ফ্রন্টলাইনে তীব্র সেনা ঘাটতি, কঠিন সিদ্ধান্তের মুখোমুখি ইউক্রেন

সাম্প্রতিক দিনে, ইউক্রেনের পশ্চিমাঞ্চলীয় কোভেল শহরে এক বরফ জমা বিকেলে, সামরিক পোশাক পরিহিত একটি লোক, যার মাথাভর্তি রূপালি চুল, ট্রেনে চড়ার জন্য প্রস্তুত হয়েছেন। একটি ছোট ছেলে তাকে ছেড়ে দিতে নারাজ। সে তার হাঁটু জড়িয়ে আছে। ছেলেটির মা তাকে টেনে নিয়ে বললেন, এসো দিমা, দাদুকে বিদায় জানাও।

এই ঘটনার কয়েক মিনিট পর, বোর্ডে থাকা লোকটিকে নিয়ে ট্রেনটি স্টেশন ছেড়ে ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলে দীর্ঘ যাত্রায় বেরিয়ে পড়ে। পূর্বাঞ্চল এখন রাশিয়ার বিরুদ্ধে কিয়েভ বাহিনীর লড়াইয়ের সম্মুখভাগ। কন্যা ও নাতি উভয়ই অশ্রুসিক্ত চোখে প্লাটফর্ম থেকে হাত নেড়ে তাকে বিদায় জানাল।

একই ধরনের দৃশ্য ইউক্রেনে এখন প্রায়ই দেখা যায়, যেখানে সেনা সংকটের কারণে ক্ষয়প্রাপ্ত ও ক্লান্ত সেনাবাহিনী ক্রমশ বয়স্ক পুরুষদের নিয়োগ দিচ্ছে। রাশিয়ার সঙ্গে প্রায় তিন বছর ধরে সর্বাত্মক যুদ্ধ করছে দেশটি। এখন হোয়াইট হাউজে নবনির্বাচিত ডোনাল্ড ট্রাম্পের অভিষেকের জন্য অস্বস্তিকর এক অপেক্ষায় রয়েছে কিয়েভ। যুদ্ধক্ষেত্রের সম্মুখভাগে সেনার তীব্র ঘাটতি আগত মার্কিন প্রশাসন নিয়ে দেশটির দ্বিধাকেই যেন প্রকাশ করছে। কেননা, ট্রাম্প প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, ক্ষমতায় যাওয়ার ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই তিনি যুদ্ধ থামাবেন। ইউক্রেনবাসীর ভয়, এর জন্য খুব সম্ভবত তাদের অনেক বড় একটি ছাড় দিতে হতে পারে।

বাইডেন প্রসাশন ইউক্রেনকে অবশ্য সেনা নিয়োগের বয়স কমিয়ে ১৮তে নামানোর আহ্বান জানিয়েছিল। তবে যুদ্ধরত একটি সমাজে অল্পবয়সী পুরুষদের যুদ্ধে পাঠানোর সংবেদনশীলতার কথা উল্লেখ করে মার্কিন এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। দেশটিতে ২৫ বছর বয়সীরাই শুধু সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার আবেদন করতে পারে। এর আগে এই বয়সসীমা ছিল ২৭।

কয়েকজন ইউক্রেনীয় অফিসারের সাক্ষাত্কার নিয়েছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান। বিষয়টির সংবেদনশীলতার কারণে নাম ও পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে গার্ডিয়ানের সঙ্গে কথা বলেছেন তারা।

বর্তমানে ইউক্রেনের ১১৪তম আঞ্চলিক প্রতিরক্ষা ব্রিগেডে কর্মরত একজন সেনা বলেছেন, সেনাবাহিনীতে ‘আমরা এখন যেসব মানুষদের পেয়েছি তারা যুদ্ধের শুরুতে সেখানে থাকা মানুষদের মতো নয়।’

কিয়েভের বাইরে একটি ফায়ারিং রেঞ্জে নতুন প্রাপ্তরা। ছবি: দ্য গার্ডিয়ান

এই সেনা গত দুই বছর ধরে যুদ্ধক্ষেত্রের বিভিন্ন হটস্পটে অবস্থান করছেন। তিনি বলেন, ‘সম্প্রতি, আমরা ৯০ জনকে পেয়েছি। তবে তাদের মধ্যে মাত্র ২৪ জন নিয়োগ পাওয়ার যোগ্য। বাকিরা ছিল বৃদ্ধ, অসুস্থ বা মদ্যপ। এক মাস আগে, তারা কিয়েভ বা ডিনিপ্রোর চারপাশে হাঁটছিল। তবে বর্তমানে তাদের একটি পরিখায় রাখ হয়েছে। সেখানে তারা এখন কোনমতে অস্ত্র ধরা শিখেছে। তারা বেশ বাজেভাবে প্রশিক্ষিত ও সজ্জিত।’

