শস্য আমদানিতে ৩ দেশের নিষেধাজ্ঞা, বিপাকে ইউক্রেন

পোল্যান্ড ও হাঙ্গেরির পর এবার ইউক্রেনীয় শস্য আমদানি নিষিদ্ধ করেছে স্লোভাকিয়া। যুদ্ধের কারণে কিয়েভের কট্টর মিত্র দেশগুলোও অভ্যন্তরীণ কৃষি বাজার রক্ষায় চাপে পড়েছে। এই চাপের ফলেই দেশগুলো এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছে। একই সঙ্গে ছয়টি দেশ ইউক্রেন থেকে আমদানিকৃত শস্যের ওপর শুল্কারোপের দাবিও জানিয়েছে। এই বিষয়ে বুধবার ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) কর্মকর্তারা আলোচনা করবেন।

রবিবার পোল্যান্ড ও হাঙ্গেরি ইউক্রেন থেকে কিছু শস্য আমদানির ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা জারি করে। এরপর পূর্ব ইউরোপের আরও কয়েকটি দেশও বলেছে, তারা এমন পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বিবেচনা করছে। এতে করে ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাজধানীতে বিষয়টি ঘিরে উত্তেজনা ছড়াচ্ছে।

পূর্ব ইউরোপীয় একাধিক দেশের কৃষকরা বলছেন, ইউক্রেন থেকে শস্য আমদানির কারণে তাদের উৎপাদিত ফসলের দাম ও বিক্রি কমেছে।

নির্বাচনের বছর হওয়ার কারণে পোল্যান্ডে কৃষকের এই দাবি ক্ষমতাসীন দলের ওপর চাপ তৈরি করেছে। দলটি নির্বাচনে জয় লাভের জন্য গ্রামীণ অঞ্চলের ভোটারদের ওপর নির্ভরশীল।

সোমবার পোল্যান্ডের রাজধানীতে ইউক্রেনীয় প্রতিনিধি দলের সঙ্গে আলোচনার পর পোলিশ কৃষিমন্ত্রী রবার্ট টেলাস বলেছেন, ইউক্রেনের সহযোগিতা প্রয়োজন। কিন্তু এই সহযোগিতার ব্যয় সব ইউরোপীয় দেশে ছড়িয়ে দেওয়া উচিত। শুধু পোল্যান্ডের মতো ফ্রন্টলাইনের দেশগুলোর ওপর নয়। আমরা এতে একমত নই, কারণ এটি আমাদের কৃষকদের ক্ষতি করছে।

কিয়েভ বলছে, পোল্যান্ড হয়ে অপর দেশে খাদ্য রফতানি পুনরায় চালু করতে চায়। এটিকে তারা নিষেধাজ্ঞা বাতিলের প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচনা করছে। তবে টেলাস বলেছেন, ট্রানজিটে পাঠানো শস্য স্থানীয় বাজারে যে প্রবেশ করবে না, এমন কোনও নিশ্চয়তা এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি।

গত বছর ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসন শুরু হওয়ার পর কৃষ্ণ সাগরের কয়েকটি বন্দর অবরুদ্ধ করা হয়েছিল এবং মধ্য ইউরোপীয় দেশগুলোতে ইউক্রেনীয় শস্যের বিপুল পরিমাণ আটকা পড়ে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও মধ্য ইউরোপীয় দেশে উৎপাদিত শস্যের তুলনায় এগুলো দামে সস্তা।

জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় কৃষ্ণ সাগর দিয়ে ইউক্রেনীয় শস্য রফতানির চুক্তি বহাল থাকা অবস্থায় পোল্যান্ড, হাঙ্গেরি ও স্লোভাকিয়া এই নিষেধাজ্ঞা জারি করলো। এই চুক্তির মেয়াদ শেষ হবে ১৮ মে। চুক্তির মেয়াদ বৃদ্ধির বিষয়টি অনিশ্চিত। কারণ রাশিয়া বেশ কিছু দাবি তুলে ধরেছে। এই দাবিগুলো পশ্চিমা দেশগুলোর মেনে নেওয়ার সম্ভাবনা কম।

নিষেধাজ্ঞা এবং শস্য রফতানির চুক্তির মেয়াদ বৃদ্ধি না হলে ইউক্রেনে লাখ লাখ টন শস্য মজুত হবে। বিশ্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ শস্য রফতানিকারক দেশ ইউক্রেন। দেশটির জিডিপির একটি বড় অংশ আসে শস্য বিক্রি থেকে।

