ব্রিটেনে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের ওপর গত কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ বিপর্যয় নেমে এসেছে। বিশেষ করে দেশটির বিখ্যাত কারি শিল্পের প্রাণভোমরা ব্রিটিশ-বাংলাদেশি ব্যবসায়ীরা এখন অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে পড়েছেন। ২০২৬ সালের শুরু থেকে ব্রিটিশ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের (হোম অফিস) শুরু করা নজিরবিহীন অবৈধ অভিবাসনবিরোধী অভিযানের মুখে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে একের পর এক রেস্তোরাঁ।
হোম অফিস এবার কেবল সতর্কবার্তায় সীমাবদ্ধ না থেকে সরাসরি ‘ব্যবসা বিলুপ্ত’ করার মতো কঠোর নীতি গ্রহণ করেছে। অবৈধ কর্মী নিয়োগের দায়ে প্রতিটি কর্মীর বিপরীতে জরিমানার পরিমাণ বাড়িয়ে ৬০ হাজার পাউন্ড করা হয়েছে। ফলে একটি বিকেলের অভিযানেই কয়েক দশকের পুরোনো পারিবারিক ব্যবসা দেউলিয়া হওয়ার উপক্রম হচ্ছে।
সরকারি তথ্যানুযায়ী, ৫ মিলিয়ন পাউন্ডের বিশেষ তহবিল প্রয়োগের ফলে এনফোর্সমেন্ট অভিযানের তীব্রতা বহুগুণ বেড়েছে। গত ১৮ মাসে অভিযান বেড়েছে ৭৭ শতাংশ। এই সময়ে ১২ হাজার ৩ শতাধিক মানুষকে গ্রেফতার করা হয়েছে, যা আগের তুলনায় ৮৩ শতাংশ বেশি। শুধু লন্ডনেই ২০২৫ সালের প্রথম ছয় মাসে ১১৭টি প্রতিষ্ঠানকে মোট ৬ দশমিক ৭ মিলিয়ন পাউন্ড জরিমানা করা হয়েছে।
লন্ডনের ব্যবসায়ী নেতা ও জেএমজি কার্গোর কর্ণধার মনির আহমদ জানান, এই অভিযানের সবচেয়ে বড় ধাক্কা লেগেছে হসপিটালিটি সেক্টরে, বিশেষ করে বাংলাদেশি রেস্তোরাঁগুলোতে। বর্তমানে ব্রিটেনে প্রতি সপ্তাহে গড়ে অন্তত দুটি বাংলাদেশি রেস্তোরাঁ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।
জরিমানার অঙ্ক এতটাই বেশি যে, কোনও রেস্তোরাঁয় তিনজন অনিয়মিত কর্মী পাওয়া গেলে মালিককে ১ লাখ ৮০ হাজার পাউন্ড পর্যন্ত জরিমানা গুনতে হচ্ছে। প্রথমবার অপরাধের জন্য ৪৫ হাজার পাউন্ড এবং পুনরায় একই অপরাধের জন্য ৬০ হাজার পাউন্ড জরিমানা করা হচ্ছে।
কেবল আর্থিক জরিমানাই নয়, হোম অফিস এখন প্রতিষ্ঠানগুলোর অ্যালকোহল ও গভীর রাত পর্যন্ত সেবা দেওয়ার লাইসেন্স বাতিল করছে। সম্প্রতি টিভারটন এবং পূর্ব ইংল্যান্ডের বেশ কিছু বাংলাদেশি কারি হাউজে অভিযানের পর তাদের অ্যালকোহল বিক্রির অনুমতি কেড়ে নেওয়া হয়েছে। পানীয় বিক্রি থেকে আসা মুনাফা ছাড়া এই ব্যবসাগুলো টিকিয়ে রাখা অসম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
দক্ষ শেফ বা বাবুর্চির তীব্র সংকট এবং সরকারের জটিল ‘রাইট টু ওয়ার্ক’ পদ্ধতির কারণেই এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে বলে দাবি করছেন ব্রিটিশ-বাংলাদেশি মালিকরা। যদিও অনেক সময় সংখ্যালঘু মালিকানাধীন ব্যবসাকে অবৈধ নিয়োগের জন্য দায়ী করা হয়, তবে হোম অফিসের তথ্য বলছে এটি একটি পদ্ধতিগত সংকট। সোডেক্সোর মতো বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে সাধারণ টেকঅ্যাওয়ে; সব পর্যায়েই এই সমস্যা বিদ্যমান।
২০২৬ সালের এপ্রিল থেকে যাত্রা শুরু করতে যাচ্ছে ‘ফেয়ার ওয়ার্ক এজেন্সি’। এর ফলে অবৈধ কর্মসংস্থানের সংজ্ঞা আরও বিস্তৃত হবে। এখন থেকে ঠিকাদার (কন্ট্রাক্টর), ডেলিভারি রাইডার বা এজেন্সির মাধ্যমে আসা কর্মীর অভিবাসন সংক্রান্ত দায়ভারও মালিককে নিতে হবে। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে ডিজিটাল আইডি ভেরিফিকেশন এবং ইলেকট্রনিক ট্রাভেল অথরাইজেশন (ইটিএ) পদ্ধতি বাধ্যতামূলক হওয়ায় নিয়োগকর্তাদের জন্য নিয়ম মেনে চলা ছাড়া আর কোনও বিকল্প থাকছে না।