পোল্যান্ডে পুলিশ পাহারায় আদালত, মাঝপথে দেশে ফিরলেন প্রেসিডেন্ট

পুলিশ পাহারায় আদালত, সরকারের পদক্ষেপের বিরুদ্ধে বিক্ষোভকারীদের অবস্থান এবং আকাশপথে বিদেশ সফর বাতিল করে ফিরে আসা প্রেসিডেন্ট। পোল্যান্ডের সর্বশেষ সাংবিধানিক টানাপোড়েনে রাজনৈতিক সংকটের সব উপাদানই ছিল। 

এর কেন্দ্রে রয়েছে দেশটির বিচারব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে তীব্র লড়াই, যেখানে মুখোমুখি ডোনাল্ড টাস্কের ইউরোপপন্থী সরকার ও বিরোধী দল ল অ্যান্ড জাস্টিস (পিআইএস)।

কয়েকজন বিক্ষোভকারী আদালতের ঘেরা বেড়া ভেঙে ঢুকে পড়লে এবং অন্যরা পুলিশের দিকে বস্তু ছুড়লে দাঙ্গা পুলিশ মোতায়েন করা হয়। পুলিশ জানায়, সংঘর্ষের সময় তিনজনকে আটক করা হয়েছে।

বিরোধ আরও তীব্র হয় যখন বিচারমন্ত্রী ভালদেমার জুরেক সাংবিধানিক ট্রাইব্যুনালের প্রধান স্ভিয়েচকোভস্কি ও ট্রাইব্যুনালের ভাইস প্রেসিডেন্ট বার্তোমিয়েই সোখানস্কির বিচারিক দায়মুক্তি তুলে নিতে চান, যাতে তাদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি কার্যক্রম শুরু করা যায়।

সরকারের এ পদক্ষেপের কড়া সমালোচনা করেছেন পিআইএস নেতারা। তাদের অভিযোগ, টাস্কের প্রশাসন দেশের সাংবিধানিক শৃঙ্খলা ক্ষুণ্ন করছে। পিআইএস-সমর্থিত পোলিশ প্রেসিডেন্ট কারোল নাভরোকিও এ ঘটনাপ্রবাহের মধ্যে সেনেগাল সফর সংক্ষিপ্ত করে ওয়ারশ ফিরে এসেছেন। ডাকারে গ্রীষ্মকালীন ইয়ুথ অলিম্পিক গেমসে যোগ দিতে যাওয়ার পথে তিনি ফিরে আসার ঘোষণা দেন। এক্স-এ তিনি লেখেন, এমন মুহূর্তে প্রেসিডেন্টকে পোল্যান্ডে থাকতেই হবে। আমি সেনেগালের যাত্রা সংক্ষিপ্ত করছি। আমি ফিরছি।

বিচারব্যবস্থা নিয়ে সরকার ও বিরোধীদের সংঘাত

সাম্প্রতিক এ সংঘাত পোল্যান্ডে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, বিশেষ করে সাংবিধানিক ট্রাইব্যুনালের গঠন ও কার্যক্রম নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধের অংশ। ২০১৫ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকা পিআইএস-নেতৃত্বাধীন সরকার বিচার বিভাগে এমন পরিবর্তন আনে, যা শাসক দলকে প্রধান বিচারিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ দিয়েছে বলে পোল্যান্ড ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সমালোচকেরা মনে করেন।

পরে ইউরোপীয় মানবাধিকার আদালত ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের ন্যায়বিচার আদালত রায় দেয়, পিআইএস সরকারের আমলে নিয়োগ পাওয়া তিন বিচারক অনিয়মিতভাবে নির্বাচিত হয়েছিলেন, কারণ ওই পদগুলো আগের পার্লামেন্ট আগেই পূরণ করেছিল। ইউরোপীয় আদালতগুলো ট্রাইব্যুনালের স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে।

২০২৩ সালে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা পুনরুদ্ধার এবং পিআইএসের আনা পরিবর্তন ফিরিয়ে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় আসেন টাস্ক। তবে বিশেষ করে বিরোধীদের সঙ্গে সংযুক্ত পরপর দুই প্রেসিডেন্ট নাভরোকি ও তার পূর্বসূরি আন্দ্রেই দুদার বাধার মুখে পড়েছে তার উদ্যোগ। তারা ভেটো ক্ষমতা ব্যবহার করে প্রস্তাবিত সংস্কার আটকে দিয়েছেন।

মার্চ থেকে পার্লামেন্টের নির্বাচিত পাঁচ বিচারককে শপথ পড়াতেও নাভরোকি অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। নির্বাচন প্রক্রিয়া নিয়ে উদ্বেগের কথা তিনি উল্লেখ করেন। তাদের একজন আন্না করভিন-পিওত্রভস্কাকে এখন ট্রাইব্যুনালের অস্থায়ী দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

শীর্ষ বিচারকের বহিষ্কারে আইনি বিতর্ক

শুক্রবার সন্ধ্যায় সাংবিধানিক ট্রাইব্যুনালের ওয়েবসাইটে সোভিয়েচকোভস্কিকে সাসপেনশনের তথ্য প্রকাশ করা হয়। এর কিছুক্ষণ পরই ওয়েবসাইটটি বন্ধ হয়ে যায়। ফলে পদক্ষেপের সরকারি কারণ স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি।

সোভিয়েচকোভস্কিকে পিআইএস সরকারের আমলে ট্রাইব্যুনালের প্রেসিডেন্ট হন। টাস্কের অভিযোগ, বর্তমান সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার নির্বাচিত বিচারকদের দায়িত্ব নেওয়া তিনি আটকে দিচ্ছেন।

সোভিয়েচকোভস্কিকে ও সোখানস্কির বিরুদ্ধে ফৌজদারি কার্যক্রম চালুর বিচারমন্ত্রণালয়ের উদ্যোগ বিরোধ আরও তীব্র করেছে। জুরেক বলেন, নবনির্বাচিত বিচারকদের ট্রাইব্যুনালের কার্যক্রমে অংশ নিতে বাধা দেওয়ার জন্য দুই জ্যেষ্ঠ বিচারকের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা উচিত।

তবে সাংবিধানিক ট্রাইব্যুনাল নিজেদের নেতৃত্বের অবস্থান রক্ষা করেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে তারা বলেছে, সোভিয়েচকোভস্কিকে ও সোখানস্কি আইনত নিযুক্ত জ্যেষ্ঠ বিচারকই আছেন। তাদের বিরুদ্ধে নেওয়া পদক্ষেপকে তারা অভ্যুত্থান বলে বর্ণনা করেছে। সংবিধানবিষয়ক ইউরোপীয় কাউন্সিলের উপদেষ্টা সংস্থা ভেনিস কমিশন এ মাসের শুরুতে নাভরোকিকে পার্লামেন্টের নির্বাচিত পাঁচ বিচারককে শপথ পড়াতে আহ্বান জানিয়েছিল, যাতে তারা ট্রাইব্যুনালে নিজেদের আসন নিতে পারেন।

সূত্র: ইন্ডিয়া টুডে