আতশবাজি কারখানার আড়ালে বোমা, এই অভিযোগে উত্তাল পশ্চিমবঙ্গ। মঙ্গলবার সকাল ১১টায় ভয়াবহ বিস্ফোরণে কেঁপে ওঠে পূর্ব মেদিনীপুরের এগরার খাদিকুল গ্রাম। স্থানীয়রা জানাচ্ছেন, পুকুরের পাশেই একটি বাড়িতে ছিল ২টি ঘর। সেখানেই ছিল বেআইনি কারখানা। এই বাড়ির একটি ঘরেই বিস্ফোরণ হয়। বিস্ফোরণে উড়ে যায় গোটা বাড়ি। কার্যত ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয় গোটা এলাকা। দেহ ছিটকে গিয়ে পড়ে পুকুরে। ২টি পুকুরেই দেহের খোঁজে চলে তল্লাশি। এই ঘটনায় নিহত ১০। বিজেপিসহ বিরোধীদের অভিযোগ, বাজি কারখানার আড়ালে বোমা বানানো হত।
যে বাড়িতে বিস্ফোরণ হয়, শুধু কাঠামোটুকু ছাড়া সেই বাড়িতে অবশিষ্ট নেই আর কিছুই। খাদিকুল গ্রামে যেখানে বিস্ফোরণ ঘটে, সেখান থেকে এগরা থানার দূরত্ব কমবেশি ২২ কিলোমিটার। এগরা দমকল কেন্দ্রের দূরত্ব প্রায় ৩০ কিলোমিটার। ঘটনাস্থল থেকে গোপীনাথপুরে মূল রাস্তার দূরত্ব প্রায় ২ কিলোমিটার।
বাজি কারখানায় ভয়ংকর বিস্ফোরণে মৃত্যু মিছিলের পরে, ব্যবসায়ী তৃণমূল নেতা ভানু বাগের কোনও হদিশ নেই। আর গ্রামে তখন পুলিশ-প্রশাসনের প্রতি চরম ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটছে। খাদিকুল গ্রামের বাজি কারখানার মালিক ভানু বাগের বিরুদ্ধে এলাকার বাসিন্দাদের ক্ষোভের আঁচ ইতোমধ্যে টের পেয়েছে পুলিশ। এই পরিস্থিতিতে বুধবারও গ্রামে গিয়ে এগরা থানার আইসি-কে পড়তে হয় অসন্তোষের মুখে। ১০ জনের মর্মান্তিক মৃত্যুর পর বুধবার থমথমে গোটা এলাকা। গতকাল রাতেই ঘটনাস্থলে পৌঁছয় সিআইডি-র টিম। বুধবার ঘটনাস্থলে যায় ফরেন্সিক টিম। নমুনা সংগ্রহ করা হবে। কর্মকর্তাদের অনুমান, ঘটনাস্থলে পটাশিয়াম নাইট্রেট, সালফার, চারকোল জাতীয় পদার্থের হদিশ মিলতে পারে। নমুনা সংগ্রহের পর তা রাসায়নিক পরীক্ষার জন্য পাঠানো হবে।
এদিকে, ঘটনায় অভিযুক্ত ভানু বাগের খোঁজে তার ও তার পরিবারের সদস্যদের মোবাইল ফোনের টাওয়ার লোকেশনের সূত্র ধরে ভিন্ন রাজ্যে পাড়ি দিচ্ছে পুলিশ।
বুধবার রাজ্যপাল সি ভি আনন্দ বোস এগরা বিস্ফোরণ কাণ্ড নিয়ে কথা বলতে গিয়ে মমতা সরকারকে তীব্র কটাক্ষ করেন। বলেন, ‘যা হয়েছে তা বাংলার সংস্কৃতি। খুবই দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা। এই ঘটনা ঘটা উচিত হয়নি। রাজ্যে শান্তিস্থাপনে সবাইকে এক হয়ে কাজ করতে হবে।'
ঘটনায় দু’জনকে গ্রেফতার করেছে এগরা থানার পুলিশ। গ্রেফতারকৃতদের নাম দেবসুন্দর জানা ও তপন দেবনাথ।
মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, ওড়িশা সীমান্তে ঘটেছে। যিনি মালিক তাকে আগেই গ্রেফতার করা হয়েছিল। পরে আদালত থেকে জামিন পেয়ে যান। গত কয়েকদিন হলো বেআইনিভাবে ফের শুরু করেছিলেন। এরকম কিছু বাজি কারখানা সব দিকে আছে। স্থানীয় লোকজন কাজ করে। যদি সমস্যা হয়, তখন সেই দায় তাদেরই নিতে হয়। আমার বন্ধুরা এনআইএ তদন্তের দাবিতে চিৎকার করছে, তাতে আমার কোনও আপত্তি নেই। আমাদের কেউ এ ব্যাপারে জড়িত নয়। এনআইএ তদন্ত করে বিচার হলে হোক, আমাদের আপত্তি নেই। তবে আসল ব্যক্তি যেন ধরা পড়েন। কীভাবে তিনি জামিন পেলেন, তা জানতে হবে।
বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী এগরার ঘটনাস্থলে গিয়ে এদিন বলেন, ‘আমরা এনআইএ তদন্তের দাবি করছি। সেন্ট্রাল ফরেন্সিক টিমকে তদন্ত করতে হবে। নয়ত এগরা থানা প্রমাণ লোপাটের চেষ্টা করবে। পুলিশের সঙ্গে ভাগ-বাটোয়ারা ছিল। এগরা থানার আইসি ৫০ হাজার করে রুপি করে নিতেন। এই পুলিশ ও মন্ত্রীর এক মিনিটও চেয়ারে থাকা উচিত নয়। এই মৃত্যুর জন্য পুলিশ-মন্ত্রী দায়ী। তাদের বিরুদ্ধে লড়াই হবে।’
পুলিশ সুপার বলেন, আগেও তদন্ত হয়েছে। ওই বাজি কারখানা বেআইনিভাবে চলছিল। ওরা লুকিয়ে এই কারখানা চালাচ্ছিল। ভানু বাগ এর আগেও গ্রেফতার হয়েছিল। মোট তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। সাতজন আহত হয়েছেন। এদের সবার পাশে রাজ্য সরকার রয়েছে। যারা আহত তাদের বিশেষ চিকিৎসা দেওয়া হবে। আপাতত আমাদের কাছে যা খবর রয়েছে সিআইডি তদন্তভার হাতে নিতে পারবে। বাকি সব আইনি পদক্ষেপ পুলিশ করছে। ফরেন্সিক দলকে জানানো হয়েছে। বাজি কারখানাতে যারা কাজ করতেন তারাই মারা গেছেন।
এগরার ঘটনায় করা মামলায় দেওয়া হয়নি বিস্ফোরণে ধারা। আর এর ফলে পুলিশের ভূমিকায় উঠছে প্রশ্ন। যেখানে এগরার গ্রামে ভয়াবহ বিস্ফোরণে ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে। তাহলে কী, ন্যাশানাল ইনভেস্টিকেশান এজেন্সি (এনআইয়ে)-ও তদন্ত এড়াতেই দেওয়া হয়নি বিস্ফোরক আইনের ধারা? এমনই প্রশ্ন তুলছেন বিরোধী থেকে বিভিন্ন মহলে।
জানা গেছে, এই ঘটনায় পুলিশ আইপিসির ১৮৮, ২৮৬, ৩০৪ ধারায় মামলা করেছে। এছাড়া ফায়ার সার্ভিস অ্যাক্টের ২৪, ২৬ নম্বর ধারায় মামলা করা হয়েছে। কিন্তু এই মামলায় যুক্ত করা হয়নি বিস্ফোরক আইনে ধারা। ওয়াকিবহাল মহলের মতে, এমন মামলায় আর্মস অ্যাক্ট, এক্সপ্লোসিভ অ্যাক্ট, ইউপিএ ধারায় মামলা হলে এনআইয়ের সেই মামলা নিতে সুবিধা হয়। এই ধারায় মামলা হলে তার রিপোর্ট কেন্দ্রীয় স্বরাাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে পাঠাতে হয় রাজ্য পুলিশকে। ওই রিপোর্ট পড়ে কেন্দ্রীয় মন্ত্রণালয় প্রয়োজন বুঝে সরাসরি এনআইয়ের হাতে মামলা দিতে পারে। কিন্তু অন্য ধারায় মামলা হলে আদালতের নির্দেশের জন্য অপেক্ষা করতে হয়। এক্ষেত্রে কী তদন্ত প্রক্রিয়া মন্থর করার চেষ্টা করা হচ্ছে কিনা তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। ঠিক যেমন রামনবমীর শোভাযাত্রায় হামলার ঘটনায় হওয়া মামলাতেও এক্সপ্লোসিভ অ্যাক্টের ধারা দেওয়া হয়নি। ওই মামলার এফআইআর নিয়ে কলকাতা হাইকোর্টে প্রশ্নের মুখে পড়েছিল রাজ্য পুলিশ। তারপরই বিষয়টি নিয়ে এনআইয়ের তদন্ত করার নির্দেশ দিয়েছিল হাইকোর্ট।
সংবাদমাধ্যমে রাজ্যের সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা সলিল ভট্টাচার্য দাবি করেছেন, ‘এগারায় বিস্ফোরণের যে তীব্রতা দেখা গেছে, তাতে ৯ জন লোক উড়ে গিয়েছিল, যাদের মৃতদেহ পুকুরে মিলেছে। বিস্ফোরণের তীব্রতা ১০০ মিটার দূরের বাড়ির কাঁচ ভেঙে গেছে। কারখানার সিলিং উড়ে গেছে। তারপরেও মামলায় এই ধারাগুলো না দেওয়ার ব্যাপারে কৌশলগত পদক্ষেপ রয়েছে।’