পোল্যান্ডে আলোচনার আগে ইউক্রেনের কৃষিমন্ত্রী মাইকোলা সোলস্কি বলেছিলেন, প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে ট্রানজিট চালু হওয়া উচিত। কারণ এটি বেশ গুরুত্বপূর্ণ এবং এটি এমন বিষয় যা নিঃশর্তভাবে করা উচিত এবং এর পর আমরা অন্যান্য বিষয়ে কথা বলব।

পোলিশ কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুসারে, ২০২২ সালে ইউক্রেন থেকে পোল্যান্ড ২.৪৫ মিলিয়ন টন শস্য আমদানি করেছিল। যা দেশটির মোট আমদানির তিন-চতুর্থাংশ। পোল্যান্ডের আইন অনুসারে, স্থানীয় বাজারে কোনও শস্যের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা জারি করলে তা ট্রানজিটের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হয়। এই নিষেধাজ্ঞার ফলে ট্রাক চালকরা সীমান্তে দীর্ঘ ট্রাফিক জ্যামে বেশ কয়েকদিন আটকা পড়েছেন।

ইউক্রেনের জাইটোমিরের একজন চালক মাইকোলা বারভিন বলেছেন, আমরা উভয় দিকে যেতে পারছি না। হ্যাঁ, পোলিশরা আমাদের সহযোগিতা করছে। আমি তাদের কাছে খুব কৃতজ্ঞ। পুরো ইউক্রেন, এমনকি পুরো বিশ্ব কৃতজ্ঞ। কিন্তু এখন কোনও কারণে পোল্যান্ড আমাদের প্রবেশ করতে দিচ্ছে না।

বারভিন বলেছেন, তিনি তিন দিন ধরে আটকে ছিলেন এবং ট্রাকের জট ২৫ কিলোমিটারের বেশি দীর্ঘ।

পোল্যান্ড, হাঙ্গেরির পথ ধরে স্লোভাকিয়া অনির্দিষ্টকালের জন্য ইউক্রেনীয় শস্য আমদানি বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। যদিও দেশটিতে ইউক্রেনীয় শস্যের ট্রানজিট বহাল রয়েছে।

বিটিএ নিউজ এজেন্সি জানিয়েছে, বুলগেরিয়ার কৃষিমন্ত্রীও বলেছেন তার দেশ আমদানি সীমিত করতে পারে।

হাঙ্গেরির কৃষিমন্ত্রী ইস্তভান নাগি বলেছেন, জাতীয় স্তরের বাইরেও একটি সমাধান প্রয়োজন, ইইউর চূড়ান্ত পদক্ষেপগু অনিবার্য।

চেক প্রজাতন্ত্রও একটি ইইউ-ব্যাপী সমাধানের আহ্বান জানিয়ে বলেছে, দেশটি আপাতত নিষেধাজ্ঞা জারি করবে না।

বুলগেরিয়া, হাঙ্গেরি, পোল্যান্ড, রোমানিয়া এবং স্লোভাকিয়া গত মাসে ইউরোপীয় কমিশনের কাছে বিষয়টি উত্থাপন করেছে। দেশগুলোর পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ইউক্রেনীয় আমদানির ওপর শুল্ক বিবেচনা করা উচিত। অন্যদিকে দেশগুলো সস্তায় ইউক্রেনীয় শস্য কেনার জন্য একটি ইইউ ক্রয় প্রক্রিয়ার জন্যও চাপ দিয়েছে।

পোল্যান্ডের কৃষিমন্ত্রী টেলাস বলেছেন, ছয়টি দেশ একটি সমাধান খুঁজতে বাণিজ্য-বিষয়ক ইইউ কমিশনারের সঙ্গে দেখা করতে চায়।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের একজন প্রবীণ কর্মকর্তা বলেছেন, ইইউ দূতেরা বুধবার পোল্যান্ড এবং হাঙ্গেরির নিষেধাজ্ঞা নিয়ে আলোচনা করবেন।  

এর আগে ব্লকটির এক কর্মকর্তা বলেছিলেন, কোনও সদস্য দেশের একতরফা পদক্ষেপ গ্রহণযোগ্য নয়। বিশ্বব্যাপী কম দাম এবং চাহিদার কারণে ইইউতে আসা শস্য বিক্রির বদলে জমা হয়ে রয়েছে।