ব্রিটেনে প্রথম প্রজন্মের অভিবাসী মুসলিমদের হাত ধরে যে ধর্মীয় কাঠামোর সূচনা হয়েছিল, তা এখন এক বিশাল পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। কার্ডিফ ইউনিভার্সিটির এক গবেষণায় দেখা গেছে, ব্রিটেনে কর্মরত ইমামদের ৪৮ শতাংশই এখন স্থানীয়ভাবে জন্ম নেওয়া এবং সেখানেই বেড়ে ওঠা তরুণ। ২০০৮ সালে এই হার ছিল মাত্র ৮ শতাংশ। এই ‘হোমগ্রোন’ বা স্থানীয় ইমামরাই এখন ব্রিটিশ মুসলিম সমাজের নতুন নেতৃত্ব হিসেবে উঠে আসছেন।
দীর্ঘদিন ধরে ব্রিটেনের মসজিদগুলো মূলত বাংলাদেশ ও পাকিস্তান থেকে আসা আলেমদের ওপর নির্ভরশীল ছিল। তবে বর্তমানে বিদেশে জন্ম নেওয়া এসব প্রবীণ আলেমদের সঙ্গে নতুন প্রজন্মের ব্রিটিশ মুসলিমদের একটি ‘যোগাযোগের ঘাটতি’ তৈরি হয়েছে। ব্রিটিশ-বাংলাদেশি তরুণরা এখন এমন ধর্মীয় নেতা খুঁজছেন, যারা কেবল প্রথাগত আচার পালন করবেন না, বরং ব্রিটেনের শিক্ষা ব্যবস্থা, মানসিক স্বাস্থ্য ও বহু-সাংস্কৃতিক জীবনের জটিলতাগুলো বুঝতে পারবেন।
বিশেষ করে ইংরেজি ভাষায় কোরআন-সুন্নাহর ব্যাখ্যা দেওয়া এবং ব্রিটিশ জীবনের সামাজিক চাপের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার ক্ষেত্রে বিদেশি ইমামরা পিছিয়ে পড়ছেন। ফলে তরুণরা নিজেদের ধর্মীয়ভাবে অভিভাবকহীন মনে করছেন। এই শূন্যতা পূরণে এগিয়ে আসছেন ব্রিটিশ-জন্মগত ইমামরা, যারা প্রাচীন ধর্মতত্ত্ব এবং বর্তমান বাস্তবতার মধ্যে সেতু হিসেবে কাজ করছেন।
ব্রিটেনে শিক্ষিত আলেমের সংখ্যা বাড়লেও এক ধরনের ‘ব্রেইন ড্রেন’ বা মেধা পাচার ঘটছে। ব্রিটিশ-বাংলাদেশি অনেক মেধাবী তরুণ ইমামতি পেশায় না গিয়ে আইন বা অ্যাকাডেমিক গবেষণার মতো পেশা বেছে নিচ্ছেন। এর প্রধান কারণ বেতন ও সুযোগ-সুবিধার অভাব। গবেষণায় দেখা গেছে, অনেক ইমাম জাতীয় ন্যূনতম মজুরির চেয়েও কম বেতন পান। তাদের কোনও আনুষ্ঠানিক চুক্তি বা পেনশনের সুবিধা নেই।
আয়ান ইনস্টিটিউটের ২০২৫ সালের এক রিপোর্ট বলছে, মসজিদের জনবলের ৮৬ শতাংশই স্বেচ্ছাসেবী। ‘আল্লাহর ঘরের কাজ’ মনে করে বেতন ছাড়া কাজ করার সামাজিক চাপের কারণে তরুণরা এই পেশা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। অথচ একজন ইমামকে ঘরোয়া বিবাদ মেটানো থেকে শুরু করে মানসিক স্বাস্থ্যের বিশেষজ্ঞ হিসেবেও দায়িত্ব পালন করতে হয়।
বর্তমানে ব্রিটেনে কর্মরত ইমামদের ২০ থেকে ২৫ শতাংশই বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত। বিশেষ করে লন্ডনের টাওয়ার হ্যামলেটসের মতো এলাকায় তাদের চাহিদা অনেক। তবে অনেক মসজিদের ট্রাস্টি কমিটি এখনও স্থানীয় তরুণদের চেয়ে বাংলাদেশে জন্ম নেওয়া প্রার্থীদের বেশি অগ্রাধিকার দেয়, যা নেতৃত্বের পরিবর্তনকে ধীর করে দিচ্ছে।
তথ্যমতে, ব্রিটিশ মসজিদ সেক্টরে ১.৫ বিলিয়ন পাউন্ডের স্থাবর সম্পদ রয়েছে। মসজিদের মিনার বা দামি পাথরের পেছনে বিপুল অর্থ খরচ করা হলেও দক্ষ জনশক্তি বা ইমামদের পেছনে বিনিয়োগ করা হচ্ছে খুবই সামান্য। আধুনিক মসজিদের এই সংকট কাটাতে ইমামদের বেতন কাঠামো স্কুল শিক্ষক বা যাজকদের সমপর্যায়ে আনা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
অভ্যন্তরীণ সংকটের পাশাপাশি ইসলামভীতি বা ইসলামোফোবিয়া বৃদ্ধি ইমামদের কাজকে আরও কঠিন করে তুলেছে। লন্ডনের সাউথ উডফোর্ড ইসলামিক সেন্টারের ইমাম মাওলানা নাজমুল হক জানান, ২০২৫ সালে ব্রিটেনে মুসলিমবিরোধী অপরাধ ১৯ শতাংশ বেড়েছে। এমন পরিস্থিতিতে একজন ইমামকে এখন সম্প্রদায়ের নিরাপত্তার সমন্বয়কারী হিসেবেও বাড়তি দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে।