অক্সফোর্ডের ভুয়া ডিগ্রি ও জালিয়াতি: বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত সাবেক এমপি প্রার্থীর কারাদণ্ড

হতে চেয়েছিলেন ব্রিটেনের এমপি। চেয়েছিলেন নাম, খ্যাতি ও অর্থ সবই। কিন্তু বাঁধ সাধলো নিজের সীমাহীন প্রতারণা। যুক্তরাজ্যে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ভুয়া ডিগ্রি ও জাল কাগজপত্র ব্যবহার করে জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা খাতে (এনএইচএস) প্রায় ১ লাখ ৭০ হাজার পাউন্ড আত্মসাতের দায়ে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত আমরান হোসেন (৪০) নামের এক সাবেক লেবার পার্টি প্রার্থীকে চার বছরের কারাদণ্ড দিয়েছে যুক্তরাজ্যের মেডস্টোন ক্রাউন কোর্ট।

ব্রিটিশ পার্লামেন্টে এমপি হওয়ার উচ্চাকাঙ্ক্ষা থেকে শুরু করে বিভিন্ন সরকারি উচ্চপদে টানা আট বছর ধরে চলেছে আমরানের এই অভিনব প্রতারণা।

আদালত ও তদন্ত সূত্রে জানা যায়, ২০১৫ সালের যুক্তরাজ্যের সাধারণ নির্বাচনে নর্থ ইস্ট হ্যাম্পশায়ার আসন থেকে লেবার পার্টির প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন আমরান হোসেন। নির্বাচনে বিপুল ভোটে পরাজিত হওয়ার পর তিনি সরকারি খাতে প্রতারণার জাল বিস্তার করতে শুরু করেন।

২০১৪ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে আমরান এনএইচএস ও বিভিন্ন প্রশাসনিক সংস্থায় ২ হাজার ৭১টি চাকরির আবেদন জমা দেন। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় ও বার্কবেক ইউনিভার্সিটির ভুয়া মাস্টার্স ডিগ্রি সনদ এবং নিজ নিয়ন্ত্রিত ভুয়া ইমেইল অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে তৈরি করা রেফারেন্স ব্যবহার করে তিনি ১৩টি জ্যেষ্ঠ প্রশাসনিক পদে নিয়োগ পেতে সক্ষম হন। এসব পদের মধ্যে বার্ষিক ৭৮ হাজার পাউন্ডের বেশি বেতনের পদও ছিল।

উচ্চ বেতনের পদে যোগদানের পরই আমরান কৌশল বদলে ফেলতেন। কাজ এড়াতে তিনি পোস্ট-কোভিড জটিলতা, ক্লান্তি, মাইগ্রেন ও শারীরিক বেদনাসহ বিভিন্ন অজুহাতে দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থতাজনিত ছুটি নিতেন। তার মোট ১ হাজার ৯০২ দিনের চাকরিজীবনের মধ্যে ১ হাজার ৩৩২ দিনই তিনি অসুস্থতার অজুহাতে কাটান। অর্থাৎ চাকরির ৭০ শতাংশ সময় কোনও কাজ না করেই সরকারি কোষাগার থেকে তিনি প্রায় ১ লাখ ৬৮ হাজার পাউন্ড তুলে নেন।

তার এই জালিয়াতির ব্যাপ্তি কেবল স্বাস্থ্যসেবা খাতেই সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি কেন্ট কাউন্টি কাউন্সিল, নটিংহাম সিটি কেয়ার পার্টনারশিপ এবং ইউকে হেলথ সিকিউরিটি এজেন্সিতেও পদে আসীন হন। এমনকি পুলিশি জামিনে থাকা অবস্থায় ২০২৩ সালে ওয়েস্টারহাম টাউন কাউন্সিলে স্থানীয় কাউন্সিলর হিসেবে নির্বাচিত হন।

২০২১ সালে ডেভন পার্টনারশিপ এনএইচএস ট্রাস্টে ৯০ হাজার পাউন্ড বেতনের ডেপুটি চিফ অপারেটিং অফিসার পদের জন্য আবেদন করার পর তার প্রতারণা ধরা পড়ে। নিয়োগের প্রাক-যাচাইয়ে এনএইচএস ইলেকট্রনিক স্টাফ রেকর্ড (ইএসআর) সিস্টেমে তার দেওয়া পূর্ব অভিজ্ঞতার সত্যতা পাওয়া যায়নি। পরবর্তী তদন্তে এনএইচএস কাউন্টার ফ্রড অথরিটি নিশ্চিত করে যে আমরান হোসেন কখনোই অক্সফোর্ড বা বার্কবেক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিলেন না।

২০২২ সালের ২৪ নভেম্বর কেন্টের ওয়েস্টারহামে লর্ড অ্যাস্টরের এস্টেটে অবস্থিত একটি ভাড়া কটেজ থেকে তাকে গ্রেফতার করে পুলিশ। বিচারে তিনি নিজের অপরাধ ঢাকতে নিজেকে ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর সাবেক সদস্য দাবি করলেও তা আদালতে মিথ্যা প্রমাণিত হয়। আদালত তাকে প্রতারণার তিনটি অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করে চার বছরের কারাদণ্ডাদেশ দেন।

এনএইচএস কাউন্টার ফ্রড অথরিটির অপারেশন্স প্রধান বেন হ্যারিসন বলেন, আমরান হোসেন পরিকল্পিতভাবে মিথ্যা তথ্য দিয়ে এনএইচএসের শীর্ষ পদগুলো হাতিয়ে নিয়েছিলেন, যা সরকারি স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার আস্থা ও অর্থ দুটোই ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।

কারাদণ্ডাদেশের পর এখন আত্মসাৎ করা অর্থ উদ্ধারে প্রসিডস অব ক্রাইম অ্যাক্ট-এর অধীনে আইনি বাজেয়াপ্তকরণ প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। একইসঙ্গে এনএইচএস ও স্থানীয় প্রশাসনিক সংস্থায় নিয়োগের ক্ষেত্রে রিয়েল-টাইম সার্টিফিকেট যাচাই ও কঠোর প্রাক-নিয়োগ ব্যবস্থা কার্যকর করা হচ্ছে।