রাশিয়ার কাছে কোনও ভূখণ্ড ছেড়ে না দেওয়ার অবস্থান বজায় রেখে যুক্তরাষ্ট্রকে নতুন শান্তি প্রস্তাব দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে ইউক্রেন। ইউক্রেনীয় প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি সোমবার ইউরোপীয় ও ন্যাটো নেতাদের সঙ্গে বৈঠকের পর আবারও জানান, ইউক্রেনীয় বা আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে কোনও ভূখণ্ড ছাড়ার অধিকার তার নেই। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি এ খবর জানিয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে জেলেনস্কি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রকে সর্বশেষ প্রস্তাব মঙ্গলবারের মধ্যেই পাঠানো হতে পারে।
ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপি’র খবরে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্র এমন একটি শান্তি প্রস্তাব বিবেচনা করছে, যা ইউক্রেনকে বড় ধরনের ছাড় দিতে বাধ্য করতে পারে। এমন আশঙ্কায় ইউক্রেন তাদের অবস্থান স্পষ্ট রাখতে চাইছে। ইউরোপীয় মিত্ররাও উদ্বিগ্ন যে বড় ছাড় ইউক্রেনকে ভবিষ্যৎ হামলার ঝুঁকিতে ফেলতে পারে।
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র ও ইউক্রেনীয় আলোচকদের টানা আলোচনায় কোনও চূড়ান্ত সমঝোতা আসেনি। এরপর ইউরোপীয় নেতাদের সঙ্গে জেলেনস্কির কূটনৈতিক আলোচনা শুরু হয়। সোমবার তিনি প্রধান আলোচক রুস্তেম উমেরভের কাছ থেকে যুক্তরাষ্ট্র-রাশিয়া গোপন বৈঠকের অগ্রগতি সম্পর্কে বিস্তারিত জানার কথা ছিল।
ভূখণ্ড ছাড়ের বিষয়ে জেলেনস্কি বলেন, রাশিয়া আমাদের ভূখণ্ড ছাড়তে বলছে, কিন্তু আমরা কিছুই ছাড়তে চাই না। ইউক্রেনের আইন, সংবিধান ও আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে আমাদের কোনোভাবেই এটা করার অধিকার নেই। নৈতিকভাবেও না।
তিনি আরও মনে করিয়ে দেন, সীমান্ত পরিবর্তন নিয়ে যেকোনও সিদ্ধান্ত গণভোটের মাধ্যমে হতে হবে।
এদিকে রাশিয়ার সেনাপ্রধান ভ্যালেরি গেরাসিমভ মঙ্গলবার দাবি করেছেন, ইউক্রেনের ফ্রন্টলাইনে রুশ অগ্রগতি অব্যাহত রয়েছে এবং মিরনোহরাদ শহরকে লক্ষ্য করে অভিযান চলছে। মস্কো দাবি করছে, তারা পোকরোভস্ক দখল করেছে। ডনেস্ক-লুহানস্ক নিয়ে গঠিত ডনবাস অঞ্চলে পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের দিকে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ এই দখল। ইউক্রেন অবশ্য এ দাবি নাকচ করেছে।
ইন্টারফ্যাক্স ইউক্রেনের খবরে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবিত ২৮ দফার খসড়া, যা ইউক্রেন ও ইউরোপীয় নেতারা রাশিয়াপন্থি বলে সমালোচনা করেছিলেন, তা এখন কমে দাঁড়িয়েছে ২০ দফায়।
জেলেনস্কি বলেন, কোনও ইউক্রেনপন্থি বিষয় বাদ দেওয়া হয়নি এবং ভূখণ্ড সংক্রান্ত ইস্যুতেও কোনও সমঝোতা করা হয়নি। ডনবাস অঞ্চল ও জাপোরিজ্জিয়া পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নিয়ন্ত্রণকে তিনি সবচেয়ে সংবেদনশীল ইস্যু হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
ফাঁস হওয়া আগের খসড়ায় ডনবাস পুরোপুরি রাশিয়ার হাতে তুলে দেওয়ার প্রস্তাব ছিল। যদিও প্রায় চার বছরের যুদ্ধেও রাশিয়া এ অঞ্চল পুরোপুরি দখল করতে পারেনি। ইউরোপের বৃহত্তম জাপোরিজ্জিয়া পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন উভয় দেশের মধ্যে ভাগ করে দেওয়ার কথাও ছিল প্রস্তাবে।
সম্প্রতি এ খসড়ায় অগ্রগতি হয়েছে বলে কিয়েভ ও ইউরোপীয় নেতারা জানিয়েছেন এবং যুদ্ধবিরতি প্রচেষ্টায় যুক্ত হওয়ার জন্য ট্রাম্প প্রশাসনের ভূমিকার প্রশংসা করেছেন। তবে সোমবার লন্ডনের ডাউনিং স্ট্রিটে ইউরোপীয় নেতাদের সঙ্গে বৈঠককে যুক্তরাষ্ট্রের চাপ মোকাবিলায় ইউক্রেনের প্রতি সংহতির বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে। বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার, ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ ও জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎস।
যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় জানায়, যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন আলোচনা একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, যাতে ইউক্রেনের পক্ষে সমর্থন বাড়ানো যায় এবং ন্যায়সংগত ও স্থায়ী শান্তি, যা শক্তিশালী নিরাপত্তা নিশ্চয়তা অন্তর্ভুক্ত করবে, এমন সমাধানের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা নিশ্চয়তা কী রূপ নেবে, তা এখনও অনিশ্চিত। যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স আন্তর্জাতিক সেনা মোতায়েনের প্রস্তাব দিলেও জার্মানি ও ইতালি এ ধারণায় আপত্তি জানিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র এ ব্যবস্থায় কতটা ভূমিকা নেবে, তাও স্পষ্ট নয়।
লন্ডনের বৈঠকের পর জেলেনস্কি ব্রাসেলসে গিয়ে ন্যাটো মহাসচিব মার্ক রুটে ও ইইউ প্রধান উরসুলা ফন ডার লিয়েনের সঙ্গে বৈঠক করেন। মঙ্গলবার তার ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনির সঙ্গে বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে।
মস্কোও দাবি করছে, তাদের যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে গঠনমূলক আলোচনা চলছে। যদিও ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে শুরু হওয়া রাশিয়ার সর্বাত্মক আগ্রাসনের মূল লক্ষ্যগুলো থেকে তারা সরে এসেছে এমন স্পষ্ট ইঙ্গিত নেই।