ফারাজের ‘মুসলিম কার্ড’

লন্ডনের ‘ইসলামায়ন’ ঠেকাতে সাদিক খানের বিরুদ্ধে আরেক মুসলিম

লন্ডনের মেয়র নির্বাচনে এবার এক অভাবনীয় লড়াইয়ের সাক্ষী হতে যাচ্ছে বিশ্ব। ডানেডিন স্ট্রিট থেকে শুরু করে ওয়েস্টমিনস্টারের অলিগলি, সবখানেই এখন আলোচনার কেন্দ্রে রিফর্ম ইউকে’র নতুন তুরুপের তাস লাইলা কানিংহাম। নাইজেল ফারাজ যাকে সাদিক খানের রাজত্ব পতনের প্রধান অস্ত্র হিসেবে ঘোষণা করেছেন। তবে লাইলার পরিচয় কেবল একজন রাজনীতিবিদে সীমাবদ্ধ নয়; তার লড়াকু জীবন এবং নিজের ধর্মের বিরুদ্ধে তার অবস্থান তাকে করে তুলেছে সমসাময়িক রাজনীতির সবচেয়ে বিতর্কিত ও আলোচিত চরিত্র। এবারই প্রথমবার বড় দুটি দ‌ল লন্ড‌নের মেয়র প‌দে দুজন মুসলমান প্রার্থী‌কে ম‌নোনয়ন দি‌য়ে‌ছে।

লাইলার উঠে আসার গল্প

১৯৭৭ সালে লন্ডনের প্যাডিংটনে জন্ম নেওয়া লাইলা কানিংহামের শিকড় মিসরে। তার বাবা-মা ১৯৬০-এর দশকে মিসরের তৎকালীন রাজনৈতিক পরিস্থিতি থেকে বাঁচতে ব্রিটেনে পাড়ি জমান। ছোটবেলা থেকেই মার্গারেট থ্যাচারের আদর্শে বড় হওয়া লাইলা সাত সন্তানের জননী। তার রাজনৈতিক উত্থানের পেছনে রয়েছে এক নাটকীয় ঘটনা। লন্ডনের রাস্তায় নিজের সন্তানরা বারবার অপরাধী চক্রের কবলে পড়লে পুলিশি সহায়তার আশায় না বসে থেকে তিনি নিজেই অপরাধীদের পিছু নেন এবং তাদের ছবি তুলে পুলিশের হাতে ধরিয়ে দেন। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম তাকে রাতারাতি ‘ভিজিলান্টে মম’ বা ‘জাগ্রত জননী’ উপাধিতে ভূষিত করে। এই ব্যক্তিগত লড়াই থেকেই তার মনে জেদ চাপে লন্ডনের ভেঙে পড়া আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা সংস্কার করার।

আইনজীবী থেকে রাজনীতির ময়দানে

রাজনীতিতে আসার আগে লাইলা ছিলেন ক্রাউন প্রসিকিউশন সার্ভিস (সিপিএস)-এর একজন ডাকসাইটে প্রসিকিউটর। বাকিংহাম প্যালেসের গেটে হামলার মতো গুরুত্বপূর্ণ মামলা লড়েছেন তিনি। তবে তার পেশাগত জীবনের ইতি ঘটে এক বড় বিতর্কের মধ্য দিয়ে। ২০২৫ সালের জুনে কনজারভেটিভ পার্টি ছেড়ে রিফর্ম ইউকে-তে যোগ দেওয়ার সময় তিনি নিরপেক্ষতার নীতি ভঙ্গ করে রাজনৈতিক বক্তব্য দেন। এর ফলে চাপের মুখে তাকে প্রসিকিউটরের পদ থেকে পদত্যাগ করতে হয়। বর্তমানে তিনি ওয়েস্টমিনস্টার সিটি কাউন্সিলের ল্যাঙ্কাস্টার গেট ওয়ার্ডের কাউন্সিলর হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

