সুপারম্যান ভক্তরা জানেন সুপারহিরোকে পরাস্ত করার একমাত্র হাতিয়ার ‘ক্রিপ্টোনাইট’- তার নিজের গ্রহ ক্রিপ্টনের এক টুকরো খনিজ। এই খনিজের সংস্পর্শে আসলেই দুর্বল হয়ে পড়েন ‘ম্যান অব স্টিল’। এতোদিন এটি সায়েন্স ফিকশনের গল্পে সীমাবদ্ধ থাকলেও বাস্তবে ঠিক তেমনই এক খনিজের সন্ধান পেয়ে চমকে গেছেন বিজ্ঞানীরা।
সার্বিয়ার ‘জাডার ভ্যালি’ বা জাডার উপত্যকায় পাওয়া এই বিরল খনিজটির নাম দেওয়া হয়েছে ‘জাডারাইট’। ২০০৪ সালে মাইনিং খাতের শীর্ষ প্রতিষ্ঠান রিও টিন্টোর ভূতাত্ত্বিকরা এটি আবিষ্কার করেন। পরবর্তীতে বিজ্ঞানীদের বিশদ বিশ্লেষণের পর ২০০৬ সালে এটি আনুষ্ঠানিকভাবে একটি নতুন খনিজ হিসেবে স্বীকৃতি পায়।
তবে শুধু এর অস্বাভাবিক রাসায়নিক গঠনের কারণেই নয়, জাডারাইট সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে মূলত সুপারম্যানের গল্পের কাল্পনিক 'ক্রিপ্টোনাইট'-এর সঙ্গে অবিশ্বাস্য মিল থাকার কারণে।
কী এই ‘জাডারাইট’, কেন বলা হচ্ছে বাস্তব জীবনের ক্রিপ্টোনাইট?
রাসায়নিক শ্রেণিবিন্যাস অনুযায়ী জাডারাইট হলো ‘সোডিয়াম লিথিয়াম বোরন সিলিকেট হাইড্রোক্সাইড’। ২০০৬ সালে মুক্তি পাওয়া ‘সুপারম্যান রিটার্নস’ চলচ্চিত্রে মিউজিয়াম থেকে লেক্স লুথরের চুরি করা ক্রিপ্টোনাইটের কাচের পাত্রে যে রাসায়নিক নাম লেখা ছিল, তার সঙ্গে বাস্তব জীবনের এই জাডারাইটের রাসায়নিক গঠনের হুবহু মিল রয়েছে।
তবে কাল্পনিক রূপ আর বাস্তবতার মধ্যে বেশ কিছু বড় পার্থক্যও রয়েছে।
সুপারম্যান চলচ্চিত্রে দেখা উজ্জ্বল সবুজ রঙের ক্রিপ্টোনাইটের মতো নয় বাস্তব জীবনের জাডারাইট; এটি মূলত ধূসর-সাদা রঙের। এটি কোনও সুপারহিরোকে দুর্বল না করলেও জীবাশ্ম জ্বালানির বিকল্প হিসেবে শক্তি রূপান্তরে এক বিশাল সম্ভাবনা তৈরি করেছে।
কেন এতো গুরুত্বপূর্ণ এই জাডারাইট?
অস্ট্রেলিয়ার নিউক্লিয়ার সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি অর্গানাইজেশনের বিজ্ঞানী মাইকেল পেজ ‘সায়েন্স ডেইলি’-কে বলেন, ‘অলৌকিক বা অলৌকিক কোনও ক্ষমতা না থাকলেও লিথিয়াম এবং বোরনের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস হিসেবে এই প্রকৃত জাডারাইটের বিশাল সম্ভাবনা রয়েছে’।
বৈদ্যুতিক যানবাহন এবং এনার্জি স্টোরেজ সিস্টেমে ব্যবহৃত রিচার্জেবল ব্যাটারির অন্যতম প্রধান উপাদান হলো লিথিয়াম। বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন দেশ যখন জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানোর পথ খুঁজছে, তখন পরিচ্ছন্ন জ্বালানিতে রূপান্তরের এই প্রক্রিয়ায় লিথিয়ামের চাহিদা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
অন্যদিকে কাচ, সিরামিক এবং অন্যান্য উন্নত প্রযুক্তির উপকরণসহ বেশ কিছু শিল্পকারখানায় বোরন ব্যবহৃত হয়। ফলে গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল নিশ্চিত করতে চাওয়া শিল্প খাতগুলোর জন্য এই খনিজটি একটি অত্যন্ত সম্ভাবনাময় সম্পদ হতে পারে।
জাডারাইটের খনি প্রকল্পে কী ঘটেছিল?
লিথিয়াম ও বোরনের উৎস হিসেবে জাডারাইটের সম্ভাবনা বুঝতে পেরে এর মজুত কাজে লাগাতে বড় ধরনের ভূগর্ভস্থ খনি ও প্রক্রিয়াজাতকরণ প্রকল্পের পরিকল্পনা করে রিও টিন্টো। তবে প্রকল্পটি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন স্থানীয় কৃষক সম্প্রদায় ও পরিবেশবাদীরা। তাদের আশঙ্কা ছিল, খননকাজের ফলে পানিদূষণ, মাটির ক্ষয় ও প্রাকৃতিক আবাসস্থল ধ্বংসের মতো গুরুতর ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
এ নিয়ে সার্বিয়াজুড়ে ব্যাপক বিক্ষোভের পর ২০২২ সালের জানুয়ারিতে সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকল্পটির স্থানসংক্রান্ত পরিকল্পনা বাতিল করে এবং সংশ্লিষ্ট লাইসেন্স প্রত্যাহার করে নেয়। ফলে জাডারাইটের সম্ভাবনাময় খনি প্রকল্পটি আর এগোয়নি।
সূত্র: এনডিটিভি