‘চেঞ্জ অর গেট ডাম্পড’, ইউরোপকে যুক্তরাষ্ট্রের বার্তা

ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের পুরোনো সম্পর্কে ভাটা পড়েছে। ইউক্রেন ও গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতে তাদের টানাপড়েন চরমে। এছাড়া মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ন্যাটো জোটের পুরোনো হুমকি তো রয়েছে। গত সপ্তাহের শেষের দিকে হওয়া মিউনিখ সম্মেলনেও তাদের সম্পর্কের বিষয়ে কোনও অগ্রগতি হয়নি। বরং, ট্রাম্প প্রশাসনের আগের কথাই জানানো হয়েছে। দেওয়া হয়নি কোনও আশ্বাস।

মিউনিখের এ সম্মেলন নিয়ে বিশ্লেষণধর্মী একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন। বিশ্লেষক নিক প্যাটন ওয়ালস লেখাটি লিখেছেন। বাংলা ট্রিবিউনের পাঠকদের জন্য বিশ্লেষণধর্মী লেখাটির ভাষান্তর তুলে ধরা হলো:

এটি এখনও এক ধরনের ধ্বংসাত্মক শক্তি,  যা চকলেট ও উষ্ণ কোমল অনুভূতিতে মোড়ানো ছিল।

জার্মানির মিউনিখে অনুষ্ঠিত ন্যাটোর নিরাপত্তা সম্মেলনে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী যখন বললেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপেরই সন্তান এবং দু’পক্ষের ভাগ্য সর্বদা একে অপরের সঙ্গে জড়িত থাকবে’, ঠিক তখন সেখানে উপস্থিত সবাই হাততালি দিয়ে তাকে সাধুবাদ জানায়। এ তালি ছিল ইউরোপীয়দের স্বস্তি ও উৎসাহের। যদিও গত বছর মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স আক্রমাণত্মক কথা বলেছিলেন ইউরোপীয়ানদের সঙ্গে। সেই ‍সুরে রুবিও কথা বলবেন, এমনটা প্রত্যাশা ছিল ইউরোপিয়ানদের।

তবে, গত বছরের নিরাপত্তা সম্মেলনে ভ্যান্স ইউরোপীয়দের মিথ্যা অভিযোগে অভিযুক্ত করেছিলেন। তখন তিনি বলেছিলেন, ‘ইউরোপ এখন বাকস্বাধীনতা ও গণতন্ত্র দমন করছে। তারা পতনের মুখোমুখি। যার কারণে যুক্তরাষ্ট্র জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলে সংরক্ষিত করেছে।’ এবারের নিরাপত্তা সম্মেলনে রুবিও তেমন কোনও কিছু বলেননি।

চলতি বছরের শুরুতে রুবিও বলেছিলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র তার নিজস্ব মূল্যবোধ অনুযায়ী পুনর্গঠনে প্রস্তুত।’ যদিও তিনি ইউরোপের সঙ্গে আমেরিকার ঐতিহাসিক সংযোগকে স্মরণ করিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের সেই মূল্যবোধের মধ্যে রয়েছে খ্রিস্টান ধর্ম গ্রহণ করা ও একটি যৌথ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে স্বীকৃতি দেওয়া, সীমান্ত বন্ধ করা এবং জলবায়ু সংকট নীতিগুলো ত্যাগ করা। যুক্তরাষ্ট্র বহু দশক ধরে মিত্র দেশগুলোকে বলে আসছে তারা একটি সংস্কারকৃত ইউরোপকে দেখতে চায়। সেই সংস্কারে শুধু প্রতিরক্ষা বাজেটের বিবরণ নয়, থাকবে মহাদেশের মূল্যবোধ ব্যবস্থায় মৌলিক পরিবর্তন।

রুবিও বলেছেন, ‘ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিনে একে অপরকে আঁকড়ে আছে এবং ভবিষ্যতেও থাকা দরকার’। তবে, পতনের দিকে যাওয়া সম্পর্কের মধ্যে একটি বার্তাটি স্পষ্ট ছিল, ‘চেঞ্জ অর বি ডাম্পড।’ যার মানে, বদলে যাও নতুবা ফেলে দেওয়া হবে।

নিরাপত্তা সম্মেলনের আগে এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, কনফারেন্স আয়োজকরা সতর্ক করে জানিয়েছে বিশ্ব এখন ‘ধ্বংসযজ্ঞ রাজনীতির’ যুগে রয়েছে, যা ইউরোপকে একটি দিকে ঠেলে দিয়েছে। আর বর্তমানে রুবিও উদার মধ্যপন্থি বিদেশি নেতাদের বলছেন, তাদের সম্পূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি ভুল, যা চরম ডানপন্থি জনপ্রিয়তাবাদী প্রতিপক্ষদের প্রতিধ্বনি করছে। এ প্রতিধ্বনি আসন্ন নির্বাচনে তাদের ক্ষমতাচ্যুত করতে পারে।

