রাশিয়ার গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হলে ইউরোপের কী হবে?

গত ৪০ বছর ধরে ইউরোপে রাশিয়ার গ্যাস সরবরাহ ইউক্রেনের মাধ্যমে পাঠানো হতো। ১ জানুয়ারি থেকে এই সরবরাহ বন্ধ হওয়ার কথা রয়েছে। ইউক্রেনের নাফটোগাজ রাশিয়ার গ্যাজপ্রমের সঙ্গে পাঁচ বছরের সর্বশেষ চুক্তি নবায়ন করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।

যুদ্ধ সত্ত্বেও ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি ১৯ ডিসেম্বর এক বিবৃতিতে বলেছেন, যদি গ্যাস সরবরাহের অর্থ রাশিয়ার কাছে না পৌঁছায়, তাহলে ইউক্রেন গ্যাস ট্রানজিট চালিয়ে যেতে পারে। তবে, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এক সপ্তাহ পর জানিয়ে দেন যে, এ বছর আর কোনও চুক্তি সই করার সময় নেই।

নতুন বছরে ইউক্রেন হয়ে রাশিয়ার গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হলে পরিস্থিতি কী দাঁড়াবে তা নিয়ে বিশ্লেষণ করেছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ও সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।

রাশিয়ার গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হওয়া ইউরোপের জন্য বড় ধাক্কা হতে পারে। তবে ইইউ বলছে, এই পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য তাদের প্রস্তুতি রয়েছে। বিকল্প উৎস এবং সরবরাহ চুক্তি ইউরোপীয়দের জন্য স্বস্তির বার্তা বহন করছে।

এদিকে, রাশিয়ার জন্য এটি বড় অর্থনৈতিক ধাক্কা হতে পারে। যুদ্ধ, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ও গ্যাস বাজার হারানোর কারণে রাশিয়া ক্রমশ এক ঘনীভূত সংকটের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।

ইউরোপে রাশিয়ার গ্যাস সরবরাহ ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনে আক্রমণের পর ব্যাপকভাবে কমে যায়। একসময় ইউরোপীয় গ্যাস বাজারের ৩৫ শতাংশ দখলে রাখা রাশিয়ার অংশ বর্তমানে ৮ শতাংশে নেমে এসেছে।

২০২০ সালে চুক্তির শুরুর সময় ইউক্রেনের মাধ্যমে বছরে ৬৫ বিলিয়ন কিউবিক মিটার (বিসিএম) গ্যাস সরবরাহ করা হতো। তবে ২০২৪ সালের ১ ডিসেম্বর পর্যন্ত এই পরিমাণ কমে ১৪ বিসিএম-এ এসে দাঁড়িয়েছে।

ইইউ বলেছে, এই পরিমাণ সম্পূর্ণরূপে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) এবং রাশিয়াবহির্ভূত পাইপলাইনের মাধ্যমে সরবরাহের মাধ্যমে পূরণ করা সম্ভব। বর্তমানে নরওয়ে, যুক্তরাষ্ট্র ও কাতারের মতো দেশগুলোর কাছে বাজার হারিয়েছে রাশিয়া।

রাশিয়া গ্যাস বিক্রি থেকে বছরে প্রায় ৫ বিলিয়ন ডলার আয় করে, যেখানে ইউক্রেন গ্যাস ট্রানজিট ফি থেকে ৮০০ মিলিয়ন থেকে ১ বিলিয়ন ডলার আয় করে।

ইউক্রেন রুটের মাধ্যমে গ্যাস প্রধানত অস্ট্রিয়া ও স্লোভাকিয়াতে সরবরাহ করা হয়। অস্ট্রিয়া তার বেশিরভাগ গ্যাস ইউক্রেন রুট দিয়ে পায়। অন্যদিকে, স্লোভাকিয়া গ্যাজপ্রম থেকে প্রায় ৩ বিসিএম গ্যাস নেয়, যা তাদের মোট প্রয়োজনের দুই-তৃতীয়াংশ।

তবে, স্লোভাকিয়া বলেছে যে, রাশিয়ার গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হলেও তাদের চাহিদা মেটাতে কোনও সমস্যা হবে না। তারা ব্রিটিশ পেট্রোলিয়াম (বিপি), এনই, এক্সনমোবিল, আরডব্লিউই ও শেল-এর সঙ্গে চুক্তির মাধ্যমে বিকল্প উৎস নিশ্চিত করেছে।

ইউরোপে রাশিয়ার গ্যাস সরবরাহের বেশিরভাগ রুট বন্ধ হয়ে গেছে। যেমন বেলারুশ হয়ে যাওয়া ইয়ামাল-ইউরোপ এবং বাল্টিক সাগরের নর্ড স্ট্রিম। বিকল্প হিসেবে টার্কস্ট্রিম পাইপলাইন ব্যবহারের কথা বলা হচ্ছে। তবে এর ক্ষমতা সীমিত।

অস্ট্রিয়া ইতোমধ্যে বিকল্প সরবরাহের জন্য প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে। স্লোভাকিয়া তাদের প্রয়োজনীয় গ্যাসের এক-তৃতীয়াংশ হাঙ্গেরি থেকে, বাকিটা অস্ট্রিয়া, চেক প্রজাতন্ত্র ও পোল্যান্ড থেকে পেতে পারে।

ইউক্রেন গ্যাস ট্রানজিটের জন্য রাশিয়ার গ্যাস ব্যবহার করে না। ফলে এর নিরাপত্তা নিয়ে কোনও উদ্বেগ নেই।

মলদোভা রাশিয়ার কাছ থেকে বছরে প্রায় ২ বিসিএম গ্যাস পায়, যা ইউক্রেনের মাধ্যমে ট্রান্সডনিস্ট্রিয়া অঞ্চলে পাঠানো হয়। গ্যাজপ্রম ১ জানুয়ারি থেকে সরবরাহ বন্ধ করার পরিকল্পনা করেছে।

মলডোভার প্রধানমন্ত্রী দোরিন রেচিয়ান বলেছেন, তার দেশ বিকল্প উৎস খুঁজে পেয়েছে এবং ১ জানুয়ারি থেকে গ্যাস খরচ এক-তৃতীয়াংশ কমানোর পরিকল্পনা করছে।

সূত্র: রয়টার্স