ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলীয় সম্মুখসমরে যুদ্ধ করছেন ৩৫ বছর বয়সী সৈনিক ম্যাক্সিম। আকাশজুড়ে রুশ ড্রোন আর কামানের গোলার শব্দের মাঝেই তিনি ভাবছেন তার দেশের ভবিষ্যতের কথা। তবে এই ভাবনা কেবল মানচিত্র রক্ষা নিয়ে নয়, বরং ইউক্রেনীয়দের অস্তিত্ব বা বংশধারা টিকিয়ে রাখা নিয়ে। মাক্সিম সম্প্রতি ছুটিতে বাড়ি ফিরে কিভের একটি ক্লিনিকে নিজের শুক্রাণু জমিয়ে রেখে এসেছেন।
ম্যাক্সিম বলেন, আমাদের পুরুষরা মারা যাচ্ছে। ইউক্রেনের জিনপুঞ্জ শেষ হয়ে যাচ্ছে। এটি এখন আমাদের জাতির টিকে থাকার লড়াই।
যদি ম্যাক্সিম যুদ্ধে প্রাণ হারান, তবে তার স্ত্রী এই হিমায়িত শুক্রাণু ব্যবহার করে তাদের কাঙ্ক্ষিত সন্তান জন্ম দিতে পারবেন।
রাশিয়ার আক্রমণের আগে থেকেই ইউক্রেন জনসংখ্যাগত সংকটে ছিল। যুদ্ধের চার বছরে হাজার হাজার তরুণের মৃত্যু এবং লাখ লাখ মানুষের, প্রধানত নারীর দেশত্যাগে সেই সংকট এখন ‘মহা-বিপর্যয়ে’ রূপ নিয়েছে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় ২০২২ সাল থেকে কিছু বেসরকারি ক্লিনিক সৈনিকদের জন্য শুক্রাণু ও ডিম্বাণু বিনামূল্যে হিমায়িত করে রাখার সুযোগ দিচ্ছে। ২০২৩ সালে ইউক্রেনীয় পার্লামেন্ট এই প্রক্রিয়ার জন্য রাষ্ট্রীয় অর্থায়নের আইন পাস করে।
আইনটির অন্যতম রূপকার এমপি ওকসানা দিমিত্রিভা বলেন, আমাদের সৈনিকরা ভবিষ্যতের সুরক্ষা দিচ্ছে, কিন্তু তারা হয়তো নিজেদের ভবিষ্যৎ হারাচ্ছে। আমরা তাদের সেই সুযোগটি দিতে চাই।
শুরুতে এই আইনে একটি বিতর্কিত শর্ত ছিল, তা হলো-দাতার মৃত্যু হলে তার জমিয়ে রাখা নমুনা ধ্বংস করে ফেলতে হবে। একজন যুদ্ধবিধবা তার মৃত স্বামীর শুক্রাণু ব্যবহার করতে গিয়ে আইনি বাধার মুখে পড়লে দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভ তৈরি হয়। পরে আইনটি সংশোধন করা হয়। বর্তমানে দাতার মৃত্যুর পর তিন বছর পর্যন্ত নমুনাগুলো বিনামূল্যে সংরক্ষণ করা হয়, যাতে দাতার লিখিত সম্মতি থাকলে তার সঙ্গী তা ব্যবহার করতে পারেন।
কিয়েভ স্টেট সেন্টার ফর রিপ্রোডাক্টিভ মেডিসিনের পরিচালক ওকসানা হোলিকোভা জানান, যুদ্ধের কারণে অন্তঃসত্ত্বা রোগীর সংখ্যা অর্ধেক কমে গেছে। রুশ ক্ষেপণাস্ত্র আর ড্রোন হামলার আতঙ্কে নারীরা এখন সন্তান নিতে ভয় পাচ্ছেন। তিনি বলেন, আমার রোগীদের প্রায় ৬০ শতাংশই বিষণ্ণতা কাটানোর ওষুধ নিচ্ছেন। এটাকে আমরা বিলম্বিত জীবন সিনড্রোম বলছি; যুদ্ধের ভয়ে মানুষ বড় সিদ্ধান্তগুলো স্থগিত রাখছে।
অন্যদিকে যুদ্ধের ময়দানে থাকা পুরুষদের প্রজনন ক্ষমতাও কমছে। ম্যাক্সিম জানান, সম্মুখসমরে বা তার আশপাশে থাকা মানেই প্রচণ্ড মানসিক চাপ, যা প্রজনন ক্ষমতার ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে।
ক্যাটেরিনা মালিশকো এবং তার স্বামী ভিতালি অনেকদিন ধরে সন্তান নেওয়ার চেষ্টা করছিলেন। গত শীতে তাদের তিনটি ভ্রূণ ক্লিনিকে তৈরি ছিল। কিন্তু ভ্রূণ স্থানান্তরের ঠিক আগেই গাইডেড বোমার আঘাতে ভিতালি নিহত হন। ক্যাটেরিনা যখন সেই ভ্রূণ ব্যবহার করতে চাইলেন, ক্লিনিক তাকে বাধা দেয়। দীর্ঘ ছয় মাসের যন্ত্রণাদায়ক আইনি লড়াইয়ের পর আদালত ক্যাটেরিনার পক্ষে রায় দেন।
ক্যাটেরিনা বলেন, আমি আনন্দ আর দুঃখ একসঙ্গেই অনুভব করেছি। আমার স্বামীর সম্মানেই আমি এই লড়াই করেছি। আমাদের শহীদ সৈনিকদের সন্তানদের পৃথিবীর আলো দেখার অধিকার আছে।
সরকার এখন সম্মুখসমরে থাকা সৈনিকদের এই বিষয়ে সচেতন করতে নিয়মিত প্রচারণা চালাচ্ছে। ম্যাক্সিম মনে করেন, সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার সময় যেভাবে ডিএনএ নমুনা রাখা হয়, ঠিক সেভাবেই শুক্রাণু সংরক্ষণের বিষয়টি বাধ্যতামূলক করা উচিত।
রাজধানী কিয়েভের সরকারি ল্যাবরেটরিতে তরল নাইট্রোজেনের বিশাল পাত্রগুলো থেকে এখন সাদা ধোঁয়া বের হয়। সেখানে সারি সারি সরু টিউবে সংরক্ষিত হচ্ছে হাজারো সৈনিকের স্বপ্ন। ইউক্রেনের জন্য এটি কেবল চিকিৎসা বিজ্ঞান নয়, বরং যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি জাতির আবার জেগে ওঠার শেষ আশা।
বিবিসি অবলম্বনে।