সার্বিয়ার প্রেসিডেন্ট আলেকজান্ডার ভুচিচ পদত্যাগ করেছেন। এক বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা ছাত্র-নেতৃত্বাধীন আন্দোলন এবং সরকারের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার অভিযোগকে কেন্দ্র করে ক্রমবর্ধমান জনঅসন্তোষের মুখে তিনি এই পদ ছাড়লেন। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি এ খবর জানিয়েছে।
রাজধানী বেলগ্রেডে প্রেসিডেন্সিয়াল ভবনের বাইরে সমর্থকদের উদ্দেশ্যে দেওয়া বক্তব্যে ভুচিচ বলেন, তার ৯ বছরের মেয়াদকালে তার প্রশাসন শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রেখেছে।
সংবিধান অনুযায়ী ভুচিচ তৃতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্ট পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবেন না। তিনি গত জুনেই পদত্যাগের ইচ্ছার কথা ঘোষণা করেছিলেন এবং আসন্ন সংসদ নির্বাচনে তার দলের প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী হিসেবে লড়াই করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
এই রুশপন্থি পপুলিস্ট নেতার প্রশাসন দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগের মুখে পড়েছিল। মূলত ২০২৪ সালে নোভি সাদ রেলওয়ে স্টেশনের ছাদ ধসে ১৬ জনের মৃত্যুর ঘটনা সরকারের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দেয়।
এরপর থেকেই শিক্ষার্থী ও শিক্ষক থেকে শুরু করে শ্রমিক ও কৃষকদের অংশগ্রহণে ব্যাপক বিক্ষোভ শুরু হয়। বিক্ষোভকারীদের বিশ্বাস ছিল, এই বিপর্যয়টি এক দশকেরও বেশি সময় ধরে ভুচিচের প্রগ্রেসিভ পার্টির শাসনের বাস্তব চিত্র তুলে ধরে। কারণ ভুচিচ নিজেই সার্বিয়ার অগ্রগতির প্রতীক হিসেবে বিবেচিত ওই স্টেশনের সংস্কার কাজের সাথে নিজেকে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত করেছিলেন।
সংকটে থাকা প্রেসিডেন্টের অধীনে দায়িত্ব পালনকারী বেশ কয়েকজন কর্মকর্তার পদত্যাগের পরও বিক্ষোভকারীরা শান্ত হননি। তারা পুরো গ্রীষ্মজুড়ে আন্দোলন চালিয়ে যান এবং পরবর্তীতে পুলিশের বিরুদ্ধে বর্বরতার অভিযোগ ওঠার পর বিক্ষোভ আরও তীব্র রূপ নেয়।
সংবিধান অনুযায়ী আগামী বছর ভুচিচের প্রেসিডেন্সির মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ছিল। সার্বিয়ার সংবিধান অনুযায়ী, প্রেসিডেন্ট পদত্যাগের সর্বোচ্চ তিন মাসের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে হবে। এর অর্থ হলো, সার্বিয়ার নাগরিকদের বছরের শেষ হওয়ার আগেই দুবার ভোট দিতে যেতে হবে।
ভুচিচ জানান, অক্টোবরের শেষের দিকে অনুষ্ঠিতব্য আগাম সংসদ নির্বাচনের এক মাসেরও বেশি সময় পর প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এই সংসদ নির্বাচনটি মূলত আন্দোলনের মুখে ডাকা হয়েছিল, যেখানে বিক্ষোভকারীরা নির্বাচনের দাবিও তুলে ধরেছিলেন। এর আগে তিনি ঘোষণা করেছিলেন যে তিনি প্রগ্রেসিভ পার্টির নেতা হিসেবে সেই নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার পরিকল্পনা করেছেন, যার মাধ্যমে সার্বিয়ার ক্ষমতার চূড়ায় তার অবস্থান ধরে রাখার সম্ভাবনা রয়েছে।
নতুন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত প্রগ্রেসিভ পার্টির সদস্য ও সংসদ স্পিকার আনা ব্রনাবিচ অন্তর্বর্তীকালীন রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করবেন।
সার্বিয়ান পাবলিক ব্রডকাস্টার আরটিএস-এর তথ্য অনুযায়ী, ভুচিচ তার সাংবিধানিক ক্ষমতা ব্যবহার করে ৪৯ জনকে ক্ষমা করে দিয়েছেন। এর মধ্যে ২৩ জন ছাত্র এবং দলের অনুসারী রয়েছেন, যারা গত দেড় বছরে ঘটে যাওয়া ভয়াবহ ঘটনাসংক্রান্ত অপরাধের অভিযোগে সন্দেহভাজন ছিলেন।
আসন্ন সংসদ নির্বাচনে ভুচিচের প্রগ্রেসিভ পার্টি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে ‘স্টুডেন্টস উইন’ নামের একটি ছাত্র-নেতৃত্বাধীন দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলন এবং ‘ইউরোপীয় সার্বিয়া’ নামে প্রো-ওয়েস্টার্ন বিরোধী জোটের বিরুদ্ধে।
ভুচিচ এক দশকেরও বেশি সময় ধরে সার্বিয়ান রাজনীতির কেন্দ্রীয় ব্যক্তিত্ব হিসেবে রয়েছেন। ২০১৪ সালে তিনি প্রধানমন্ত্রী হন এবং পরবর্তীতে ২০১৭ সালে প্রথমবারের মতো প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। তিনি প্রকাশ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়নে যোগদানের ইচ্ছা প্রকাশ করার পাশাপাশি রাশিয়ার সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখেছেন এবং চীনের বিনিয়োগের জন্য সার্বিয়ার দ্বার উন্মুক্ত করেছেন।