্সেলর। বিশেষ করে বিতর্কিত নর্ড স্ট্রিম ২ গ্যাস পাইপলাইনকে সমর্থন জানানোর কারণে সমালোচনায় পড়েন। ক্রেমলিন সমর্থিত এই প্রকল্পের বিরোধিতা করেছিল ইউক্রেন ও পূর্ব ইউরোপীয় প্রতিবেশী দেশগুলো। ইউক্রেনে রুশ আক্রমণের পর এই প্রকল্প স্থগিত করেছে জার্মানি।
সাক্ষাৎকারে ম্যার্কেল বলেছেন, বাণিজ্যের মাধ্যমে পরিবর্তন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে নমনীয় করবে বলে কোনও ভ্রমের মধ্যে তিনি ছিলেন না। রাশিয়ার সঙ্গে ন্যূনতম বাণিজ্যিক সম্পর্ক বজায় রাখার পক্ষপাতী তিনি।
২০১৪ সালে ক্রিমিয়াকে ইউক্রেন থেকে বিচ্ছিন্ন করার পর মস্কোর প্রতি অবস্থান কঠোর করেন তিনি। বলেন, কিন্তু একে অপরকে সম্পূর্ণভাবে অগ্রাহ্য করা সম্ভব না।
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি জার্মানির এই অবস্থান ফেব্রুয়ারির আক্রমণের দিকে নিয়ে গেছে বলে দাবি করেছেন।
সাক্ষাৎকারে আত্মসমালোচনা থেকে বিরত থাকেননি ম্যার্কেল। বলেছেন, তার সরকারের ব্যর্থতার কারণে সফল নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে তোলা সম্ভব হয়নি। এখন তিনি নিজেকে জিজ্ঞেস করেন, এমন ট্র্যাজেডি এড়াতে আরও কিছু করার ছিল?
ইউক্রেন নিয়ে তার বিরুদ্ধে সবচেয়ে বেশি যে সমালোচনা সেটিতে অনড় থেকেছেন ম্যার্কেল। ২০০৮ সালে ন্যাটোতে আনুষ্ঠানিকভাবে ইউক্রেনের যোগদানের বিরোধিতা করেছিলেন তিনি। ওই সময় তিনি ও জার্মান নেতারা দাবি করেছিলেন, ইউক্রেন ন্যাটোতে যোগদানে প্রস্তুত না। এমন পদক্ষেপের ফলে মস্কোর সঙ্গে সম্পর্ক বিঘ্নিত হতে পারে।
সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, পুতিনের কাছে এটি যুদ্ধের ঘোষণার মতো হতো।
২০১৪ ও ২০১৫ সালে মিনস্ক শান্তিচুক্তিতে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে নিজের ভূমিকার প্রতিও অটল থেকেছেন ম্যার্কেল। তিনি বলেছেন, পুতিন হয়ত ইউক্রেনে বড় ধরনের ক্ষতি করতেন যদি না এই চুক্তি কার্যকর হতো। সফল না হওয়ার অর্থ এই নয় যে কূটনীতি ভুল। তাই কেন আমি ভুল বলবো তা বুঝতে পারছি না এবং আমি এজন্য ক্ষমা চাইবো না।
এর আগে দীর্ঘ প্রায় ছয় মাস নীরবতার পর সম্প্রতি জার্মানির কেন্দ্রীয় শ্রমিক সংগঠনের এক সভায় ভাষণ দিতে গিয়ে তিনি রাশিয়ার তীব্র নিন্দা করেন। তিনি বলেন, ইউক্রেনে হামলার মাধ্যমে রাশিয়া আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করেছে। ফলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপের ইতিহাসে বিশাল ভাঙন দেখা যাচ্ছে।
ইউক্রেনের প্রতি পূর্ণ সংহতি প্রকাশ করে তিনি বলেন, রাশিয়ার আগ্রাসনের মুখে ইউক্রেনের আত্মরক্ষার পূর্ণ অধিকার রয়েছে।
ইউক্রেনের জন্য জার্মানির বর্তমান সরকার, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ন্যাটো, জি-সেভেন ও জাতিসংঘের উদ্যোগের প্রতি সমর্থন জানিয়ে তিনি বলেন, রাশিয়ার ‘বর্বোরোচিত আগ্রাসী যুদ্ধ' বন্ধ করতে এমনটা করা প্রয়োজন।
সূত্র: নিউ ইয়র্ক টাইমস