বিতর্কিত ও বাতিল হয়ে যাওয়া জাতি ও ইউজেনিক্স সম্পর্কিত ধারণা নিয়ে জনগণের মধ্যে প্রভাব বিস্তার করার উদ্দেশ্যে একটি আন্তর্জাতিক ‘জাতি বিজ্ঞান’ নেটওয়ার্ক গোপনে কাজ করছে। ‘হিউম্যান ডাইভারসিটি ফাউন্ডেশন’ নামে দুই বছর আগে প্রতিষ্ঠিত এই সংগঠনটি একটি গোপন ভিডিও ধারণের মাধ্যমে উন্মোচিত হয়েছে। পডকাস্ট, ভিডিও, অনলাইন ম্যাগাজিন ও গবেষণা প্রবন্ধের মাধ্যমে এই সংগঠনের সদস্যরা জাতিগত শ্রেষ্ঠত্ব সম্পর্কে ‘বিপজ্জনক মতবাদ’ প্রচারের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
বৈষম্যবিরোধী দাতব্য সংস্থা ‘হোপ নট হেট’ প্রথমে এই সংগঠনের ব্রিটিশ সংগঠককে একটি ডানপন্থি সম্মেলনে আবিষ্কার করে এবং এর কার্যক্রম নিয়ে তদন্ত শুরু করে। পরবর্তীতে, এই সংস্থাটি যুক্তরাজ্যের দৈনিক দ্য গার্ডিয়ান এবং জার্মানির সহযোগী সংবাদমাধ্যম সংস্থাগুলোর সঙ্গে মিলে এই তদন্ত চালায়।
মার্কিন ধনকুবেরের অর্থায়ন
অনুসন্ধানে জানা গেছে, মূলত ডেটিং ওয়েবসাইট থেকে অর্থ উপার্জনকারী সিয়াটেলভিত্তিক প্রযুক্তি উদ্যোক্তা অ্যান্ড্রু কনরু এই নেটওয়ার্কে ১০ লাখ ডলারের বেশি অর্থায়ন করেছেন। তিনি প্রাথমিকভাবে ‘অরাজনৈতিক অ্যাকাডেমিক গবেষণা’ প্রচারের লক্ষ্য নিয়ে এই সহযোগিতা দেন। কিন্তু গার্ডিয়ানের তদন্তের পর তিনি বলেছেন যে, ‘সংগঠনটি মূল উদ্দেশ্য থেকে সরে গেছে’। এ কারণে তিনি নিজের সমর্থন প্রত্যাহার করেছেন।
বিশেষজ্ঞরা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, এই ধরনের মতবাদ সমাজে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার করতে পারে এবং বাস্তব ক্ষতি ডেকে আনতে পারে। ব্রুনেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর কালচার অ্যান্ড ইভোলিউশনের পরিচালক ড. রেবেকা সিয়ার বলেন, ‘বৈজ্ঞানিক বর্ণবাদ একটি বিপজ্জনক মতবাদ, যার রাজনৈতিক উদ্দেশ্য রয়েছে। এটি নীতি প্রণয়নে বৈষম্য কমানোর যেকোনও প্রচেষ্টার বিরোধিতা করতে ব্যবহৃত হয়।
‘রিমাইগ্রেশন’ ও বিতর্কিত বক্তব্য
এই নেটওয়ার্কের কর্মসূচির মধ্যে একটি ছিল ‘রিমাইগ্রেশন’ বা জাতিগত সংখ্যালঘুদের গণপ্রত্যাবাসনের ধারণা। একটি গোপন ভিডিও রেকর্ডিংয়ে সংগঠনের এক সংগঠককে বলতে শোনা গেছে, ‘মানুষকে ঘরে ফেরাতে টাকা দিতে হবে’। এই শব্দটি সম্প্রতি ডানপন্থি রাজনীতিতে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে এবং সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও এটি ব্যবহার করেছেন।
জার্মানির ডানপন্থি দল ‘অল্টারনেটিভ ফর ডয়েচল্যান্ড’ (এএফডি)-এর পরামর্শক এরিক আহরেন্স যুক্তরাজ্যের একটি আয়োজনে শ্রোতাদেরকে ‘শ্বেতাঙ্গ সমাজের ক্ষমতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা’ করার জন্য একটি গোপন ক্লাবের সদস্য হতে উৎসাহিত করেন। পরবর্তীতে তিনি বিভিন্ন প্রধান শহরে এই ক্লাবের শাখা স্থাপনের কথা উল্লেখ করেন। আহরেন্স জার্মানির সংবিধান সুরক্ষা দফতর কর্তৃক উগ্র ডানপন্থি চরমপন্থি হিসেবে অভিহিত হয়েছেন। তরুণদের চরমপন্থার দিকে তার প্ররোচিত করা নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।
সাবেক শিক্ষক ম্যাথিউ ফ্রস্টের সম্পৃক্ততা
এই নেটওয়ার্কের সঙ্গে জড়িত ছিলেন সাবেক ধর্মীয় শিক্ষা শিক্ষক ম্যাথিউ ফ্রস্ট। তিনি সম্প্রতি ‘অ্যাপোরিয়া’ নামে একটি অনলাইন ম্যাগাজিন এবং পডকাস্টের সম্পাদক হিসেবে কাজ করেছেন। তার লেখা অনেকগুলো পোস্ট ও পডকাস্ট ‘জাতিগত পরিচয়’ এবং ‘যুক্তরাষ্ট্রে জাতিগত বাস্তবতা’ নিয়ে আলোচনা করেছে। যা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বিজ্ঞান ও ইউজেনিক্স নিয়ে বিতর্ক
মার্কিন ন্যাশনাল ইনস্টিটিউটস অব হেলথ বৈজ্ঞানিক বর্ণবাদকে ‘বিজ্ঞানকে অপব্যবহারের মাধ্যমে মিথ্যা বৈজ্ঞানিক বিশ্বাস প্রচারের একটি সংগঠিত ব্যবস্থা’ হিসেবে বর্ণনা করেছে। ইউজেনিক্সের শিকড় ঔপনিবেশিকতা এবং নাৎসি যুগের মতবাদের দিকে ইঙ্গিত করে। যা আজকের রাজনৈতিক মতাদর্শকে সমর্থন করতে ব্যবহার করা হচ্ছে।
হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের কোয়ান্টিটেটিভ জেনেটিক্সের অধ্যাপক আলেকজান্ডার গুসেভ বলেন, ‘বৈজ্ঞানিক বর্ণবাদের মূল ভিত্তির পক্ষে প্রায় কোনও বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। এটি একটি মিথ্যা মতবাদ যা বিভিন্ন জাতিগত গোষ্ঠীর মধ্যে বংশগত পার্থক্যকে অতিরঞ্জিত করে।’
অ্যান্ড্রু কনরুর বিতর্কিত আর্থিক সহযোগিতা
গোপন রেকর্ডিংয়ে দেখা গেছে, এই নেটওয়ার্কের প্রধান দাতা অ্যান্ড্রু কনরু সংগঠনের শুরুতেই ১৩ লাখ ডলার বিনিয়োগ করেন। কিন্তু সংগঠনের কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রশ্ন ওঠার পর তিনি সম্পর্ক ছিন্ন করেন। কনরুর একজন মুখপাত্র বলেছেন, এই প্রকল্পের প্রাথমিক উদ্দেশ্য ছিল অরাজনৈতিক অ্যাকাডেমিক গবেষণাকে সমর্থন করা। কিন্তু সংগঠনটি এই লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হয়েছে।