লন্ডনেরইসলামায়নএবং লাইলার বিতর্কিত অবস্থান

লাইলা কানিংহামের সবচেয়ে আলোচিত ও বিতর্কিত দিক হলো নিজের ধর্মের প্রতি তার কঠোর দৃষ্টিভঙ্গি। তিনি প্রকাশ্যে লন্ডনের ‘ইসলামায়ন’ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তার মতে, অনিয়ন্ত্রিত অভিবাসনের কারণে লন্ডনের অনেক এলাকা এখন আর ব্রিটেনের অংশ বলে মনে হয় না। তিনি দাবি করেন, ব্রিটিশ মূল্যবোধ গ্রহণ না করলে অভিবাসীদের এ দেশে থাকা উচিত নয়। সমালোচকরা বলছেন, নাইজেল ফারাজ সুকৌশলে একজন মুসলিম নারীকে সামনে এনে ‘মুসলিম কার্ড’ খেলছেন, যাতে বর্ণবাদের অভিযোগ এড়িয়ে কট্টর এজেন্ডা বাস্তবায়ন করা যায়। বিশেষ করে লন্ডনের কিশোরদের মাঝে গড়ে ওঠা যৌন হয়রানিতে লিপ্ত কিশোরদের দল, যাদের ‘গ্রুমিং গ্যাং’ বলা হয়, তাদের নিয়ে তার বক্তব্য এবং মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার মার্ক রাউলির পদত্যাগ দাবি তাকে কট্টরপন্থি শিবিরে জনপ্রিয় করে তুলেছে।

সাদিক খান এবং লাইলা কানিংহাম। ছবি: জিবি নিউজ

সাদিক খান বনাম লাইলা কানিংহাম: পরিসংখ্যানে কে এগিয়ে?

২০২৮ সালের মেয়র নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এখন থেকেই শুরু হয়েছে হিসাব-নিকাশ। টানা তিনবারের মেয়র সাদিক খানের সামনে লাইলা এক বিশাল চ্যালেঞ্জ। ২০২৬ সালের জানুয়ারির সর্বশেষ জনমত জরিপ অনুযায়ী, লন্ডনের বাইরের অঞ্চলগুলোতে সাদিক খানের জনপ্রিয়তা কিছুটা নিম্নমুখী, যার প্রধান কারণ বিতর্কিত ‘ইউলেজ’ প্রকল্প। অন্যদিকে, রিফর্ম ইউকে-র সমর্থন ২০২৪ সালের ৮ শতাংশ থেকে বেড়ে এখন ২৩ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। জুয়াড়িদের বাজিতে সাদিক খান (৯/৪) এখনও ফেভারিট থাকলেও লাইলা কানিংহাম (৫/২) দ্রুত তার ব্যবধান কমিয়ে আনছেন। বিশেষ করে অপরাধ দমন এবং ইউলেজ বাতিলের প্রতিশ্রুতি দিয়ে তিনি লন্ডনের একটি বড় অংশকে নিজের পক্ষে টানতে সক্ষম হয়েছেন।

মেয়র হলে কী করবেন লাইলা?

লাইলা কানিংহাম ঘোষণা করেছেন, তিনি নির্বাচিত হলে প্রথম দিনেই ইউলেজ বাতিল করবেন। লন্ডনের আন্ডারগ্রাউন্ড রেল বা টিউব ট্রেনগুলোকে স্বয়ংক্রিয় করার মাধ্যমে শ্রমিক ইউনিয়নগুলোর ধর্মঘটের সংস্কৃতি বন্ধ করবেন। তার সবচেয়ে বড় প্রতিশ্রুতি হলো লন্ডনের রাস্তায় ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি কার্যকর করা। তিনি নিজেকে লন্ডনের ‘নতুন শেরিফ’ হিসেবে দাবি করে বলছেন, সাদিক খান লন্ডনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়েছেন। লন্ডনের মুসলিম মেয়রের বিরুদ্ধে আরেকজন মুসলিম নারীর এই লড়াই ব্রিটিশ রাজনীতির ইতিহাসে এক নতুন মেরুকরণ তৈরি করেছে।