বিমান প্রতিরক্ষা ইউনিটের দুটি সূত্র গার্ডিয়ানকে বলেছে, সম্মুখভাগে সেনার ঘাটতি এতটাই তীব্র হয়ে উঠেছে যে, ইতোমধ্যেই ক্ষয় হওয়া বিমান প্রতিরক্ষা ইউনিটগুলোকে পদাতিক বাহিনী হিসেবে সেখানে পাঠাতে আরও মানুষকে মুক্ত করার নির্দেশ দিয়েছেন জেনারেল স্টাফ।

একটি সূত্র বলেছেন, ‘এটি একটি জটিল স্তরে পৌঁছেছে যেখানে আমরা নিশ্চিত হতে পারি না যে, বিমান প্রতিরক্ষা সঠিকভাবে কাজ করতে পারে।’

সূত্রটি জানায়, এই পরিস্থিতি ইউক্রেনের নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ—এই ভয়ই তাকে এ বিষয়ে কথা বলতে বাধ্য করেছে।

সূত্রটি বলেছে, ‘এই মানুষগুলো জানতো কীভাবে বিমান প্রতিরক্ষা কাজ করে। তাদের কেউ কেউ পশ্চিমে প্রশিক্ষিত এবং প্রকৃত অর্থেই দক্ষ ছিলেন। এখন তাদের যুদ্ধের জন্য সম্মুখভাবে পাঠানো হয়, যার জন্য তাদের কোনও প্রশিক্ষণই নেই।’

সূত্রটি আরও জানায়, এমনও হতে পারে, কমান্ডাররা যেসব সেনাদের পছন্দ করেন না তাদের শাস্তি হিসেবে সম্মুখভাগে পাঠানোর আদেশ দিয়ে থাকেন।

তিনি বলেন, এমন একটি আশঙ্কাও রয়েছে যে, ইউক্রেনীয় বিমান প্রতিরক্ষা অবস্থান ও কৌশল সম্পর্কে সংবেদনশীল জ্ঞান রয়েছে এমন সেনারা সামনের সারিতে যুদ্ধ করতে যেয়ে রুশদের হাতে ধরা পড়লে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ফাঁস হয়ে যাবে।

কিয়েভের শহরতলিরতে ইউক্রেনের সশস্ত্র বাহিনীর প্রতিনিধি ও পুলিশ কর্মকর্তারা। ছবি: দ্য গার্ডিয়ান

ইউক্রেনের একজন স্পষ্টভাষী ও বিতর্কিত এমপি মারিয়ানা বেজুহলা। গত মাসে টেলিগ্রামের একটি পোস্টে তিনি দাবি করেছিলেন, বিমান প্রতিরক্ষা বাহিনীর সেনাদের পদাতিক ইউনিটে স্থানান্তর করা হচ্ছে। ফলে রুশ ড্রোনগুলোকে ইউক্রেনের গুলি করে ভূ-পাতিত করার মতো সাফল্যের হার আরও খারাপ হয়েছে। তখন বিমান প্রতিরক্ষা বাহিনীর একজন মুখপাত্র ইউরি ইহানাত সেনা স্থানান্তর হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, ‘সেগুলো খুব বেদনাদায়ক’ ছিল। তবে এর ফলে যে দেশটির গুলি করে রুশ ড্রোন ভূপাতিত করার হার প্রভাবিত হচ্ছে তা অস্বীকার করেন তিনি।

গার্ডিয়ান যাদের সঙ্গে কথা বলেছিল তারা বলেছেন, স্থানান্তরের ক্রমবর্ধমান চাহিদা দেশের বিমান প্রতিরক্ষা ইউনিটগুলোকে সঠিকভাবে পরিচালনা করা কঠিন করে তুলছে।

বিমান প্রতিরক্ষায় কর্মরত আরেকটি সূত্র বলেছেন, ‘এমনটি এক বছর ধরে চলছে। তবে এখন তা আরও খারাপের দিকে যাচ্ছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘ইতোমধ্যেই আমার ইউনিট সম্পূর্ণ শক্তির অর্ধেকেরও কমে নেমে এসেছে। সাম্প্রতিক দিনগুলোতে কমিশন এসেছে এবং তারা আরও কয়েক ডজন সেনা চায়। আমার কাছে ৫০-এর বেশি বয়সী ও আহত ব্যক্তিরা রয়েছেন। এভাবে কাজ চালানো অসম্ভব।’