মিউনিখ মঞ্চে যুক্তরাষ্ট্রের কূটনীতিকের কথা তাদের মিত্রদের পূর্ববর্তী যুক্তিগুলোর জন্য কোনও স্থান রাখেননি। সম্মেলনের একদিন আগে জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎস বলেছিলেন, মাগা (মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন) সংস্কৃতি এমন কিছু নয় যা নিয়ে ইউরোপকে লড়াই করতে হবে। আর ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাঁক্রো ভূখণ্ডগত সার্বভৌমত্বকে ফরাসিদের নিজস্ব ভ্রান্ত তথ্য ও গণতন্ত্র নিয়ন্ত্রণের অধিকারকে সমান হিসেবে বিবেচনা করছেন।

সম্মেলন শুরু দুই ঘণ্টা বাদেই ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি মাগা ইস্যুকে কেন্দ্রস্থল থেকে সরাতে ইউরোপীয় নেতাদের প্রতি আহ্বান জানান। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর প্রথমবারের মতো হুমকিতে থাকা ইউরোপের নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকারে রাখতে বলেন তিনি। জেলেনস্কি ইউক্রেনের টিকে থাকার অসীম ক্ষমতা ও রাশিয়ার নৃশংসতার বিষয়টি উচ্চারণ করেন। এর মাধ্যমে ইউরোপের নিজস্ব প্রতিরক্ষা কৌশলের প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট হয়।

ইউক্রেনের প্রতিটি বিদ্যুৎ কেন্দ্র রুশ হামলার শিকার হয়েছে তা সম্মেলনে উপস্থিতদের জানায় ইউক্রেন। পাশাপাশি ইউক্রেনের প্রতি কিলোমিটার দখলে নিতে রাশিয়াকে ১৫৬ জন ইউক্রেনীয় সেনা হত্যা করতে হয়েছে বলে জানান তিনি। জেলেনস্কি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রতি যে অখুশি তা তার দেওয়া ইংরেজি দেওয়া ভাষণে স্পষ্ট। তিনি শান্তি প্রক্রিয়ার প্রতি হতাশা প্রকাশ করেছেন। এই শান্তি প্রক্রিয়ায় ইউক্রেনকে ভূখণ্ড ছাড় দিতে চাপ দেওয়া হয়েছিল। জেলেনস্কি এমন ধারণাকেও বিদ্রুপ করেছেন। এই প্রক্রিয়াকে মস্কো ‘অ্যাঙ্করেজ স্পিরিট’ হিসেবে অভিহিত করা হয়েছিল।

যখন জেলেনস্কি কথা বলছিলেন ঠিক তখন তার পেছনের দেয়ালে ভিডিও ফুটেজ চলছিল। ওই ভিডিওতে দেখানো হচ্ছিলো, কীভাবে নতুন ইউক্রেনীয় প্রযুক্তি রাশিয়ার ড্রোন ধ্বংস করছে।

রুবিওর অবস্থান হলো, ইউরোপকে নিজেকে প্রতিরক্ষায় স্বাবলম্বী হতে হবে। সম্মেলনে অংশ নেওয়া ইউরোপীয়রা ইউক্রেনকে অনুকরণ করবে, হাঙ্গেরির মতো হবে না। সামগ্রিকভাবে, রুবিওর বক্তব্যকে ইউরোপীয় নেতারা ইতিবাচক হিসেবে নিতে পারেন। তবে, গত এক বছরে ইউক্রেন ইস্যু ও এক মাস আগে সৃষ্ট গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের অবস্থানের ভিন্নতা রুবিওর বক্তব্যতে স্পষ্ট হয়েছে।

সম্মেলনে ডেনমার্কের স্বায়ত্বশাসিত অঞ্চল গ্রিনল্যান্ড নিয়ে তেমন কোনও আলোচনা হয়নি। এর মানে দাঁড়ায় ইস্যুটির ভবিষ্যৎ নিয়ে খুব ধীরগতিতে চলছে সবাই। কিন্তু কয়েক সপ্তাহ আগেও গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতে ন্যাটো জোট ভাঙার উপক্রম হয়েছিল।

প্রশ্নোত্তর পর্বে একবারও ইউক্রেন নিয়ে কথা বলেননি মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তবে, তিনি রাশিয়ার কথা তুলে ধরে বলেছেন, মস্কো শান্তি চুক্তি চায় কিনা তা নিয়ে এখনও সন্দিহান ট্রাম্প প্রশাসন।

সম্মেলনে ইউরোপীয় নেতাদের বক্তব্য অনুপ্রেরণামূলক ছিল না। নিজেদের লক্ষ্য পূরণে তাদের পর্যাপ্ত অর্থ নেই এমনটা প্রতীয়মান হচ্ছিল। প্রতি বছর মিউনিখ সম্মেলনে ইউরোপীয় নেতারা আরও কাজ করার প্রতিশ্রুতি দেয়। সামরিক খাতে আরও অর্থ খরচের কথা বললেও পরবর্তীকে তাদের কোনও পরিবর্তন দেখা যায় না।

আগামী ন্যাটো সম্মেলনের আগেই ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার বিদায় নেবেন তা এক প্রকার নিশ্চিত। আর ম্যাঁক্রো প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের মুখোমুখি হবেন। একই সময়ে ট্রাম্পকে মধ্যবর্তী নির্বাচনের ঝামেলা পোহাতে হবে। এর মানে দাঁড়ায় গ্রিনল্যান্ড ইস্যু আরও জটিল হবে। ইউক্রেন শুধু আশা করবে। আর যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের সম্পর্কের আরও পতনের দিকে যাবে।