এবার ভারতের জাতীয় তদন্তকারী সংস্থা বা এনআইএর আধিকারিকেরা জানলেন, বোমা মিজান ডেরা তৈরি করেছেন পশ্চিমবঙ্গের রাজধানী খাস কলকাতা শহরেই।
মেটিয়াবুরুজ ও তার আশপাশের কয়েকটি তল্লাট থেকে মিজানের কয়েকজন শিষ্যকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করছে এনআইএ। মিজানের আরও দু’জন সঙ্গীকে আটক করা হয়েছে কলকাতার পাশের জেলা হাওড়া থেকে। এদের সবাইকে জেএমবির সদস্য হিসেবে মিজান নিয়োগ করেছিলেন।
আজকালের মধ্যে তাদের কয়েকজনকে সরকারিভাবে ‘গ্রেফতার’ দেখানোর কথা এনআইএর। না হলে মামলায় তাদের গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী করা হবে।
‘বাংলা ট্রিবিউন’- এ দেড় মাস আগেই লেখা হয়েছিল, কলকাতা শহরের আশপাশে কওসর ওরফে বোমা মিজান নিয়মিত যাতায়াত করছেন এবং এনআইএর গোয়েন্দারা তাকে ধরতে জাল পেতেছেন। এনআইএ আশাবাদী ছিল, মিজান এবার ধরা পড়বেনই। কিন্তু দেখা গেল, মিজান সেই জাল কেটেও বেরিয়ে গেছেন। কলকাতা থেকে ২২ কিলোমিটার দূরে, হাওড়ার সাঁকরাইলে মিজানের একটি ডেরার হদিস সম্পর্কে জেনে ও মিজান সেখানে আছেন বলে মোটামুটি নিশ্চিত হয়ে হানা দিয়েছিলেন এনআইএর গোয়েন্দারা। শনিবার সকালে সেখানে গিয়ে গোয়েন্দা অফিসাররা বুঝতে পারেন তাদের পৌঁছতে দেড় দিন দেরি হয়ে গিয়েছে।
দিল্লি থেকে এনআইএর এক শীর্ষ কর্মকর্তা বলছিলেন, এর আগেও কখনও বীরভূমে, কখনও বর্ধমানে মিজান আমাদের হাত ফসকে বেরিয়ে গেছেন। কিন্তু সে সব ক্ষেত্রে আমরা ওর ডেরার সন্ধান নির্দিষ্টভাবে পাইনি। শুধু একটা তল্লাট বা পাড়ার কথা জানা গিয়েছিল। এবার হাওড়ায় ওর আস্তানা বা জেএমবির শাখা অফিস পর্যন্ত আমরা পৌঁছে গিয়েছিলাম। আর গিয়ে শুনলাম, ও দেড় দিন আগে তিনি
সেখান থেকে বেরিয়ে গেছেন। আফসোসটা যে কারণে এ বার অনেক বেশি।
তবে গোয়েন্দাদের কাছে কিছুটা সান্ত্বনা, প্রথমে হাওড়ার ওই ঘাঁটি ও তার পর সেখান থেকে সূত্র পেয়ে কলকাতার মেটিয়াবুরুজে মিজান ওরফে কাওসারের একটি সন্ধান পাওয়া গেছে। কলকাতা ও পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য পুলিশের পুরনো কর্মকর্তারা বলে থাকেন, নতুন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ তৈরি হওয়ার পর সত্তরের দশকের শেষ থেকে আশির দশকের গোড়া পর্যন্ত রাজাকারদের ও তাদের পরিবারদের একটা অংশকে মেটিয়াবরুজে আশ্রয় দিয়ে কালেদিনে তাদের রেশন কার্ড করিয়ে ভারতীয় নাগরিকত্ব পেতে সাহায্য করেছিল পশ্চিমবঙ্গের তদানীন্তন সরকার। সেই জন্য মেটিয়াবুরুজের বাসিন্দাদের একটা অংশের মধ্যে বাংলাদেশ সরকার ও ভারত সরকারের বিরোধী মনোভাব সুপ্ত হলেও আছে বলে পুলিশের কর্মকর্তাদের অনেকেই মনে করেন। কেন্দ্রীয় গোয়েন্দাদের একাংশের ধারণা, এই পটভূমিকার কথা মাথায় রাখলে কিন্তু মনে হয়, মেটিয়াবুরুজে বোমা মিজান তথা জেএমবির জাল ছড়ানো অস্বাভাবিক কিছু নয়।
২০১৪ সালের ২ অক্টোবর বর্ধমানের খাগড়াগড়ে জেএমবির বোমা তৈরির কারখানায় বিস্ফোরণে দু’জন নিহত হওয়ার পরে ওই জঙ্গি সংগঠনের যে নেতার নাম প্রথম জানা গিয়েছিল, তিনি এই বোমা মিজান ওরফে কাওসার। খাগড়াগড়ের ওই ডেরায় গিয়ে তিনিই কারিগরদের জানাতেন, কত দিনের মধ্যে কতগুলো বোমা তৈরি করে দিতে হবে এবং তার পর সেসব দেশি হ্যান্ড গ্রেনেড কিংবা সকেট বোমা তৈরি হওয়ার পর নম্বর প্লেটহীন একটি লাল মোটরসাইকেলে করে ব্যাগের মধ্যে নিয়ে তিনিই সেগুলো পৌঁছে দিতেন মুর্শিদাবাদ জেলার বাংলাদেশ সীমান্তে। যেখান থেকে জেএমবির অন্য লোকজন সেগুলো চোরাপথে বাংলাদেশে নিয়ে যেত।
সে দিন থেকে কাওসারের খোঁজ চলছে। তার হদিস পেতে দশ লাখ টাকা পুরস্কারও ঘোষণা করেছে এনআইএ। কিন্তু দেড় বছরেও তাকে খুঁজে পাওয়া যায়নি।
এনআইএর এক কর্মকর্তা বলেন, একইসঙ্গে ভারত ও বাংলাদেশের পুলিশ, গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা বাহিনীর ঘুম কেড়ে নিচ্ছে বোমা মিজান। নিকট অতীতে তার মতো আর কোনও বাংলাদেশি সন্ত্রাসীকে দেখা যায়নি।
/এজে/