২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়ার সর্বাত্মক আক্রমণের প্রথম মাসগুলোতে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে যোগ দেওয়ার জন্য ইউক্রেনীয়দের লাইন লেগে গিয়েছিল। তখন কয়েক হাজার মানুষ স্বেচ্ছায় সম্মুখভাবে যুদ্ধ করতে চলে যান। তখন থেকে গত বছর ধরে সেনা নিয়োগ কিয়েভের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। রিক্রুটমেন্ট অফিসারদের স্কোয়াড রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে ঘুরে আবেদনের কাগজপত্র হস্তান্তর করছেন। এদিকে, আগ্রাসনের শুরু থেকেই নিয়োগপ্রাপ্ত বয়সী পুরুষদের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে।

অধিকাংশ ইউক্রেনীয়রাই সেনা নিয়োগের প্রয়োজনীয়তা বোঝেন। তবে এই নীতি ব্যক্তিগত পর্যায়ে জনপ্রিয় নয়। নতুন নিয়োগের সন্ধানে বের হলে নিয়োগকারী স্কোয়াডগুলোকে প্রায়ই ক্রোধ ও অপব্যবহারের সম্মুখীন হতে হয়।

দেশে পরিবর্তনশীল মনোভাবের একটি লক্ষণীয় বিষয় দেখে গেছে একটি জনমত জরিপের ফলাফলে। গ্রীষ্মে কিয়েভভিত্তিক রাজুমকভ সেন্টারের একটি জরিপে দেখা যায় জরিপে অংশ নেওয়া ৪৬ শতাংশ ইউক্রেনীয় মনে করেন, ‘সামরিক পরিষেবা এড়িয়ে যাওয়ায় লজ্জার কিছু নেই।’ তবে এই নিয়ে দ্বিমত পোষণ করেছেন মাত্র ২৯ শতাংশ।

ইউক্রেনীয়দের সশস্ত্র বাহিনীতে যোগ দিতে উৎসাহ দিতে রাজধানী কিয়েভের রাস্তায় টানানো পোস্টার। ছবি: দ্য গার্ডিয়ান

সেনা সংকট সাম্প্রতিক মাসগুলোতে কিয়েভ ও ওয়াশিংটনের মধ্যকার সম্পর্কের অবনতি হয়েছে। জেলেনস্কি ও অন্যান্য কর্মকর্তারা প্রায়ই আরও অস্ত্রের দাবি করেছিলেন। তবে দেশটির সেনাবাহিনীর শূন্য পদ পূরণে প্রয়োজনীয় জনবল জোগাড় করতে অক্ষম ছিলেন তারা। আর এই বিষয়টি নিয়েই বাইডেন প্রশাসনের কর্মকর্তারা বিরক্ত ছিলেন।

গত মাসে এক বিবৃতিতে, হোয়াইট হাউজের জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের মুখপাত্র শন স্যাভেট বলেন, এই মুহূর্তে ইউক্রেনের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ‘জনশক্তি’।

তিনি বলেন, ‘তারা পদ পূরণে যথাযথ পদক্ষেপ নিলে আমরা প্রশিক্ষণের ক্ষমতা বাড়াতেও প্রস্তুত।’

ইউক্রেনের কর্মকর্তারা মনে করেন, জনসাধারণের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের আহ্বান সংবেদনশীল ও অনুপযুক্ত ছিল। এপ্রিলে সেনা সমাবেশের গতি ত্বারণ্বিত করেছে ইউক্রেন। দেশটি সেনা নিয়োগের বয়স ২৭ থেকে কমিয়ে ২৫ এ নামিয়েছে। তবে অধিকাংশ ইউক্রেনীয়রা, এমনকি যারা সম্মুখভাগে যুদ্ধ করছেন তারাও তরুণ প্রজন্মকে রক্ষার প্রয়োজন উল্লেখ করে এটিকে আরও কমানোর বিষয়ে সতর্ক করেছেন।

অনেক সেনা বলে থাকেন, সেনা সমাবেশের হার বাড়ানোর উপায় হলো, নিয়োগের বয়স কমানো নয়, বরং আরও ভালো প্রণোদনা ও আরও প্রশিক্ষণ দেওয়া। ১১৪তম ব্রিগেডের সেনা বলেছেন, ‘বিষয়টি বয়সের নয়। সত্যিই, তাদের ভালো অবস্থা ও অনুপ্রেরণা দরকার।’

এ সময় তিনি আরও বলেন, ‘আঠারো বছর বয়সীরা এখনও শিশু। প্রয়োজনে হয়তো এটিকে ২৩-এ নামিয়ে আনতে পারে তারা। তবে কিয়েভে এখনও যথেষ্ট মানুষ রয়েছেন যারা একত্রিত হতে পারেন। তবে তারা যেতে চান না।’

 

সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান