কী, কেন, কীভাবে

ফ্রান্সে বর্ণবাদী হামলা, ইউরোপজুড়ে কি বাড়ছে ইসলামবিদ্বেষ?

ফ্রান্সের উত্তরাঞ্চলে বর্ণভিত্তিক ও ইসলামবিদ্বেষ প্রেরণা থেকে চালানো এক ‘সন্ত্রাসী’ হামলায় একজন কৃষ্ণাঙ্গ প্রাণ হারিয়েছেন এবং ১২ বছর বয়সী এক শিশুসহ অন্তত পাঁচজন আহত হয়েছেন। নিত্যপণ্যের ঊর্ধ্বগতি ও জীবনযাত্রার ব্যয়বৃদ্ধির প্রতিবাদে দেশজুড়ে চলা তীব্র আন্দোলনের মধ্যেই শুক্রবার এই সহিংস ঘটনাটি ঘটলো।

ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ এই হামলাকে একটি ‘সন্ত্রাসী ও বর্ণবাদী আক্রমণ’ বলে আখ্যায়িত করেছেন এবং এটিকে প্রজাতন্ত্র ও জাতির জীবনে এক মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার মতো ঘটনা বলে উল্লেখ করেছেন। বর্ণবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের কথা পুনর্ব্যক্ত করে তিনি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর প্রতি গভীর সমবেদনা জানান।

শুক্রবার সকাল আনুমানিক সাড়ে ১০টায় প্যারিসের উপকণ্ঠে অভিবাসী ও মুসলিম অধ্যুষিত ট্রাপেস ও লা ভারিয়ারে এলাকায় এই হামলার ঘটনা ঘটে। ৩৯ বছর বয়সী কেভিন টি নামের হামলাকারী একটি স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র নিয়ে পেট্রোল পাম্প, মেডিকেল সেন্টার এবং একটি শিশুপার্কে এলোপাতাড়ি গুলি চালায়। প্রায় ১৫ মিনিট ধরে চলা এই তাণ্ডবের পর তাকে গ্রেফতার করা হয়। স্থানীয় এমপি লরেন্ট মাজোরি জানান, গ্রেফতারের পর অভিযুক্ত ব্যক্তি পুলিশকে বলেছে সে ‘বিদেশীদের হত্যা করতে চেয়েছিল’। পুলিশ তার গাড়ি থেকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ের একটি সেমি-অটোমেটিক অস্ত্র ও টিয়ার গ্যাসের গ্রেনেড উদ্ধার করেছে।

হামলায় পেঙ্গো বাসিসিও ওয়াঙ্গি নামে এক তরুণ কৃষ্ণাঙ্গ নিহত হয়েছেন। আহতদের মধ্যে মাথায় হিজাব পরিহিত এক নারী এবং ১২ বছর বয়সী এক উত্তর আফ্রিকান বংশোদ্ভূত শিশু রয়েছে। শিশুটির মা ফরাসি সম্প্রচারমাধ্যম আরটিএল-কে জানান, তার মেয়েকে লক্ষ্য করে আটটি গুলি করা হয়েছে এবং সংকটাপন্ন অবস্থায় তার অস্ত্রোপচার চলছে। প্রসিকিউটররা জানিয়েছেন, আহত পাঁচজনের মধ্যে তিনজনের অবস্থা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক।

ফরাসি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরেন্ট নুনেজ নিশ্চিত করেছেন যে, এটি সুস্পষ্টভাবে একটি সন্ত্রাসী অপরাধ। তদন্তকারীরা খতিয়ে দেখছেন যে হামলাকারী কোনও সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত ছিল কি না। ইতোমধ্যে তার এক নিকটাত্মীয়কে হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। ট্রাপেসের মেয়র আলী রাবে এটিকে একটি বর্ণবাদী ও ইসলামবিদ্বেষ হামলা উল্লেখ করে বলেন, উগ্র ডানপন্থী গোষ্ঠীগুলোর ক্রমাগত মুসলিমবিরোধী রাজনৈতিক প্রচারণাই এই ধরনের হত্যাকাণ্ডের জন্ম দিচ্ছে।

এই হামলাটি এমন এক সময়ে ঘটেছে যখন জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি ও শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভে পুরো দেশ উত্তাল। সার্বিক নিরাপত্তায় শনিবার ৭০ হাজার পুলিশ সদস্য মোতায়েন করেছে প্রশাসন। অন্যদিকে বর্ণবাদী এই হামলার নিন্দা জানিয়েছেন উগ্র ডানপন্থী ন্যাশনাল র্যা লি দলের নেতা মারিন ল্য পেন। তবে ফ্রেঞ্চ মুসলিম কাউন্সিল তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছে, যারা মুসলিমবিদ্বেষী বক্তব্য ছড়ায় তাদের হাতেই আক্রান্তদের রক্ত লেগে আছে।

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ও ইইউ ফান্ডামেন্টাল রাইটস এজেন্সির তথ্য অনুযায়ী, ইউরোপজুড়ে সাম্প্রতিক সময়ে মুসলিমদের বিরুদ্ধে বর্ণবাদ ও ঘৃণামূলক অপরাধ মারাত্মকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, ইউরোপের প্রতি দুইজন কোনেও না কোনোভাবে বৈষম্যের শিকার হন। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রেও কাউন্সিল অন আমেরিকান-ই ইসলামিক রিলেশন্স ফ্রান্সে এই হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে।